বৃহস্পতিবার ২১ মার্চ, ২০১৯ ইং , ৭ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

সবার থাকুক সুস্থ কিডনি

মার্চ ১৩, ২০১৯ | ১০:৫০ অপরাহ্ণ

।। ডা. এম এ সামাদ ।।

১৪ মার্চ পালিত হচ্ছে ১৪তম বিশ্ব কিডনি দিবস। এ দিবসের উদ্দেশ্য হলো সারা বিশ্বের মানুষকে কিডনি রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা। কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধে কী করণীয়, সে সম্পর্কে সবাইকে জানানো।

বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। প্রতি বছর ২৪ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ লোক আকস্মিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় প্রতি বছর। এর মধ্য থেকে প্রায় ১৭ লাখ রোগী অকাল মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া আকস্মিক কিডনি বিকল ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কারণে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এইডস, ম্যালেরিয়া, টিবি, হেপাটাইটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। এ কারণে কিডনি রোগকে বলা হয় ডিজিজ মাল্টিপ্লায়ার।

বিজ্ঞাপন

সুস্থ জীবন ধারা চর্চার মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি রোগের কিছু কারণ আছে, যেখানে মানুষের হাত নেই। যেমন বংশগত কিডনি রোগ, বয়স, লিঙ্গ, জন্মগত ক্রটি। পক্ষান্তরে প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলো কিন্তু জীবন ধারা চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, অলস জীবন যাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ইত্যাদি। তাই একটু সচেতন হলে সুস্থ জীবন ধারার চর্চার মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা অথবা নষ্ট হওয়ার গতি কমিয়ে আনা যায়।

আবার ডায়রিয়া, বমি, রক্তক্ষরণ, তীব্র সংক্রমণ; যেমন, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হেপাটাইটিস, ভেজাল খাদ্য থেকে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়। সবার জন্য সুপেয় পানি, জীবাণুমুক্ত খাবার, হাত ধোওয়ার অভ্যাস, প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন, সময় মতো টিকা নেওয়া আকস্মিক কিডনি বিকল ঠেকাতে পারে।

সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নষ্ট হওয়ার আগে কিডনি বিকলের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই যারা কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছে, তাদের সবাইকে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অথবা বংশে এসব রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যাদের ওজন বেশি, যারা অলস জীবন যাপন করে, যারা অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়, দীর্ঘ দিন ব্যথার ওষুধ খাচ্ছেন, যাদের কিডনিতে পাথর হয়েছে, ঘনঘন মূত্রতন্ত্রে প্রদাহ হয়, যাদের বয়স ৫০ এর বেশি তারা সবাই এই ঝুঁকিতে আছেন। তাদের অন্তত ৬ মাস পরপর রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনি ভালো আছে কি না, তা জেনে নিতে হবে। সুপ্ত কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করে চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা যায়। প্রস্রাব পরীক্ষায় মাইক্রোঅ্যালবুমিন ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন থেকে ইজিএফআর নির্ণয় করে কিডনি আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা বলে দেওয়া যায়। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সব হাসপাতালে যদি এই দুটি পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয়, তা হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অঙ্কুরেই রোগ শনাক্ত করে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যাবে।

যে কারণগুলো কিডনি রোগের জন্য বেশি দায়ী, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টরেল, সেগুলোর চিকিৎসার সুযোগ ধনী/গরিব নির্বিশেষে সবার থাকতে হবে। গরিবদের জন্য এসব ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিভিন্ন জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ২ কোটিরও বেশি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিকল হয়ে প্রতি ঘণ্টায় অকাল মৃত্যুবরণ করছে ৫ জন লোক। কিডনি বিকল হয়ে গেলে বেঁচে থাকার উপায় কিডনি সংযোজন অথবা ডায়ালাইসিস। কিন্তু এই চিকিৎসা এতই ব্যয়বহুল যে, এদেশের শতকরা ১০ ভাগ লোকেরও সাধ্য নেই তা বহন করার। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ কিডনি বিকল রোগী মৃত্যুবরণ করে অর্থাভাবে প্রায় বিনা চিকিৎসায়। কাজেই সবাইকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হলে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধিমালার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি পরিবর্তন আনতে হবে।

ডায়ালাইসিস সুবিধা সুদূর থানা হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। ডায়ালাইসিসের আর একটি পদ্ধতি আছে যাকে বলে, সিএপিডি বা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস, যা রোগী নিজের ঘরে বসেই করতে পারেন। এর জন্য কোনো দামি মেশিন বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবলের প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রতিদিন তিন ব্যাগ ফ্লুইড লাগে। সরকার যদি বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে এই ফ্লুইড সরবরাহ করে, তাহলে প্রত্যন্ত গ্রামের কিডনি বিকল রোগীদেরও চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে ধনী-গরিব; নির্বিশেষে সবাই যেন ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের খরচ বহন করতে পারেন, সে জন্য এই খাতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ভর্তুকি দেওয়া ও সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করা প্রয়োজন।

এ সুপারিশমালা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ, বিআরবি হসপিটালস লিমিটেড, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন