বৃহস্পতিবার ২১ মার্চ, ২০১৯ ইং , ৭ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে শাড়িকে তুলে ধরতে পেরেছি’

মার্চ ১৪, ২০১৯ | ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশেও নারীর ক্ষমতায়ন চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ- অন্য যেকোন উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। অনলাইন এখন যেকোন কাজের জন্য সবচেয়ে দ্রুতগামী ও কার্যকরী মাধ্যম। এদেশের অনেক নারী অনলাইনকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করছেন, রীতিমত সফলতার সাথে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সারাবাংলা এরকম কয়েকজন নারীকে আড্ডা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যারা অনলাইন প্লাটফর্মে নিজেদের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে রীতিমত সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। এদেরই একজন ফোয়ারা ফেরদৌস।

 

 ফোয়ারা ফেরদৌস,  প্রতিষ্ঠাতা, পটের বিবি 

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল ফোরায়া ফেরদৌসের। ইচ্ছা ছিল চারুকলায় পড়ার। কিন্তু পারেননি। স্নাতকোত্তর করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। এরপর পাঁচ বছর চাকরি করেছেন। পরে বন্ধু ও কাছের মানুষের অনুপ্রেরণায় আবার ছবি আঁকা শুরু করেন তিনি।

২০১৫ সালে পটের বিবি যাত্রা শুরু করে। তখন তাঁতিদের বোনা নকশার শাড়ি বিক্রি করা হতো। খুব সাদামাটা একরঙা ছোট পাড় বসানো তাঁতের শাড়ি নিয়েই শুরু হয় পটের বিবি। খুব অল্প সময়ে ফোয়ারা ফেরদৌস শাড়ি প্রেমীদের কাছে ভাল সাড়া পান। এরপর তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় নেওয়া বন্ধ করে নিজেই শাড়িতে ডিজাইন করতে শুরু করেন।

আমাদের দেশীয় পোশাকে ফ্রিদা কি পিংক ফ্রয়েড কিংবা ফেলুদা অথবা রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরার কাজটি করছেন ফোয়ারা ফেরদৌস। তার মূল চিন্তাটি হল সৃজনশীল ও শিল্পভিত্তিক কাজ।

পটের বিবি

পটের বিবির শাড়ি

ফোয়ারা ফেরদৌস জানান, ২০১২ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মেয়ে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হন। সেখানে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তারাই ছবি আঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ছবি এঁকে কিছু একটা করতে বলেছিলেন সবাই। সেই থেকে ছবি আঁকা পণ্য বানানো শুরু করেন।

ফোয়ারা বলেন, ‘এদেশে ছবি আঁকা বিভিন্ন নকশার পোশাকের চল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু এই ধরনের পোশাক শিক্ষার্থীদের বাজেটের বাইরে থাকতো বেশিরভাগ সময়। এমনকি আমি নিজেও এসব পোশাক পরতে পারতাম না। আমার মাথায় তখন ভাবনা এলো, যারা আমার মতো এই পোশাকগুলো পরতে পারেন না তাদের জন্য আমি ছবি এঁকে পোশাক বানাবো। তারপর দেখলাম আমার চারপাশে আরও অনেকে আছেন যারা নানা ধরনের কাজ পারেন। তাদের সাথে একটি গ্রুপে যুক্ত হলাম। কয়েকজন উদ্যোক্তা বন্ধুর সাথে রাঙতা মেলা করলাম।’

রাঙতা মেলা প্রসঙ্গে ফোয়ারা ফেরদৌস বলেন, ‘যখনই আমরা কোন মেলায় যেতাম দেখতাম প্রায় প্রতিটি স্টলে ভারতীয় ও পাকিস্তানী পণ্যের ছড়াছড়ি। দেশি পণ্যের স্টলগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়তো না। তখন আমরা যারা দেশি পণ্য নিয়ে কাজ করতে চাই তারা একটি মেলা করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। এই মেলার নামই ছিল রাঙতা মেলা। রাঙতা মেলার ব্যানারে লেখা ছিল, ‘এখানে পাকিস্তানী কোন পণ্য পাওয়া যায় না’। এই মেলার মাধ্যমে পটের বিবির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়।’

একটা সময় ছিল যখন মেয়েরা যেকোন অনুষ্ঠানেই শুধু শাড়ি পরতে  পছন্দ করতেন। নিত্যদিনের পোশাকে শাড়ি ছিলনা বললেই চলে। পটের বিবি নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে শাড়ি- এই চিন্তাটি নিয়ে কাজ শুরু করে।  তিনি বলেন, প্রথমে শাড়ি নিয়ে যখন ব্যবসায় নামলাম, তখন অনেকেই জিজ্ঞেস করতেন, অনলাইনে শাড়ি ব্যবসা তো আগে থেকেই আছে। আমি নতুন করে শাড়ির ব্যবসা শুরু করলাম কেন? আমার ভাবনা ছিল, ‘আমি এমন শাড়ি তৈরি করবো যেগুলো মেয়েরা অনুষ্ঠানে, বন্ধুদের আড্ডা, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সব জায়গায় পরতে পারেন। আমি নিজেই শাড়ির ডিজাইন করেছি এবং ভাল সাড়া পেয়েছি।’

আপনার পছন্দ নাকি ক্রেতার চাহিদা- পোশাক তৈরির সময় কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন জানতে চাইলে ফোয়ারা ফেরদৌস জানান, ‘স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্যই ব্যবসা করছি। আমি মনে করি, যদি পোশাকে ভাল ডিজাইন করি তাহলে আমার ঘরানার রুচিতেই ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে পারবো। কিছু ট্রেন্ড আমি ভাঙার চেষ্টা করেছি। যেমন পহেলা বৈশাখে সাদা শাড়ি লাল পাড় পরার রেওয়াজ আছে। এই জায়গাগুলো আমি ভেঙেছি। পহেলা বৈশাখে বিশেষ কোন রং বা থিম ব্যবহার করিনি তেমন। আমি যে ধরনের পোশাক পরতে পছন্দ করি সেগুলোই বাজারে আনি। প্রথমে ক্রেতা কম পেলেও একটা সময় অবশ্যই অনেক ক্রেতা আমার পণ্যের প্রতি আগ্রহী হয়। ব্যবসা করতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতাই হয়েছে আমার।’

প্রতিষ্ঠানের নাম পটের বিবি হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে ফোয়ারা বলেন, ‘আমি অনলাইনে প্রচুর কেনাকাটা করতাম। আশেপাশের বন্ধুরা কোন না কোন পন্য বিক্রি করতেন অনলাইনে। অনলাইনে কেনাকাটা করার কারণে একসময় দেখলাম, আমার বাসা থেকে বের হওয়াই বন্ধ হয়ে গেছে। আবার এতো অনলাইন প্রতিষ্ঠানের ভীড়ে আমি ভুলে যাই কোন জিনিস কোন পেজ থেকে কিনেছি। এই অভিজ্ঞতা যেহেতু আমার নিজেরই আছে, তাই প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়ার সময় প্রথমেই আমার মাথায় এলো, আমি এমন কোন নাম দিতে চাই না যেটা অন্যরা ভুলে যাবে। একবার শুনেই যেন ক্রেতার মনে থাকে এমন নাম বাছাই করতে চেয়েছি। যেহেতু শাড়ির ব্যবসা, তাই আমার মাথায় এলো পটের বিবি নামটি। তাছাড়া আমার কাজ দেশি পণ্য নিয়ে। পটের বিবি নামে একটি বাগধারাও আছে। প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে যখন বন্ধুদের সাথে আলাপ করি তখন ওরাও আমাকে কিছু নাম বাছাই করে দিয়েছে। কিন্তু আমার মাথায় অন্য কোন নাম আসছিল না। সবকিছু বিবেচনায় পটের বিবি নামটি সেরা মনে হয়েছিল।

 

পটের বিবি

ফোয়ারা ফেরদৌসের হাতে প্রতিকৃতি তুলে দিচ্ছেন সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ও মাহমুদ মেনন খান

তিনি বলেন, ‘পটের বিবি নামটি অনেকক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবেও ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ হলো, সেজেগুজে বসে থাকা। কিন্তু আমার মনে করি, সেজেগুজে থাকা দোষের কিছু না। কিন্তু বাহ্যিক প্রকাশ আমার কাজে প্রভাব ফেলবে না। এটাই আমি চাই। আমার পটের বিবি অর্থাৎ যারা আমার ক্রেতা তাদের বেশিরভাগই কর্মজীবী নারী। ব্যাপারটি অসাধারণ লাগে আমার কাছে। নাম পটের বিবি, কিন্তু সবাই কাজ করে যাচ্ছে।’

ফোয়ারা ফেরদৌস বলেন, ‘যখন কেউ এসে বলে আপনার কাজ আমার ভাল লাগে, নতুন ব্যবসা শুরু করার আগে আমার সহযোগিতা চায় কিংবা আমার মতোই কিছু করতে চায়, তখন মনে হয় আমি কিছু হলেও করতে পেরেছি। নিজের কাজ সার্থক মনে হয়। শাড়ির প্রতি কিছু মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে পেরেছি, এটাই বড় পাওয়া।

সারাবাংলা/টিসি/ এসএস

 

বিজ্ঞাপন
‘নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে শাড়িকে তুলে ধরতে পেরেছি’
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন