শুক্রবার ২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১৩ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

কর্মদিবসেও জমে উঠছে প্রাণের মেলা

ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯ | ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ

হাসনাত শাহীন ।।

দিন যত যাচ্ছে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’য় ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে বইপ্রেমীদের সমাগম। সে কর্মদিবস হোক আর ছুটির দিন হোক। প্রতিদিন যেমন মেলায় আসছে নতুন নতুন বই, তেমন-ই যেন প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাণের মেলায় ছুটে আসছে শত-সহস্র বই প্রেমী মানুষ। তাদের সরব উপস্থিতিতে বই বিক্রির যেমন বাড়ছে তেমনই মেলার বিভিন্ন প্রান্তে জমে উঠছে আড্ডা, আনন্দ-হিল্লোল। টানা দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনের পর সপ্তাহের কর্মদিবস রোববার এবারের গ্রন্থমেলা’র দশম দিন তারই সাক্ষ্য দিয়ে গেল।

বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের মেলারও মূল প্রাঙ্গণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সত্তাধিকারীরাও বলছেন সেই কথা। তারা বলছেন, মেলার দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে বইপ্রেমীদের ভিড়। কমে যাবে দর্শক। বিক্রি হবে বিভিন্ন ধরনের বই। আর, সামনের দুইদিন বাদে এবারের মেলা সবকিছুকে ছাপিয়ে হয়ে উঠবে আরও প্রাণবন্ত। আশা করছি, এই দুই-তিন দিনে বেঁচা-কেনাও অনেক ভালো হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকাশকদের এই আশার কারণও আছে। কেননা, কাল এবং পরশু বাদে আগামী বুধবার যে পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার-ভালোবাসা দিবস। অতীত সাক্ষ্য দেয়, এই দুইদিনে যে কোন দিনে (কর্মদিবস হোক আর ছুটির দিন হোক) মেলায় ভিড় হবেই। বাড়বে বিক্রি। সেই লক্ষে প্রকাশনা সংস্থাগুলোও সেজে উঠেছে। এবারের মেলার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হতে যাওয়া এসব প্রকাশকদের প্রায় অধিকাংশ নতুন বই মেলার স্টলে-স্টলে নিয়ে এসেছে।

আসন্ন এই দিন দুটির বিষয়ে ঐতিহ্য প্রকাশনীর বিক্রয় ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, গত দুইদিন শুক্রবার ও শনিবার থাকাতে বিক্রি একটু বেশি ছিলো। শুক্রবারে যা বিক্রি ছিলো, শনিবারে সেই বিক্রি কিছুটা কমেছে। কিন্তু আজ, এবারের মেলার বিগত কর্মদিবসের তুলনায় অনেক বেশি বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, বই কিনুক আর না কিনুক মেলায় দর্শক সমাগম বাড়ছে এটিও এক প্রকার ইতিবাচক দিক।

এদিকে মেলার গতকাল ১০তম দিনে এসেও মেলার বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন প্রকাশনা সংস্থা নালন্দা’র সত্তাধিকারি রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল। তিনি বলেন, মেলার শুরুতেই প্যাভিলিয়ন কিংবা স্টলের বিভিন্ন লাইনের মাঝখানে ইট বিছিয়ে অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করার কথা থাকলেও বাংলা একাডেমি এখনও তা করতে পারেনি। উদাহরন স্বরূপ তিনি মেলা প্রাঙ্গণের প্রথমা’র প্যাভিলিয়ন ও নালন্দা’র প্যাভিলিয়নের আসে-পাশের রাস্তায় ইট বিছানোর চিত্র তুলে ধরেন। তবে মেলার অন্যান্য পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং এবারের মেলার বিক্রিও অনেক ভালো বলে জানালেন তিনি।

সাপ্তাহিক কর্মদিবসের দিন রোববার বিকেল তিনটায় মেলার প্রবেশ খুলে দেওয়ার পর মেলায় প্রবেশ করে মেলার শেষ পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেল-টানা দুইদিন সাপ্তাহিক ছুটির পরে মেলায় একটা মন্দাভাব থাকবে বলে যেমন ভেবেছিলেন বেশিরভাগ প্রকাশক, সেই ভাবনা অনেকটা মিথ্যে প্রমান করেছে বইপ্রেমীরা। বিভিন্ন প্রকাশনার প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীরা বিষয়টা স্বীকারও করলেন। এদিনের বিষয়ে তারা বলছেন-সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববারে বইপ্রেমীদের ভিড় এবারের মেলায় নতুনমাত্রা এনে দিয়েছে। প্রায় সবগুলো স্টলের সামনেই ছিলো পাঠকদের ভিড়। শুক্র ও শনিবারের তুলনায় ভিড় কম থাকলেও এদিনের মেলার দশম দিনে বিক্রি ছিলো আশাতীত। মেলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্টল ঘুরে এবং বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার স্টল-প্যাভিলিয়ন ঘুরে দেখা গেছে সেই চিত্র। কর্মদিবসের দিন আশাতীত বিকিকিনি হওয়াতে বিভিন্ন প্রকাশনার প্রকাশকদের চোখেমুখেও ছিলো আনন্দের ছাপ।

প্রকাশনা সংস্থা আবিষ্কারের স্বত্তাধিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, আজ বিক্রি ভালো হচ্ছে। রোববারে বিক্রি একটু কম হবে আমাদের এমন ধারনাটি পাঠকরা মিথ্যা প্রমাণ করেছে। মেলার প্রবেশদ্বার উন্মোচনের পর লোকজন কম দেখে কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে দিকে দৃশ্যপট একেবারেই পাল্টে যায়। এভাবে চলতে থাকলে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবারের মেলা সফলতার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করবে বলেও মনে করেন আবিষ্কারের স্বত্তাধিকারী।

  • মেলার নতুন বই ও বইয়ের মোড়ক উন্মোচনঃ

বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে জানিয়েছে রোববার মেলার দশম দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে ১১টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং মেলার ১০ম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ৯০টি। এর মধ্যে-গল্প গ্রন্থ ১৪টি, উপন্যাস ১৪টি, প্রবন্ধের বই ২টি, কবিতার বই ৩৫টি, গবেষণা গ্রন্থ ৩টি, শিশুসাহিত্য ২টি, জীবনী গ্রন্থ ১টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ১টি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই ১টি, ইতিহাস বিষয়ক বই ১টি, রাজনীতি বিষয়ক বই ২টি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ২টি এবং অন্যান্য বিষয়ে বই এসেছে ১২টি।

এদিনের উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-কথাপ্রকাশ প্রকাশিত ইমদাদুল হক মিলনের ‘আমার প্রেমের উপন্যাস’, পার্ল পাবলিকেশন্স এনেছে আনিসুল হকের ‘নিষিদ্ধ কৌতুক’, হাওলাদার প্রকাশনী এনেছে নেহাল করিমের বাঙালি ‘জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এনেছে শবনম মুশতারীর ‘তালিম হোসেন জন্মশতবর্ষ ২০১৮’, আহমদ পাবলিশিং হাউজ এনেছে ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ’র ‘পাবলিক ম্যানেজমেন্ট পর লোকাল গভর্নমেন্ট ইন বাংলাদেশ’।

  • মেলা মঞ্চের আয়োজনঃ

গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে রোববার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কথাশিল্পী অমিয়ভূষণ মজুমদার : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন-হোসেনউদ্দীন হোসেন, মাহবুব সদিক এবং হরিশংকর জলদাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেলিনা হোসেন।

এ আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং সঞ্জীব পুরোহিত। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মীর মাসরুর জামান রনি এবং লাবণ্য শিল্পী। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আলম দেওয়ান, রণজিত দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, লতিফ শাহ এবং মোঃ আনোয়ার হোসেন। সংগীতের এই কণ্ঠশিল্পীদের সাথে যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন বেণু চক্রবর্তী (তবলা), মো. খোকন (বাঁশি), মো. হাসান মিয়া (বাংলা ঢোল), নওফেল বাদশা (দোতারা)।

  • লেখক বলছি…’ মঞ্চের আয়োজনঃ

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণের প্রথমবারের সংযোজিত ‘লেখক বলছি…’ মঞ্চে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন কবি অসীম সাহা, রেজাউদ্দীন স্টালিন, মীম নোশিন নাওয়াল খান, মাজহার সরকার এবং পারভেজ হোসেন।

  • সেমাবারের গ্রন্থমেলাঃ

আগামীকাল সোমবার এবারের ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র ১১তম দিন। কর্মদিবসের এই দিনে মেলার নীতিমালা অনুযায়ি মেলার প্রবেশ পথ খুলবে বিকেল ৩টায় এবং শেষ হবে যথারীতি রাত ৯টায়। এই সময়ের মধ্যে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে ‘নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অনুপম হায়াৎ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন আমানুল হক, লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং শিবলী মহম্মদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কামাল লোহানী। এ আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে একই মঞ্চে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে থাকবে-কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনা।

সারাবাংলা/এইচএস/টিএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন