সোমবার ২৫ মার্চ, ২০১৯ ইং , ১১ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৬ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মুহম্মদ খসরু: আপসহীন চলচ্চিত্রপ্রেমী

ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ | ৫:২৯ অপরাহ্ণ

বিধান রিবেরু ।।

সাদাকালো শ্মশ্রূমণ্ডিত রঙিন মানুষটি যখন আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের বাজারের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতেন, তার কাত হয়ে থাকা কাঁধ ও দৃপ্ত ভঙ্গিতে পা টেনে টেনে চলার ভেতর স্পষ্ট হয়ে উঠত ‘পারসিসটেন্স অব ভিশন’। তাতে ফুটে উঠত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের একটি গোটা অধ্যায়, যে অধ্যায়টি ছিল প্রথম ও প্রধান, যে অধ্যায়টি ছিল ক্ষোভ আর অভিমানে ঠাসা। সেই অধ্যায়টি সঙ্গে করে নিয়ে আজ চলে গেছেন সেই পাগল মানুষটি। মুহম্মদ খসরু। প্রশ্ন জাগে, কে বেশি পাগল? চলচ্চিত্র না চলচ্চিত্রকর্মী?

পূর্ববঙ্গে ১৯৬৩ সালে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করেন মুহম্মদ খসরু। পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্র আন্দোলনের দুর্দান্ত মুখপত্র ‘ধ্রুপদী’ প্রকাশিত হয় তার সম্পাদনায়। সেসময় ‘চলচ্চিত্রপত্র’ নামের ফিল্ম বুলেটিনও বের করতেন তিনি। চলচ্চিত্রকে বড় ক্যানভাসে চর্চার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফিল্ম স্টাডি সেন্টার। মুহম্মদ খসরুর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফলে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ ও জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ। এই আর্কাইভের পরবর্তী অবস্থা দেখে তাই আক্ষেপের সীমা ছিল না তার।


আরও পড়ুন :  বইটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে: প্রিয়তী


২০০৬ সালে লেখা এক সম্পাদকীয়তে মুহম্মদ খসরু বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রধান অর্জন জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ আজ পরিত্যক্ত ভাগাড়ে পরিণত। চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থ-পত্র-পত্রিকায় সমৃদ্ধ পাঠাগার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর প্রেক্ষালয়, চলচ্চিত্র কর্মশালা, চলচ্চিত্র অধিবেশন ইত্যাদির মাধ্যমে আর্কাইভকে কেন্দ্র করে স্বল্প পরিসরে হলেও একটি চলচ্চিত্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সরকার কালাকানুন আরোপ করে সেই চলচ্চিত্রচর্চার কণ্ঠনালী চেপে ধরে। পরিণামে অধিকাংশ চলচ্চিত্র সংসদের যাবতীয় কার্যক্রম আজ বন্ধ।’

বিজ্ঞাপন

ফিল্ম আর্কাইভ অবশ্য নিজের এই ভগ্নদশা এখন অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। তবে এটা বুঝতে হবে— যে সময় মুহম্মদ খসরু, আনোয়ারুল হক খান, মোশাররফ হোসেন, ওয়াহিদুল হক, কলিম শরাফী, মনিরুল আলম প্রমুখেরা চলচ্চিত্র আন্দোলনে নিযুক্ত হন এবং চলচ্চিত্র নিয়ে গভীর চিন্তাশীল লেখাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে চলচ্চিত্র চর্চাকে মননশীলতার অন্য স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, সেই ষাট-সত্তর-আশি, এমনকি ও নব্বইয়ের দশকেও ইন্টারনেটের সুবাদে সিনেমা দেখা অত সহজ ব্যাপার হয়ে ওঠেনি। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তারা চলচ্চিত্রচর্চা করেছেন। তাই তো তারা ক্ষেপে ওঠেন, যখন দেখেন চলচ্চিত্র সংস্কৃতির নামে ধোঁকাবাজি চলছে; যখন দেখেন চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে চলচ্চিত্রচর্চার গলা টিপে ধরা হচ্ছে। মুহম্মদ খসরুর যে ‘সুখ্যাতি’ রয়েছে, ক্ষ্যাপাটে বা পাগল লোক হিসেবে, সেটা ওই কারণেই। তিনি চলচ্চিত্রচর্চাকে ধান্ধাবাজির জায়গা হিসেবে দেখেননি; বরং চলচ্চিত্রচর্চার মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধির মুক্তি হবে বলেই বিশ্বাস করতেন। নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে না মিললে খিস্তি-খেউড় করতে দ্বিতীয়বার ভাবতেন না। এজন্যই অনেক অনুষ্ঠানে দেখেছি— অনেক বড় বড় পরিচালক তাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন, এমনকি প্রকাশ্যেও বলেছেন, খসরু ভাইকে এখানে ডাকা যাবে না, উনি সব নষ্ট করে দেবেন।

নষ্টদের অধিকারে যখন সবকিছু চলে যায়, তখন আর নতুন করে নষ্ট করার কিছু থাকে না। একজন মানুষ পুরো জীবনটাই চলচ্চিত্রের জন্য ভাবনাচিন্তা, এমনকি নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে বসবাস করে কাটিয়ে গেলেন। তার বাসায় যেসব বইপত্র আছে, চলচ্চিত্রের ওপর, সেগুলোকে তিনি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। অভিমান থেকেই বলেছিলেন। যে দেশে ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ ছবির পরিচালক আখতারুজ্জামান মারা যাওয়ার একমাসের মধ্যে তার বইপত্র নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যায়, সে দেশে মুহম্মদ খসরুর মতো মানুষ বই পুড়িয়ে দেওয়ার কথা তো বলবেনই!

আমরা যারা লোকজনের ফেলে দেওয়া বইপত্র কুড়িয়ে বেড়াই, উঞ্ছবৃত্তি করি, তারা জানি— বই সংগ্রহ করা কতটা কঠিন, বিশেষ করে চলচ্চিত্রের বই। দুষ্প্রাপ্য বই পেলে আনন্দিত হই, আবার বিখ্যাত কোনো মানুষের সংগ্রহের বই ফুটপাতে দেখলে কষ্টও পাই। সেসব পুরনো বইয়ের দোকানে প্রায়ই যেতেন খসরু ভাই। উদ্দেশ্য তো একটাই। অনেক সময় খসরু ভাইয়ের কারণে অনেক বই হাত ফসকে গেছে আমার। গিয়ে শুনি দোকানি বলছেন, এই গতকাল খসরু ভাই বইগুলো নিয়ে গেছেন! জিজ্ঞেস করি, কোন খসরু? গালি খসরু? দোকানি হেসে বলেন, আর কে এসব বই নিবে বলেন?

জীবনে যতদিন কর্মক্ষম থেকেছেন ততদিনই নিজেকে, নিজের সময়কে উৎসর্গ করেছেন চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখাপড়ায়। চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন ছিল বটে, কিন্তু সেটা পূরণ হয়নি। হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ বইটির চিত্রনাট্য তৈরি করে নিয়ে নাকি তিনি ঘুরেছেন বহুদিন, কিন্তু প্রযোজক পাননি। তবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে সেটাই ছিল এ দেশে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ভারতের চলচ্চিত্রকার রাজেন তরফদারের সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে ভারত বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় রাজেন তরফদার নির্মাণ করেছিলেন সেই ছবি— ‘পালঙ্ক’।

এককভাবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি, তাতে কী! চলচ্চিত্র চর্চায় আজ বাংলাদেশে যতটুকু সিরিয়াসধর্মী রচনা দেখা যায়, তার পুরোধা ছিলেন মুহম্মদ খসরু। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র বিষয়ে গভীর সিরিয়াস লেখালেখি তেমনভাবে চোখেই পড়ে না। সাহিত্য চর্চা হয়ে উঠেছে সংবাদপত্র নির্ভর। সুতরাং চলচ্চিত্র আজ বেঘরে হয়ে পড়েছে, প্রতি বৃহস্পতিবারের খবরের কাগজের সংস্কৃতির পাতাগুলো জুড়ে কেবল টেলিভিশনের রমরমা খবর। … চলচ্চিত্র বিষয়ে কোনো ভালো লেখা খুঁজে পাওয়া যায় না।’

এই যে খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটা বলেই ক্ষান্ত থাকেননি মুহম্মদ খসরু। নিজের সম্পাদিত পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সেই সিরিয়াসধর্মী লেখা প্রকাশের এক ব্রত নিয়েছিলেন তিনি। তাই তো আজ আমরা যারা চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করি, তাদের জন্য খসরু ভাই এক বাতিঘরের মতো। তিনি মনে করতেন চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র দেখা, চলচ্চিত্র নিয়ে কথাবার্তা ও লেখালেখি পুরোটাই চলচ্চিত্র আন্দোলন। তরুণদের উদ্দেশ্যে মুহম্মদ খসরু বলেছিলেন, ‘ফিল্মকে ভালোবেসে তবেই এই আন্দোলনে আসতে হবে। এখানে হিপোক্রেসির কোনো অবকাশ নেই।’

ভারতের হুগলি জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন মুহম্মদ খসরু। তবে তার পৈত্রিক ভিটা ছিল ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জেই। বাবার চাকরির জন্যই হুগলিতে যেতে হয়েছিল মুহম্মদ খসরুর পরিবারকে। পঞ্চাশের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে মুহম্মদ খসরুর পরিবারকে ঢাকায় ফিরে আসতে হয়। তখন সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্তদের কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি তাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি সতীর্থদের নিয়ে ষাটের দশকে গড়ে তোলেন ফিল্ম সোসাইটি। এর পরের সব ঘটনা এখন ইতিহাস। মুহম্মদ খসরুও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন। বাংলাদেশে যতদিন চলচ্চিত্রচর্চা হবে, ততদিন মুহম্মদ খসরুও চর্চিত হবেন, বহমান থাকবেন। কারণ অর্থ বা খ্যাতির লোভে মজেননি তিনি, তিনি মজেছিলেন চলচ্চিত্রের প্রেমে।

পুঁজি

১. মুহম্মদ খসরু (সম্পাদিত), ধ্রুপদী (নির্মল চলচ্চিত্র আন্দোলনের মুখপত্র), ষষ্ঠ সংকলন (২০০৬), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ প্রকাশনা, ঢাকা।

২. মুহম্মদ খসরু, (২০০৮), সাক্ষাৎকার চতুষ্টয়, উলুখড়, ঢাকা।

৩. শাহাদুজ্জামান,  (২০০৯), বায়োস্কোপ, চলচ্চিত্র প্রভৃতি, বাঙলায়ন, ঢাকা।

বিধান রিবেরু: লেখক ও চলচ্চিত্র গবেষক

সারাবাংলা/পিএম


আরও পড়ুন :

.   মার্চে মুক্তি পাবে নওয়াজের ‘ফটোগ্রাফ’

.   নিভৃতেই চলে গেলেন চলচ্চিত্রযোদ্ধা মুহম্মদ খসরু

.   বিজেপিতে যোগ দিলেন প্রসেনজিতের বাবা

.   বর্ণমালার সচেতনতায় ‘বর্ণমালার মিছিল’

.   ঘুচলো দেড় যুগের দূরত্ব

.   ক্যামেরার ভুল অ্যাঙ্গেল ও প্রিয়াঙ্কার মা হওয়ার গুঞ্জন

.   অবশেষে বলিউডে নিষিদ্ধ হলেন পাকিস্তানি শিল্পীরা

.   প্রিয়াঙ্কায় বিস্মিত কারিনা


আরও দেখুন :

ফাগুন হাওয়ায় ।। বিহাইন্ড দ্য সিন ।। ভিডিও স্টোরি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন