সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৪ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

তারুণ্যের বই কেনার বর্হিঃপ্রকাশ

ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯ | ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

।। হাসনাত শাহীন ।।

প্রতিবছরই ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নতুন সাজে-নতুন রূপে হাজির হয় বইপ্রেমীদের মাঝে। প্রতিবছরেই নতুন এবং চির তরুণ এ মেলা যেন ফিরে আসে তারুণ্যের অপার মহিমায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তারুণ্যের ঝলমলে উপস্থিতিতে এবং বই কেনা ও বই কেনার জন্য ছোটাছুটি দেখে মঙ্গলবার ১৯তম দিনের শুরুতেই হালকা শীতের সাথে ঝলমলে সোনালী সূর্যের হাসির মতোই প্রকাশকদের মুখে হাসি ফুটে উঠছে। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশকরা জানাচ্ছেন সে কথাই।

তারা বলছেন-ক’দিন আগের ঝড়-বৃষ্টির রেশ কাটিয়ে মেলাপ্রাঙ্গণ এখন প্রায় সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। মেলা মাঠের অবস্থাও অনেক ভালো। গত কয়েকদিনের কর্মদিবসের তুলনায় এদিনের বিক্রিও অনেক ভালো হচ্ছে। আশা করি, আগামী দিনগুলোতে এবারের মেলা সবদিক থেকে পরিপূর্ণতা পাবে।

মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কর্মদিবসের দিন হওয়ার পরও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের এ প্রাণের বইমেলায় প্রাণের টানে ছুটে এসেছেন লেখক-প্রকাশক, বইপ্রেমী শিশু-কিশোর তরুণ, সকলেই। কর্মদিবসের দিন মেলার নীতিমালা অনুসারে বিকেল ৩টায় মেলার প্রবেশপথ খুলে দিতেই বিভিন্ন বয়সী বইপ্রেমী মানুষ প্রবেশ করে মেলা প্রাঙ্গণে। সাপ্তাহিক কর্মদিবসের এদিনের এ মেলায় আগতদের মধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর তারুণ্যের সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রবেশে অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই বসন্তের দখিনা হাওয়ায় ভেসে আসা প্রকৃতির মধূময় সৌরভে আর নতুন বইয়ের মৌ-মৌ গন্ধের মিশেলে তারুণ্যের চির নতুন প্রাণচ্ছোল উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ। তারুণ্যের বই কেনার বর্হিঃপ্রকাশ আর উচ্ছাস দেখে বারবারই কেবল মনে হচ্ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই অমোঘ বানীটির কথা ‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না’।

বিজ্ঞাপন

এমন দিনের মেলাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশকরা বলছেন, আজ সাপ্তাহিক কর্মদিবসের দিন হলেও মেলার সময়সীমার শেষ ১০ দিনে চলে এসেছে। যে কারণে এখন দিন যত যাবে বইমেলায় বাড়বে প্রকৃত বইপ্রেমীদের ঢল। শুধু রাজধানীর নয়, এ ক’দিনে মেলায় আসবে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তের বইপ্রেমী মানুষ। কেমন বই বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীরা জানাচ্ছেন-‘আজ যারাই মেলাতে এসেছে তাদের প্রায়ই বই কিনেছে।’

বিকেল ৩টা থেকে প্রায় শেষমুহূর্ত পর্যন্ত মেলায় ঘুরে-ঘুরে তারই প্রমাণ পাওয়া গেল। সত্যিই-যারাই মেলায় এসেছে তাদের সকলের হাতে হাতেই শোভা পাচ্ছিল সদ্য কেনা নতুন-নতুন বই। প্রকাশকরা আরও বলছেন, গতবারের তুলনায় এবারের মেলায় প্রথম থেকেই বেচাবিক্রি অনেক বেশি হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এবারের মেলায় সবধরনের বই-বিক্রি হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত বিক্রির শীর্ষে আছে উপন্যাসই। যথারীতি দ্বিতীয় স্থানে সাইন্সফিকশন এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে শিশুসাহিত্য। প্রতিবারের মতো এবারও গল্প-কবিতার বইয়ের বিক্রি অন্যান্য বইয়ের তুলনায় অনেক কম।

মঙ্গলবারের গ্রন্থমেলার আয়োজন:
এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিন মঙ্গলবার মেলা চলে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন-সুজন বড়ুয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন-আলম তালুকদার, আসলাম সানী, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম এবং আনজীর লিটন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ।

প্রাবন্ধিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ একটি বাতিঘর। সব জাতির জীবনে এমন আলোকবর্তিকা অর্জনের সৌভাগ্য হয় না। সে ক্ষেত্রে বাঙালি সৌভাগ্যবান জাতি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে বিশ্বে এমন দেশই-বা কয়টি আছে? সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তাকে উজ্জীবিত করেছে নতুনভাবে। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো ছড়াসাহিত্য ঘটেছে এর উজ্জ্বল প্রতিফলন। বিশেষত স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র সাহিত্য-মাধ্যম হিসেবে ছড়াসাহিত্য পেয়েছে পূর্ণ মর্যাদা। মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যকে দিয়েছে মৌলিক ভিত্তি।

আলোচকবৃন্দ বলেন, ছড়া কেবল শিশুতোষ বিষয় নয়। ছড়ার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় জাতির আত্মা। বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে এদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম উদ্ভাসিত হয়েছে অনন্য ব্যঞ্জনায়, আবার ছড়াই আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে দিয়েছে বিপুল বেগ; কারণ ছড়ার সহজাত আবেগ সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করে বিপুলভাবে। তারা বলেন, বাংলাদেশের ছড়াকাররা এ আবেগকে কোনো স্থূল অর্থে ব্যবহার না করে একে সংযুক্ত করেছেন গণমানুষের মুক্তির শাশ্বত সংগ্রামে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রূপায়িত হয়েছে নানা মাত্রায়। লোকায়ত ধারা থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এদেশের ছড়াসাহিত্যের মৌল মর্মে রয়েছে জনমানুষের মুক্তির চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্য তাই এক অভিন্ন অনুভবের নাম।

এ আলোচনা শেষে একই মঞ্চে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন-কবি রবীন্দ্র গোপ ও মতিন বৈরাগী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন-আবৃত্তিশিল্পী রেজিনা ওয়ালী ও এনামুল হক বাবু। এগনেস র্যাচেল প্যারিসের পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ পরিবেশন করে ‘গীতিনাট্য’ এবং শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলনের পরিচালনায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন : ‘সুর ধারা সংগীতায়ন’-এর পরিবেশনা। এছাড়াও এতে সংগীত পরিবেশন করেন-শিল্পী শারমিন সুলতানা, সুমন চন্দ্র দাস এবং মো. জাকির হোসেন। শিল্পীদের সাথে যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন অভিজিৎ রায় (তবলা), হোসেন আলী (বাঁশি), শ্যামা প্রসাদ মজুমদার (কী-বোর্ড) এবং এস এম তৌহিদ সরকার (দোতারা)।

‘লেখক বলছি…’ মঞ্চের আয়োজন:
এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিনে ‘লেখক বলছি…’ মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঁচ লেখকের নতুন বই নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। মেলায় এই প্রথমবারের মতো সংযুক্ত হওয়া এই মঞ্চের এ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন মতীন্দ্র মানখিন, ফারুক মঈনউদ্দীন, ওবায়েদ আকাশ, রেজা ঘটক, আলতাফ শাহনেওয়াজ এবং বদরুল হয়দার।

বুধবারের মেলা:
৮ ফাল্গুন ১৪২৫ বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯), এ দিনে মেলার প্রবেশ পথ খুলবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সওগাত পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন-ড. ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন-হাবিব আর রহমান, সোনিয়া নিশাত আমিন, আমিনুর রহমান সুলতান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন-ড. মুহাম্মদ সামাদ। এবং আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে থাকবে-কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন।

সারাবাংলা/এমআরপি

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন