বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আমাদের প্রজন্মে ডা. রাজন একটাই!

মার্চ ১৯, ২০১৯ | ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘বাংলাদেশ আজ বুঝল না, কেমন চিকিৎসককে হারাল। বুঝবে আরও কয়েক বছর পর। মাত্র ৩৯ বছরের একজন চিকিৎসক যে কতটা মেধাবী হতে পারে, কতটা পজিটিভ হতে পারে, সেটা রাজনকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। আমরা বোঝাতে পারব না, রাজনকে হারিয়ে কেমন সম্পদকে হারালাম আমরা। বাংলাদেশ কেমন সম্পদকে হারাল।’

কথাগুলো সারাবাংলাকে বলছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সহকারী অধ্যাপক ডা. মীর নওয়াজেশ আলী। ওই একই বিভাগে তার সহকর্মী ছিলেন ডা. রাজন কর্মকার, দুই দিন আগে যিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

বিএসএমএমইউয়ের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিভাগের তরুণ চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. রাজনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও অবশ্য অস্পষ্টতা রয়েছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের মেয়ে ডা. কৃষ্ণা মজুমদার। তিনি নিজেও বিএসএমএমইউ সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তবে রাজনের স্বজন ও সহকর্মীদের অভিযোগ, তাকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ এর আগেও রাজনের স্ত্রীর স্বজনরা মিলে মারধর করে গুরুতর আহত করেছিলেন রাজনকে।

বিজ্ঞাপন

নেপথ্যে যে কারণই থাকুক, রাজনের এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মীরা। ডা. রাজনের সঙ্গে শেষ অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া ডা. মীর নওয়াজেশ বলেন, ‘আমরা একইসঙ্গে প্র্যাকটিসে ঢুকেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে একই রুমে বসতাম। কী বলব?’ বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি। একটু পর বলেন, ওর জীবনের শেষ ওটিতে ওর সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এক কথায় বলতে চাই, আমাদের প্রজন্মে যারা আমরা সার্জারি শিখেছি, কাজ করছি, আমাদের ফিল্ডে রাজনের মতো পটেনশিয়াল, নলেজেবল, স্কিল্ড— যাই বলি না কেন, ওর মতো কেউ ছিল না। হি ওয়াজ নট অনলি গুড, হি ওয়াজ এক্সট্রা অর্ডিনারি।

নওয়াজেশ জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের অষ্টম ব্যাচের (৩৯তম এমবিবিএস) শিক্ষার্থী ছিলেন ডা. রাজন। মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডা. রাজনের সঙ্গে শনিবার (১৫ মার্চ) রাতেও একইসঙ্গে অস্ত্রোপচারে অংশ নিয়েছেন ডা. নওয়াজেশ।

আরও পড়ুন: ডা. রাজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি

সেদিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন রাতেও আমরা একটি সফল অস্ত্রোপচার করি, যেটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। যে কারণে আমরা দু’জনেই খুব খুশি ছিলাম। একসঙ্গে রাতে খেলাম, উই লেফট উইথ আ হ্যাপি হার্ট, হ্যাপি স্মাইল। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একসঙ্গে। এই দীর্ঘ সময়ে আমার মনে হয়নি, রাজন কোনো কারণে বিমর্ষ বা চিন্তিত। অস্বাভাবিক কিছু আমি তার মধ্যে দেখিনি। তাহলে সে এত জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে করতে পারত না।

রোগীদের জন্য চিকিৎসা আর নিজের বিভাগ নিয়ে সবসময়ই রাজন ভাবতেন বলে জানান ডা. নওয়াজেশ। রাজনকে ‘প্যাশনেট সার্জন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ওর ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল সার্জারি। আমাদের এখানে অস্ত্রোপচার করার মতো নয়, এমন অনেক রোগীকেও অস্ত্রোপচার করা হয়েছে রাজনের উদ্যোগে। এখন তারা সুস্থ আছে। আমার ধারণা, আর পাঁচ বছর বেঁচে থাকলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গে ওর নামটাও শোনা যেত।

প্রাথমিকভাবে ডা. রাজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন বলা হলেও তার স্বজন ও সহকর্মীরা অভিযোগ করছেন, তার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। শুরুতে রাজদের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল পরে সোমবার (১৮ মার্চ) ডা. রাজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আ ম সেলিম রেজা বলেছেন, ‘মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছি। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কারণ জানার জন্য ভিসেরাসহ অন্যান্য উপাদান হিস্টোপ্যাথলজি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। সেগুলোর প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত কিছুই বলতে পারব না।’

ডা. রাজনের যখন ময়নাতদন্ত হচ্ছিল, মর্গের বাইরে তখন বিএসএমএমইউয়ের একাধিক চিকিৎসক উপস্থিত। সেখানেই তাদের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, কোনোভাবেই রাজীবের মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না। একটা মানুষ রাত ১টা পর্যন্ত অস্ত্রোপচার শেষ করে বাসায় ফিরে গেছেন। আর রাজনের পরিবার সূত্রে তারা জানতে পেরেছেন, মোবাইল ফোনে রাজনের মায়ের সঙ্গে তার স্ত্রীর অস্বাভাবিক কথা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে রাজনের মৃত্যু রহস্যময় বলেই তারা মনে করছেন।

বিএসএমএমইউ ডার্মাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফুল ভূঁইয়া সারাবাংলাকে বলেন, সাধারণত কেউ মারা গেল আমরা সবাই বলি, তিনি মেধাবী ছিলেন, খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু ডা. রাজন যে কী ছিল সেটা বলার মতো নয়। এমন কিছু কাজ শিখে এসছিল, এমন একজন পজিটিভ মানুষ ছিল, প্রতিমুহূর্তে সে তার নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করত। এই বয়সী একজনের কাছ থেকে এতটা প্রত্যাশা তো আমরা কেউই করি না।

‘কেবল আমরা নই, আজ ভিসি স্যারও (বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া) আফসোস করে বলছিলেন, আমার ওই ডিপার্টমেন্ট তো অন্ধ হয়ে গেল!’, বলেন ডা. সাইফুল। কিছু হলেই আনন্দ নিয়ে সবার সঙ্গে শেয়ার করাটাও ডা. রাজনের অভ্যাস ছিল বলে জানান তিনি।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহসনা হাবীব হেলাল সারাবাংলাকে বলেন, অত্যন্ত মেধাবী সার্জন ছিল রাজন। ওর যে বিষয়, ওরাল অ্যান্ড মেক্সিলোফেসিয়াল বিভাগ— এই বিষয়ে দেশে দক্ষ সার্জনের খুব অভাব ছিল, খুবই অভাব। কিন্তু এই বয়সে রাজন বিদেশ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে দক্ষ একজন সার্জন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

ডা. হেলাল বলেন, বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনার পর অনেকের মুখ-চোয়াল বিকৃত হয়ে যায়। এই সার্জারিতে সে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। পাশাপাশি খুব কম টাকাতেও এসব অস্ত্রোপচার করার সুনামও ছিল তার।

‘আমি বলব, ডা. রাজন এই সার্জারিতে এই বয়সে এক নম্বর একজন সার্জন ছিল,’— বলেন ডা. আহসান হাবীব হেলাল।

সারাবাংলা/জেএ/টিআর

আমাদের প্রজন্মে ডা. রাজন একটাই!
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন