মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৮ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক ভঙ্গ, ৬ দফা প্রশ্নে অটল বঙ্গবন্ধু

মার্চ ১৭, ২০১৯ | ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

।। সুমন ইসলাম ।।

বিজ্ঞাপন

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনের ১৪তম দিন আজ, ১৭ মার্চ ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো বৈঠক হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে অটল থাকেন।

অন্যদিকে ইয়াহিয়া খান জনগণের ভোটে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানান। ফলে বৈঠকে শুরু হয় অচলাবস্থা। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা ভেঙে যায়। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর গাড়ি বের হয়ে আসে। আগের মতোই সাদা গাড়ির এক পাশে কালো পতাকা অপর পাশে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা উড়িয়ে বেরিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু। সাংবাদিকরা গাড়ি ঘিরে ধরলে বঙ্গবন্ধু গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন, আজ আলোচনার ফলাফল কী? বঙ্গবন্ধু বললেন, বলার সময় আসেনি। এর পরই সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বললেন, সংগ্রাম জোরদার হতে পারে।

বৈঠক ভেঙে যাওয়ার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে জনতার ঢল। বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্র নেতারা ঘোষণা করেন, বাংলার মানুষ এখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আর কোনো বৈঠক দরকার নেই। স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার বাসভবনে পৌঁছলে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের অনুরোধে তিনি তাদের সঙ্গে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হন। ৫২তম জন্মদিনে তার কামনা কি, জনৈক বিদেশি সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, জনগণের সার্বিক মুক্তি। সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি! আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোন মুহূর্তে আমাদের মৃত্যু হতে পারে। জন্মদিন উপলক্ষে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষ মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর রোডের বাসভবনে গিয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে শুভেচ্ছা জানায়।

সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, পূর্ববাংলা এখন স্বাধীন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এখন স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, আমার ৮৯ বছরের অতীতের সবকটি আন্দোলনের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম। কিন্তু একটি সার্বজনীন দাবিতে জনগণের মধ্যে বর্তমান সময়ের মতো একতা ও সহযোগিতা আমি এর আগে কখনো দেখিনি।

গভীর রাতে পাকিস্তান জেনারেলদের গোপন বৈঠক বসে ঢাকায়। মূলত ইয়াহিয়া খানের আলোচনা নাটকের আড়ালেই চলছিল ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা। এ রাতেই প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে টিক্কা খানের বৈঠক হয়। গভীর রাতেই জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। ঢাকায় সামরিক জান্তার বৈঠকে বাঙালি হত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত করা হলো।

টিক্কা খান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত নৃশংস কার্যকলাপের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিলে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ নিযুক্ত তদন্ত কমিশন মানি না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভূট্টোকে ঢাকা আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। লাহোরে পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকগণ পৃথক পৃথক বিবৃতিতে ভূট্টোর দুই অংশের দু’টি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলেন, সাধারণ নির্বাচন গোটা দেশের জন্য হয়েছে। দুই অংশের জন্য পৃথক পৃথক নির্বাচন হয়নি। কাজেই জাতীয় পরিষদে একটি মাত্র মেজরিটি পার্টি থাকবে। ভূট্টোর প্রস্তাব পাকিস্তানকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন