শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৩ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

এসআই’র মত ফেনসিডিল, ওসি’র ইয়াবা, অসহায় চিকিৎসক!

ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ | ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা: ঘটনাস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রায় মধ্যরাত। চার তরুণকে নিয়ে থানার এসআই সিরাজুল ইসলাম হাজির হাসপাতালে। দায়িত্বরত চিকিৎসক আবু শাহাদাৎ মাহফুজকে বললেন, ‘লিখে দিন এরা মদ্যপায়ী।’

চিকিৎসক পরীক্ষা করে তেমন কিছুই পেলেন না। বললেন, কিছুইতো পাচ্ছি না, কেন লিখবো? এতে ক্ষেপে গেলেন এসআই সিরাজুল। চিকিৎসকের ওপর চাপ দিতে লাগলেন। অসৌজন্যমূলক আচরণও করলেন। থানার ওসিকে (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ফোনে ধরিয়ে দিলেন এসআই নিজেই। তিনিও চিকিৎসককে ধমক লাগালেন। সরকারের কাজে অসহযোগিতার অভিযোগ এনে দেখে নেওয়ার হুমকি দিলেন।

অনন্যোপায় চিকিৎসক ফোন করলেন সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ফেরদৌসকে। তিনি বললেন, কম্প্রোমাইজ করো... নইলে চাকরি ছেড়ে দাও।
বিসিএস সম্পন্ন করে সুদূর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বপালন করতে যাওয়া তরুণ মেধাবী চিকিৎসকটি এরপর কী করবেন?

বিজ্ঞাপন

কোনো পথ না পেয়ে তিনি জানালেন তার এক বন্ধুকে। আশ্রয় নিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। সেখানে লিখলেন ঘটনার বর্ণনা। তাতে ফুটে উঠলো একজন চিকিৎসকের অসহায়ত্বের কথা।

বিষয়টি নজরে এলে সারাবাংলা.নেট এর পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে কথা হয়। এতে বের হয়ে আসে বেশ কিছু অসঙ্গতি। সাথে ফুটে উঠলো অপরাধ দমনের নামে দেশের একটি প্রত্যন্ত উপজেলা সদরে কি ঘটতে পারে তারও এক চালচিত্র।

এখানে পুলিশ পক্ষ নিজেই নিশ্চিত করতে পারছেন না, কোন দোষে, কোন মাদকের অভিযোগ আনা হবে আটককৃত চার তরুণের বিরুদ্ধে। আর সে কারণে এসআই যখন বলছেন, ওরা ফেন্সিডিল খেয়েছে, তখন ওসি বলছেন ইয়াবার কথা। ওদিকে হাসপাতালে নিয়ে লিখে দিতে বলা হলো ওরা মদ্যপায়ী। আর চিকিৎসক পরীক্ষা করে কোনওটারই অস্তিত্ব পেলেন না।

প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক চিকিৎসক আবু শাহাদাৎ মাহফুজের বক্তব্যটুকু। তিনি লিখেছেন-
“শুক্রবার রাতে চার তরুণকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন এসআই সিরাজুল ইসলাম। ওই ‘চার তরুণ মদ্যপায়ী’এমনটাই লিখে দিতে বলেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী, আমি চারজনকেই পরীক্ষা করি। মদ্যপানের কোনো লক্ষণ পাওয়া না যাওয়ায় ‘চারজন মদ্যপায়ী’লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানাই। এরপর এসআই আমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মোবাইল ফোনে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, আমি সরকার ঘোষিত মাদকবিরোধী অভিযানে সহায়তা করছি না।”

ডা. আবু শাহাদাৎ মাহফুজ পুরো ঘটনা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেলা সিভিল সার্জনকেও মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন উল্লেখ করে লিখেছেন, জবাবে সিভিল সার্জন তাকে ‘কম্প্রোমাইজ’ করে চলার পরামর্শ দেন।

‘প্রশাসনের সাথে লেগে পারবে না, একটু কম্প্রোমাইজ করে চলতে হবে। তোমার সাথে কাউকে পাবে না। ইচ্ছে হলে চাকরি করো, নইলে ছেড়ে দাও’ মাহফুজের মতে এটাই ছিলো সিভিল সার্জনের বক্তব্য।

আর নোটের শেষ ভাগে তিনি লেখেন বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে একজন চিকিৎসক হয়ে দায়িত্ব পালন করার সময়ে যদি এমন অরক্ষিত থাকি, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা সেটা সহজেই অনুমান করতে পারছি।

বিষয়টি নিয়ে সারাবাংলার প্রথমেই কথা হয় এসআই সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারকে বললাম, একটু লিখে দেন। কেউ খাইছে, কেউ খায়নি এ রকম। কিন্তু উনি লিখবেন না। উনি পরীক্ষা করে জ্বর, সর্দির ওষুধ দিলেন।”

সিরাজুল ইসলাম বলেন, “শিবগঞ্জে বেশি চলে ফেনসি (ফেনসিডিল)। আর ফেনসি খাইলেতো বোঝা যায় না কোনো গন্ধ আছে কি না। ফেনসিডিল খাইলেতো কোনো সিম্পটমই পাওয়া যায় না। মুখে কোনো গন্ধ থাকে না, কিছু থাকে না। ডাক্তার তাই কোনও গন্ধ পান নাই।”

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন অন্য কথা। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘তরুণরা ইয়াবায় আসক্ত। তাই তাদের ধরা হয়েছে।’

এদিকে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। সে কারণে আটকের পক্ষে তাদের হাতে অপরাধের প্রমাণ থাকতেই হবে। আর সে লক্ষ্যেই এত আয়োজন।

“ডাক্তার কিছু লিখতে না চাইলে ওসি স্যারকে ফোনে জানাইলাম। তখন ওসি স্যার বললেন, ‘ডাক্তারের নাম কী? লিখে নিয়ে আসেন। কারণ এরতো একটা বিহিত করতে হবে। ধরা যখন হয়েছে তখনতো আর এমনি ছেড়ে দিতে পারব না। তখন আবার মানুষ বলবে, পুলিশ টাকা খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে”মন্তব্য এসআই সিরাজুলের।

সিরাজুল বলেন, আমরা চাইছিলাম পুলিশ আইনে ৩৪ ধারায় মাদক খেয়ে মাতলামো করলে ৫০ টাকা জরিমানা হয়, সে ধারায় ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে একটা বিহিত করতে। উনিতো (চিকিৎসক) তা করতে দিলেন না।”

ওসি মশিউর রহমান অবশ্য পরে অন্য কথাও বলেছেন। এমনকি পুরো বিষয়টিই অস্বীকার করেছেন তিনি। তার দাবি, হাসপাতালে আটককৃতদের পাঠানো হয়েছিলো স্রেফ ফার্স্ট এইড দেওয়ার জন্য।

মশিউর বলেন, “চার তরুণকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফার্স্ট এইড দেওয়ার জন্য। ফার্স্ট এইড দেওয়ার পর তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আর কিছুই সেখানে হয়নি।”

তবে চিকিৎসক মাহফুজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারও। তিনি বলেন, ‘ওই ডাক্তার সম্পর্কে হাসপাতলের অন্য ডাক্তারদের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলেই বোঝা যাবে তিনি কেমন।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ফেরদৌসকে ফোন করা হলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা আমি মিনিমাইজ করে ফেলব। আর এই চিকিৎসক একটু কেমন যেন। হাসপাতালে আরও চিকিৎসক আছে কারও সঙ্গে কিছু হয় না, তার সঙ্গে হলো কেন!’

কম্প্রোমাইজ করে চলার পরামর্শ দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই ওঠে না। আমি এ ধরনের কথা বলিনি।’

সিভিল সার্জনের অস্বীকৃতির বিষয়টি ডা. মাহফুজকে জানানো হলে তিনি বলেন, এই হাসপাতালে আমি আট বছর ধরে চাকরি করছি। কোনোদিন কিছু হয়নি। কাল রাতে পুলিশের সঙ্গে এমন হলো।

‘আমি সিভিল সার্জনকে বলতে চাই, তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। তার উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, কিন্তু তিনি তা করেননি, বলেন ডা. মাহফুজ।

এই প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মুজাহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, বিষয়টি জানার পর সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা আমার কথা হয়েছে। আশা করি এর একটা সমাধান সম্ভব হবে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, বিষয়টি আমি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে দেখব।

সারাবাংলা/এটি

বিজ্ঞাপন

Tags: , , , , , , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন