বিজ্ঞাপন

নারী বাঁচুক নিজের মতো, যেকোনো দিনে, দিবসে

March 9, 2019 | 3:41 pm

সারাবছর নারীকে হেনস্থা করে, বসের সঙ্গে শুইয়ে প্রোমোশন পাইয়ে, নারীর রূপ-যৌবনকে ঝাঁ-চকচকে আলোর নিচে ক্যামেরাবন্দি করে, জোরপূর্বক বয়স্ক-পয়সাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, নিজের পছন্দের ক্যারিয়ারের সঙ্গে আপোস করিয়ে, বাসে মহিলা সিট নিয়ে হাউকাউ করে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ‘সেক্সি-মাল’ বলে এই পবিত্র দিনটিতে প্রত্যেকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে নারীকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আসন্ন ৩৬৪ দিনের অবমাননাকর আচরণের জন্য তৈরি হোন। এই দিনটি তাই জাতীয় জীবনে তো অবশ্যই, আন্তর্জাতিক জীবনেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক জীবনের কথা বলতে গিয়ে মাত্র মনে পড়ল, গতবছর বিমানবন্দরে আটকে গিয়েছিলাম প্রায়। ‘প্রথমবার দেশের বাইরে যাচ্ছেন? সঙ্গে কে?’ বলে ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পেছনে কেউ আছে কিনা খুঁজলেন। একজন মেয়ের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কোনো বয়স বা সুযোগ বোধ হয় নাই। জীবন থেকে মৃত্যু অবধি প্রলম্বিত তার শৈশবকাল। কারও না কারও হেফাজতে যার ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত, একা তার দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলবে কেন?

অফিসারকে যত বলি, একা যাচ্ছি ততই তিনি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান। বারবার জন্ম তারিখ, সাল পরীক্ষা করেন। আশেপাশের যাত্রীরা যান, আমি ইমিগ্রেশনে আটকে থাকি। বাধ্য হয়ে ব্যাগ থেকে অফিসের আইডি কার্ড বের করে, সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে, নারী সম্পর্কিত দু’চারটে কড়া লাইন শোনানোর পরে তবে ছাড়লেন।

বিজ্ঞাপন

যা বলছিলাম, নারী দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিবস উপলক্ষে পার্লারে বিউটি প্যাকেজে ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়, সুপার শপে গেলে গোলাপ পাওয়া যায়, এই দিবস উপলক্ষে নারী সহকর্মীটি শাড়ি পরে অফিসে এলে ব্লাউজের নিচ দিয়ে তার ক্লিভেজ-কোমর দেখা যায়, বৌ-মায়ের সঙ্গে গদগদ চেহারায় ছবি দিয়ে ‘নারী কত মহান’ প্রসঙ্গে পোস্ট দেওয়া যায়। তাতে করে নারীর কী এল গেল তা কেউ বলতে না পারলেও ব্যবসায়ীরা জমিয়ে পার্পল কালারের শাড়ির ব্যবসা, ফুলের ব্যবসা, পার্লারের ব্যবসা, রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করে নেন।

বিশ্বজুড়ে নারী পুঁজিবাদের সর্বোৎকৃষ্ট পণ্য, একে নিয়ে সারাবছরই ব্যবসা করা যায়। তার ওপর এমন একটা দিন এলে তো কথাই নাই। সঙ্গে একটু হ্যাশট্যাগ ‘রেস্পেক্ট উইমেন’ জুড়ে দিলে আরও ভালো। কারও কিছু বলার সুযোগ রাখা হলো না, সম্মানের কথা তো বলা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিঙ্গ সমতায় বিশ্বের মাত্র ছয়টি দেশ শতভাগ সাফল্য দেখাতে পেরেছে। বিশ্বের ১৮৭টি দেশের লিঙ্গ বৈষম্য পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৯তম, সাফল্য ৪৯.৩ শতাংশ। শতভাগ সফল দেশ বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, লাটভিয়া, লুক্সেমবার্গ ও সুইডেন। কাজের ক্ষেত্রে নারীদের আইনি অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলো লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করেছে।

এ তো পরিসংখ্যান মাত্র। যে মানদণ্ড ধরে লিঙ্গ সমতার এই জরিপ করা হয়েছে তাতে এই দেশে নারীদের ঘরের বাইরের লড়াইগুলো ঠিকভাবে উঠে এসেছে কিনা জানি না। কর্মজীবী নারীরা বাইরে যাওয়ার আগে পানাহার বন্ধ করে রাখে টয়লেট খোঁজার বিড়ম্বনা এড়াতে গিয়ে, প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী জরায়ু-মুখ ইনফেকশন বাঁধিয়ে রেখেছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর শারীরবৃত্তীয় কোনো অসুবিধার ওরিয়েন্টেশন নাই বললেই চলে, যতটুকু আছে ততটুকু হেনস্থা বৈ অন্যকিছু নয়। সরকারি-বেসরকারি কোনো অফিসেই এ সম্পর্কিত আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। উল্টো, কোনো সমস্যা হলে তা এড়িয়ে গিয়ে নারী কর্মীকে ছাঁটাই করার ঘটনাই বরং গতানুগতিক।

নারীর ঋতুকালীন, মাতৃত্বকালীন, মাতৃত্ব পরবর্তী কোনো সময়েই কর্মক্ষেত্র থেকে মানবিক সহায়তাটুকু এই দেশের নারীরা পান না। মুষ্টিমেয় যেসব কর্মক্ষেত্র এই দায় এড়ায় না, তারা প্রচলিতের প্রতিনিধি নয়। এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমপদমর্যাদার বেতন কাঠামোই যেখানে বৈষম্যমুক্ত হতে পারেনি, সেখানে আলাদা করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা পর্যালোচনা করে সে মোতাবেক তার প্রাপ্য অধিকার দেওয়ার কথা বললে তা হাস্যকরই বটে। তারচেয়ে নারী দিবস উপলক্ষে নারী কর্মীদের একটা করে রজনীগন্ধার ডাঁটা দেওয়াই বেশি সাশ্রয়ী।

নারীর সমতা, মর্যাদা, অধিকারের প্রসঙ্গে বড় পরিসরে পরিবর্তন রাতারাতি আনা অসম্ভব হলেও ব্যক্তিগত চর্চা দিয়ে তার কিছুটা উপশম অন্তত করা যায়। তার জন্য বড় বড় লেখায় নারীর গুণকীর্তন না করলেও চলে, গোলাপ-রজনীগন্ধার ডাঁটা না হলেও চলে। ঘরের নারী, অফিসের সহকর্মী, রাস্তার সহযাত্রীকে নিজের বোঝাটুকু, হীনমন্যতাটুকু, বিকৃতিটুকু চাপিয়ে না দিয়ে তাকে তার জীবন, তার কাজ, তার জায়গাটুকু ছেড়ে দিলেই চলে।

আলাদা করে আর কোনো চেষ্টা করতে হবে না। প্রত্যেকের নিজের একটা জীবন আছে। নারী, সে জীবনে বছরে একবার নারী দিবসের শুভেচ্ছা নিয়ে বা না নিয়ে যেভাবেই হোক নিজের যাপনটুকু করে যাক। নারী দিবসে, নারীর পিছুটান হননি, নারী স্বাধীনতার ইজারাদার হননি, নারীকে এগিয়ে নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছেন এমন প্রতিটি পুরুষের জন্য ভালোবাসা।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন