বৃহস্পতিবার ২১ মার্চ, ২০১৯ ইং , ৭ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৩ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মনে কি পড়ে?

মার্চ ১৫, ২০১৯ | ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

হাতের ধাক্কায় পরে গেলো জগ। প্লাস্টিকের গোলাপি ফুলের নকশা করা হলুদ জগ। পানি ভর্তি ছিল। মেঝে যেন থৈথৈ। হাতে যে দুটো নীল রঙের কাঁচের চুড়ি ছিল, তার একটিও টুং করে পরে গেলো, জগ সামলাতে যেয়ে। ভেঙেও গেলো নীল চুড়িটা। কে খেয়াল করলো তা? অন্যদিন হলো অভিমানে গাল ফুলতো, ঠোঁট ঝুলতো খানিকটা। কিন্তু আজ তো অন্যদিন নয়। আজ কেউ তো খেয়াল করলো না যে ভেঙে গেলো নীল রঙের ফ্যাকাশে কাঁচের চুড়িটা।

পানি পেলে ভালো হতো। মায়ের এক গ্লাস পানি খুব দরকার ছিল। শুকনো ঠোঁট, অভুক্ত শরীর, আর অবাক তাকিয়ে থাকা চোখ মায়ের। নীল রঙের চুড়িখানা ভেঙে যাওয়াকে উপেক্ষা করার মতন বোকা সে হতে পারে, কিন্তু থেমে থেমে কেঁপে ওঠা, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা মায়ের যে এক গ্লাস পানি খুব দরকার সে তা বুঝতে পারে। হোক তার বয়স দশ, অতো বোকা তো সে নয়। সে তো বুঝতে পারে।

তার বয়স দশ, কিন্তু সে তো বড় বোন। ছোট ভাইকে লুকিয়ে খামচি দেয়া, চোখের পাতায় চুমু দিয়ে আদর করা ছাড়া ও তো তার অনেক দায়িত্ব আছে। এই যেমন এখন থৈথৈ পানির মধ্যে বসে ভাইকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। কি অদ্ভুত, ভাইও কাঁপছে। ঠিক মায়ের মতন করে কাঁপছে। বাইরে উঠানের পেছনের শীর্ণ আম গাছটা যেমন করে কাঁপছে, ভাইও তেমন করে কাঁপছে।

বিজ্ঞাপন

শুধু সে কাঁপছেনা আজ। কেউ তাকে শেখায়নি যদিও, তবু সে জানে, থৈ থৈ সময়ে, কেঁপে ওঠা প্রিয়জনদের জড়িয়ে ধরে রাখতে হয়, শক্ত করে, গভীরে। এই যেমন সে জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে ছোট ভাইকে।

“তোরা যাবিনা?” কে যেন পেছন থেকে ধাক্কা দিলো। উঠে পড়লো সে।
“চিনতে পারবি?”

মাথা নাড়ে সে। পারবে। ঘরের কোণায় রাখা ট্রাঙ্ক খুলে, খয়েরি খাম থেকে সে বের করে ছবিটা। সাদাকালো ছবিটা। উঠে দাঁড়ায়। ভাই এখনো গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। শক্ত করে ধরে ছোট ভাইয়ের হাতের মুঠো। বেরিয়ে যায় তারা।

ছোট ছোট দু জোড়া পা। একজনের বয়স দশ, কিন্তু সে বোকা তো নয়। মৃদু হাঁটে তাঁরা। দ্রুত হাঁটলেই পথ ফুরাবে। তবু তারা মৃদু হাঁটে। তার এক হাতের মুঠোয় সাদাকালো ছবিটি। আরেক হাতের মুঠোয় ভাইয়ের হাত। তারা হাঁটে।

সে জানে এই মোড়ের কোণে, আলুর চপ, পুরি বিক্রির দোকান। সেখানেই তার গন্তব্য। কিন্তু এতো কাছে এসেও সে তো গন্তব্য খুঁজে পাচ্ছেনা। বোকা তো সে নয়। তবে সে কেন খুঁজে পাচ্ছেনা?

এই রাস্তার মোড়ে কারো কোনো গন্তব্য নেই। পোড়া। সবকিছু। গাছের শুকনো পাতা পুড়িয়ে যখন তারা ওম নেয়, তেমন পোড়া তো নয়। সেই পোড়ায় কেমন মিষ্টি সুবাস আছে, আর এ পোড়া কেমন গন্ধময়। ভয় লাগে। এ পথ এতো পোড়া কেন? কেমন থমথমে ঠিক যেন মায়ের মতন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের ঠোট কেমন শুকিয়ে আছে। আহারে মাকে এক গ্লাস পানি দিয়ে আসা হলোনা।

আহা এই তো চুড়িহাট্টা মোড়। সে তো চেনে। তারা ছবি হাতে ঘুরে বেড়ায়। পোড়া রাস্তা ধরে। ছোট ভাই সেই ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে রাস্তার মানুষকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমার বাপরে দেখসেন?” কেউ তো উত্তর দেয়না। সবার চোখ মায়ের মতন অবাক, এখানে সবার ঠোঁট কি শুকনা।

সে এবং তার ভাই হাঁটে, তারা ছবি হাতে নিয়ে হাঁটে, পোড়া পথে। এ অচেনা পোড়ার মাঝে সবাই কি যেন খুঁজছে, তারা দুজনও খুঁজছে, খুঁজেই যাচ্ছে, তাদের হাতে সাদাকালো সেই ছবি।

মনে পড়ে, চকবাজার, চুড়িহাট্টা মোড় আর নন্দকুমার দত্ত সড়ক? মনে পড়ে? আহা, মনে কি পড়ে?

কিযী’র জানালা থেকে: আমার শুধু একটি কথা আছে

সারাবাংলা/এমএম

মনে কি পড়ে?
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন