বুধবার ২২ মে, ২০১৯ ইং , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় অপরাধ নেই বললেই চলে: ডিএমপি কমিশনার

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ | ৯:০১ অপরাহ্ণ

।। উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। জনবহুল এই শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই ৪৪ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সংস্থাটির প্রধান ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া মনে করছেন, কয়েক বছর আগেও এই শহরে অপরাধের মাত্রা ছিল মাত্রাছাড়া, যা বর্তমানে শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। কিছু অপরাধ সংঘটিত হলেও পুলিশ তার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসছে।

নাগরিক জীবনে আধুনিক পুলিশি সেবা দিতে ১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ১২টি থানা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে থানার সংখ্যা। তারপরও কি পুলিশের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে কি জনগণ? ডিএমপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুলিশি সেবা, প্রযুক্তি সেবা ও অপরাধের ধরন নিয়ে সারাবাংলার মুখোমুখি হন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উজ্জল জিসান

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: নব্বই দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর মধ্যে অপরাধের ধরনে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

ডিএমপি কমিশনার: রাজধানী ঢাকায় একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই, সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। সেসব অপরাধ দমনে পুলিশ শতভাগ সফলও হয়েছে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেড়ে যেতো। গত কয়েক বছর ধরে এসব অপরাধ নেই বললেই চলে। তবে মাঝে সাইবার ক্রাইম, জঙ্গি তৎপরতা ব্যাপক আকারে বেড়েছিল। পুলিশের আন্তরিকতা ও তৎপরতায় সেগুলোও দমন করা হয়েছে। নব্বই দশকের আগে ও পরে মাদকদ্রব্য বলতে ছিল গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেডিন আর ফেনসিডিল, এখন মাদকের স্থান দখল করেছে ইয়াবা। এই মাদক দমনের জন্যও পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত আছে। এখন তো ঢাকায় অপরাধ নেই বললেই চলে।

সারাবাংলা: এখন সবকিছু তো প্রযুক্তিনির্ভর। পুলিশের তদন্তে প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার হচ্ছে?

ডিএমপি কমিশনার: দেশে অপরাধের ধরনের সঙ্গে যেমন পরিবর্তন আসছে, পুলিশের তদন্তেও তেমনি পরিবর্তন এসেছে। গ্রেফতারে আসছে সুপরিকল্পিত স্বচ্ছ অভিযান। একটা সময় কোনো হত্যা বা চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলে আশপাশের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যেত অপরাধীর নাম। এখন প্রযুক্তির ব্যবহারে যেকোনো অপরাধের রহস্য উদঘাটন ও অপরাধীদের গ্রেফতারে সম্ভব হচ্ছে। সাইবার ক্রাইম টিম গঠন করা হয়েছে। অপরাধের ধরন দেখে তা শনাক্ত করা হচ্ছে।

সারাবাংলা: আপনার সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশে কী কী পরিবর্তন আসছে?

ডিএমপি কমিশনার: ঢাকা মহানগর পুলিশ এখন একটি সুপরিকল্পিত পুলিশিং অবকাঠামো গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। একটা সময় পুলিশকে দায়িত্ব পালন করার জন্য পরিবহন কোম্পানির বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন দিয়ে চলতে হতো। এখন ডিএমপি’র পরিবহন সক্ষমতা এসেছে। ট্রাফিক পুলিশ কাগজে লিখে মামলা হতো। সেখানে দুর্নীতি হওয়ার সুযোগ থাকত। এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলা হয়। ইউক্যাশের মাধ্যমে গ্রাহক টাকা পরিশোধ করতে পারেন। এমনকি প্রতিটি থানার হাজতখানা, ডিউটি অফিসার ও থানার ভেতরে কী হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট ডিসি ও কমিশনার অফিস থেকে মনিটরিং করা হয়।

সারাবাংলা: জনবান্ধব পুলিশ গঠনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কতটা সফল হয়েছে বলে মনে করেন?

ডিএমপি কমিশনার: নগরবাসীর প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে পুলিশের চেয়ে নগরবাসীকেই এগিয়ে আসতে হবে বেশি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, আইন মানতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার পুলিশি সেবা চাইবেন, আর সে দেশের মতো আইন মানবেন না, তা হতে পারে না। বাংলাদেশে একটা সময় মোটরসাইকেলের চালকরা হেলমেট পরতেন না। পুলিশ বাধ্য করছে হেলমেট ব্যবহারে। মোটরসাইকেলের আরোহীরাও হেলমেট পরতেন না। আমরা ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ চালু করলাম। এখন কিন্তু তারা বাধ্য হয়ে হেলমেট পরছেন। সবসময় কিন্তু আবার এভাবে বাধ্য করা যাবে না। নাগরিকদের নিজেদের উদ্যোগেই আইন মানতে হবে।

সারাবাংলা: ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের পর কী কী সুবিধা পাচ্ছেন? এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য কী?

ডিএমপি কমিশনার: জঙ্গি হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধ যখন বেড়ে গেল তখন প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন, ঢাকা শহরে কারা ভাড়া থাকেন সেটা কি পুলিশ জানে? এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাবাসীর তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই মধ্যে ৮০ লাখেরও বেশি মালিক ও ভাড়াটিয়া তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এসব তথ্যের কারণে অনেক সুফল পাওয়া যাবে।

সারাবাংলা: পুলিশ সদস্যদের অনেকেই মাদক ব্যবসা, ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানো ইত্যাদি নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে ডিএমপি?

ডিএমপি কমিশনার: পুলিশের অভ্যন্তরীণ অপরাধের বিষয়ে এখন চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এমনকি পুলিশ নিয়োগের আগে কোনো সদস্য মাদকাসক্ত কি না, তা মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। এছাড়াও পুলিশ সদস্যদের কর্মরত অবস্থায় মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। আগেও ডিএমপিতে অনেকের বিরুদ্ধেই এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সারাবাংলা: ডিএমপি কমিশনার হিসেবে আগামীর পুলিশি চ্যালেঞ্জ কী মনে করছেন?

ডিএমপি কমিশনার: ডিএমপিতে আগামীতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, মাদকের ভয়াবহতা ও ট্রাফিক জ্যামের মতো সমস্যাগুলোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে ডিএমপিতে একজন কমিশনার, ছয় জন অতিরিক্ত কমিশনার, ১১ জন যুগ্ম-কমিশনার, ৪২ জন উপকমিশনার ও ৭৩ জন অতিরিক্ত উপকমিশনার কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া পর্যাপ্তসংখ্যক সহকারী কমিশনার ডিএমপিতে কর্মরত।

সারাবাংলা: নগরবাসীর প্রতি কোনো বক্তব্য বা আহ্বান রয়েছে কি?

ডিএমপি কমিশনার: নগরবাসীর প্রতি বলতে চাই, আইন মেনে চলুন। আইন মেনে পুলিশকে সহযোগিতা করুন। এই ঢাকা পুলিশের একার নয়। যারা বাস করছেন, তাদের সবার। আসুন সবাই একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলি।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন