রবিবার ২১ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ঢাকা শিশু হাসপাতাল: যেখানে ময়লার ভাগাড়েই চলে চিকিৎসা!

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | ১১:২৬ অপরাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।

ঢাকা: রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত ঢাকা শিশু হাসপাতাল। যে হাসপাতালটির মেঝে থেকে শুরু করে দেয়াল—সবকিছুই হওয়ার কথা ঝকঝকে আর জীবাণুমুক্ত, সেটি এখন ধূলা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ওয়ার্ডগুলোর দেয়াল জমেছে শ্যাওলা, লেগে আছে পানের পিক। এমনকি স্যুয়ারেজ লাইনও খোলা। ভেতরে-বাইরে ভাসছে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা। জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালটি পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু তৈয়ব।

শনিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালটির বাইরে পরিষ্কার থাকলেও ভেতরের ওয়ার্ডগুলো অন্ধকার-নোংরা-স্যাঁতস্যাঁতে। হাসপাতালটির ভেতরে শিশুসন্তানকে ভিটামিন ‘এ-প্লাস’ খাওয়াতে এসেছিলেন রাজধানীর শ্যামলী থেকে আসা নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ যদি এমন হয়, তাহলে শিশুদের চিকিৎসা সেখানে কীভাবে হবে? এমন পরিবেশে চিকিৎসা নিলে শিশুরা তো সুস্থ হওয়ার বদলে অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে!’

বিজ্ঞাপন

ঢাকা শিশু হাসপাতালের বাইরে খোলা জায়গায় ময়লার স্তূপ

নজরুল ইসলাম যখন এমন অভিযোগ তুলছেন, তখন পাশ থেকে এমদাদুল হক নামের আরেক অভিভাবক বললেন, ‘আজ মন্ত্রী আসবেন বলেই হাসপাতালটা একটু পরিষ্কার করা হয়েছে। এমনিতে যা-তা অবস্থা থাকে হাসপাতালের। ’

এমদাদুল জানান, তিনি গত পাঁচদিন ধরে এই হাসপাতালে আছেন সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু হাসপাতালের নোংরা-দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ওয়াশরুমে যেতে পারছেন না, বমিও হয়েছে কয়েকবার।

প্রায় একই অভিযোগ গাজীপুর থেকে তিন বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে থাকা জামিলা বেগমেরও (ছদ্মনাম)। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালেও ওয়ার্ডের ভেতরে বিড়াল ঘুরে বেড়ায়, এটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড, বাথরুম এত নোংরা হতে পারে, এটা ভাবনায়ও আসেনি, বাথরুমে গন্ধে যাওয়া যাওয়া না। কিন্তু তারপরও এখানে যারা আসে তাদের বাধ্য হয়েই যেতে হয়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের বাইরে খোলা জায়গায় ময়লার স্তূপ

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বাথরুম পরিষ্কার করা হয় না ঠিকমতো। বারান্দায় ছড়ানো-ছিটানো থাকে ভাতসহ খাবারের বাটি। সেখান থেকেও গন্ধ আসছে। তারা বলছেন, বেডের নিচে সবসময় ময়লা ফেলার বিন না থাকায় এভাবেই তাদের খাবার রাখতে হয়, সেগুলো ঠিকমতো হাসপাতাল থেকে পরিষ্কারও করা হয় না। বাধ্য হয়ে অনেকসময় তারা নিজেরাই বাইরে রেখে আসেন বলেও জানান তারা।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে ঢাকনাবিহনি স্যুয়ারেজ লাইন

এই হাসপাতালেরই একাধিক চিকিৎসক বলছেন, যেকোনো হাসপাতালের পরিবেশই হতে হবে পরিচ্ছন্ন। আলো-বাতাস থাকতে হবে পর্যাপ্ত, আর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের চেয়ে কম। তাই তাদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল ও মনোযোগী হতে হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, তারা একাধিকবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলেছেন, পরিবেশ শিশুবান্ধব করতে, শিশুদের জন্য ওয়ার্ডগুলোতে দোলনার ব্যবস্থা করার জন্য। স্বজনদের কাপড়চোপড় শুকানোর জন্য ছাদে ব্যবস্থা করে দেওয়া জন্য, কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। চিকিৎসকরা বলছেন, বারান্দায় রোগীসহ স্বজনদের কাপড় ধুয়ে শুকাতে দেওয়া হয়। যে কারণে আলো-বাতাস কিছুই ঢোকে না।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের বাইরে খোলা জায়গায় ময়লার স্তূপ

হাসপাতালের নিচতলায় টয়লেটের পাশে স্থাপন করা হয়েছে হাসপাতালের একমাত্র ক্যান্টিন। ক্যান্টিনের ভেতরের দিকে চিকিৎসকদের জন্য কয়েকটি টেবিলসহ চেয়ার রয়েছে। যেখানে একটু বাতাস এলেই বাথরুমের গন্ধ ক্যান্টিনে এসে নাকে লাগে।

এই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক সারাবাংলাকে ক্ষোভ নিয়ে বলেন, শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু এ ধরনের পরিবেশে যদি শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের জন্য সেটা দুঃখজনক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সারাবাংলাকে বলেন, যেকোনো শিশু হাসপাতালের পরিবেশ হতে হবে শিশুবান্ধব। শিশুরা যেন সেখানে হাসি-খুশি থাকতে পারে, সে পরিবেশ রাখতে হবে। থাকতে হবে প্রচুর আলো-বাতাস ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। শিশুদের জন্য চলাফেরা ও খেলাধূলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তিনি বলেন, পয়ঃনিষ্কশন, বর্জ্য-নিষ্কাশন ও সামগ্রিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সুস্থতার মধ্যে থাকতে হবে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ডের স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে-দেয়াল

ঢাকা শিশু হাসপাতালকে পুরো দেশের শিশুচিকিৎসার একটি প্রধান কেন্দ্র বলে মন্তব্য করে এই চিকিৎসক বলেন, সেখানে মানসম্মত ওয়ার্ড ও চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা উচিত।

স্যুয়ারেজ লাইন খোলা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কোনো হাসপাতালেই স্যুয়ারেজ লাইন খোলা থাকতে পারে না। সেখানে অবশ্যই ঢাকনা থাকতে হবে। না হলে সেখান থেকে শুধু শিশুরাই নয়, বড়দেরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু তৈয়ব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের চেয়ে পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। আগের যে ক্লিনিং কোম্পানি ছিল, তাদের ২ হাজার ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়, এটা আসলে লেবার ল’ মেইনটেইন হয় না। অনেকদিন চেষ্টা করেছি, কিন্তু টেকনিক্যাল কারণে নতুন করে টেন্ডার দেওয়া যাচ্ছে না।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালে ঢাকনাবিহীন স্যুয়ারেজ লাইন

অধ্যাপক ডা. আবু তৈয়ব বলেন, ‘বিল্ডিংটাও অনেক পুরনো। সেক্ষেত্রে আমরা যে বিল্ডিং রেনোভেট করব, সেটাও করতে পারছি না। বন্ধও রাখতে পারছি না। অনেক বড় ক্রাইসিস হয়ে যায়। এসব বিষয় সঠিক মনিটরিং দরকার। ’ কিন্তু সেগুলো নানা কারণে হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

/সারাবাংলা/জেএ/এমএনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন