বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

খোকা ফেরেনি আর, জোটেনি প্রাপ্য সম্মানটুকুও

মার্চ ২৪, ২০১৯ | ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

মারুফ আহমেদ

যুদ্ধ অনেকটা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত, যার তীব্র স্রোত আছড়ে পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও।

কয়েকশ মাইল পেরিয়ে সর্ব উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সাদী গ্রামে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধের ডাক এসে পৌছেছিল খুব অল্প সময়ে। এই গ্রামের ১৭বছর বয়সী তরুণ আব্দুল বাতেন তখন কেবল নবম শ্রেণী পাশ করে দশম শ্রেণীতে উঠেছেন।

শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, সারা দেশ জাগরণের জোয়ারে উত্তাল।

বইপত্র ফেলে দিয়ে যুদ্ধের ডাকে সাড়া দেয়ার মনস্থির করলেন কিশোর বাতেন। একদিন দুপুরে মা যখন ভাত নিয়ে বাড়িতে অপেক্ষমান, কিশোর বাতেন তখন কাউকে না জানিয়ে পাড়ি দেন ব্রহ্মপুত্র। যোগ দেন রৌমারী মুক্তাঞ্চলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এরই মধ্যে পরিবারের লোকজন খুঁজে বের করে কিশোর বাতেনকে, বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বৃথা চেষ্টা চালায় বড়ভাই আবুল কাশেম। পারিবারিক মায়ায় পড়ে বাড়ি ফেরার সম্ভবনা থাকতে পারে ভেবে পরিবারের কারো সাথেই দেখা করতে রাজী হন না বাতেন।

১৫দিনের প্রশিক্ষণ শেষে হঠাৎ একদিন খবর পান কাকড়িপাড়ার রিক্র্যুটমেন্ট ক্যাম্পে সৈন্য বাছাই করা হচ্ছে । ছুটে যান সেখানে, কোয়ালিফাইড হয়ে যোগ দেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চার্লি কোম্পানিতে।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে ধানুয়া-কামালপুর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় ঘটে জেড ফোর্স ব্রিগেডের, শহীদ হন সালাহউদ্দীন মমতাজসহ ৬৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জেড ফোর্স ব্রিগেডকে স্থানান্তর করা হয় সিলেটে। থার্ড ইস্ট বেঙ্গল জেড ফোর্সের অধীনে থাকায় আব্দুল বাতেনসহ পুরো কোম্পানী সিলেটে স্থানান্তরিত হয়।

১৩ অক্টোবর ১৯৭১- এ তুরা পাহাড়ের তেলঢালা থেকে শতাধিক গাড়ীবহর নিয়ে ৪০০ মাইল পথ অতিক্রম করে শেলা বিওপিতে পৌঁছায় জেড ফোর্স। জেড ফোর্সের অধীনে ছিল তিনটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (১,৩ এবং ৮) এবং তাদের এখানে আগমনের উদ্দেশ্য ছিল সেক্টর-৫ (কমান্ডার: মেজর শফিউল্লাহ) কে সহায়তা করা। জেড ফোর্সের শতাধিক গাড়িবহর সম্বলিত কনভয়ে চেপে আব্দুল বাতেনও পাড়ি দেন কয়েকশ মাইল পথ। লক্ষ্য ছাতক বিজয়ের মাধ্যমে দক্ষিণবঙ্গ স্বাধীন করা।

চারশো মাইল পথ পাড়ি দেয়া রণক্লান্ত সেই ৩য় বেঙ্গলকে ভারতীয় বাহিনীর জেনারেল গিল (পরবর্তীতে কামালপুর অভিযানে মাইনে আহত হয়ে পা হারান) নির্দেশ দেন পরদিনই ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণের। সম্পূর্ণ নতুন একটি এলাকায় এসে কম্পাস, সিগন্যাল সেট, বাইনোকুলারের মতো প্রয়োজনীয় যুদ্ধোপকরণ ছাড়া এই ধরণের একটি আক্রমণ পরিচালনা করা যে চূড়ান্ত বোকামি তা জানতেন ৩য় রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর শাফায়াত জামিল।

প্রথাগত যুদ্ধের নিয়মানুযায়ী ডিফেন্সিভ বাহিনীর একজনের বিরুদ্ধে এটাকিং বাহিনীর তিনজন সৈন্য প্রয়োজন হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ছাতকে ছিল ডিফেন্সিভে, কিন্তু তাদের এট্যাক করার মত পর্যাপ্ত সৈন্য ছিলনা ৩য় রেজিমেন্টের। আর যেসব সৈন্য ছিল তার মধ্যে আবার বেশিরভাগ ছিল মাত্র অল্প ট্রেনিং পাওয়া ছাত্র এবং সাধারণ জনতা নিয়ে তৈরি এফএফ বাহিনী।

এত এত কমতি থাকার পরেও দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা কখনই পিছপা হন নি। নিজেদের কমতির কথা কখনই ভাবেন নি।

পরিকল্পনামতো আলফা ও ব্রাভো কোম্পানি বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও আকবরের নেতৃত্বে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে তীব্র আক্রমণ শুরু করে। তাদের আক্রমণের প্রচণ্ডতায় টিকতে না পেরে সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা এক পর্যায়ে ফ্যাক্টরির অবস্থান ছেড়ে দিয়ে সুরমা নদীর ওপারের ছাতক শহরে পিছিয়ে যায়।

অন্যদিকে চার্লি কোম্পানী দোয়ারাবাজার নামক স্থানে রাজাকারদের ফাঁদে পড়ে। সম্পূর্ণ অচেনা জায়গা ও স্থানীয় গাইড না থাকায় রাজাকারেরা মুক্তিবাহিনীর লোক পরিচয় দিয়ে চার্লি কোম্পানীকে দোয়ারাবাজারের দিকে নিয়ে যায়। দোয়ারাবাজার ঘাটে আগে থেকেই পাকিস্তানিরা তৈরি হয়ে ছিল। পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার বাহিনী এবং পাকিস্তান থেকে আসা ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি তখন ঘাট এলাকায় প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল। হাওর-বিল পার হয়ে মোহসীন ও তার চার্লি কোম্পানি দোয়ারাবাজার ঘাটে নামার আগেই তারা গুলি চালাতে শুরু করে। খুব সম্ভবত রাজাকারদের কাছ থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের খবর পেয়ে যায়।

খবর পাওয়ারই কথা। প্রায় শ’খানেক গাড়ির বহর আমাদের। হেডলাইট জ্বালিয়ে এত গাড়ি আসছে, সেটা চোখে পড়া খুবই স্বাভাবিক। আর উঁচু পাহাড়ি রাস্তা বলে অনেক দূর থেকেই দেখতে পাওয়ার কথা। পাকসেনারা বুঝে গিয়েছিল, এ এলাকায় সৈন্য সমাবেশ হচ্ছে। সেজন্য তারা পুরোপুরি সতর্ক ছিল।

মোহসীনের কোম্পানিটা নৌকায় থাকা অবস্থাতেই পাকিস্তানিরা গুলি চালাতে শুরু করলে বেশ কয়েকটি নৌকা পানিতে ডুবে যায় এবং অতর্কিত আক্রমণে পুরো কোম্পানিই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দেড়শ যোদ্ধার প্রায় ষাট শতাংশ অস্ত্রই পানিতে পড়ে যায়। প্রাণ রক্ষার্থে সৈন্যরা হাওরের গভীর পানিতে অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিতে বাধ্য হয়।

এই বিপর্যয়ে চার্লি কোম্পানীর ২৬জন মুক্তিযোদ্ধা শহীন হন। শহীদ বাতেন সেই ২৬ জন শহীদদের একজন। মুক্তিযুদ্ধের উম্মাদনা, আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউ কিশোর বাতেনকে উত্তরবঙ্গের অঁজ পাড়াগাঁ থেকে তুলে এনে ছাতকে ফেলেছিল।

ভাত নিয়ে অপেক্ষমান মাকে রেখে বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়া বাতেনের বাড়ি ফেরা হয়নি আর। খোকার ফেরার অপেক্ষায় থাকা মা পথ চেয়ে ছিলেন বহুদিন। বিজয়ের পতাকা হাতে বাকি সহ-যোদ্ধারা ঘরে ফিরলেও ঘরে ফেরেননি বাতেন।
ছেলের শহীদ হওয়ার খবর বাতেনের মা আমেনা বেওয়া পান অনেকদিন পর, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন কর্নেল শফায়াত জামিলের চিঠিতে।

সমবেদনা জানানো সে চিঠিতে বাতেনের মা’কে ডেকে পাঠানো হয় দিনাজপুরে, হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় বাতেনের ব্যবহার্য কিছু জিনিস আর বকেয়া মাসের বেতন।

বাতেন শহীদ হয়েছেন আজ ৪৭ বছর হল। কেউ মনে রাখে নি বাতেন কে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তালিকাভুক্ত শহীদ বাতেনের মা প্রতিমাসে পেনশনের ৩ হাজার টাকা পেলেও জোটেনি শহীদ পরিবারের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও পেনশনের সামান্য টাকা ছাড়া আর কিছুই পান না আমেনা বেওয়া।

বাতেনের পরিবারকে কেউ ডাকেও না কখনও। প্রতিটি জাতীয় দিবসে যখন বাকী শহীদ পরিবারগুলোকে ফুল দিয়ে, ব্যাচ পরিয়ে সম্মান জানানো হয়, বাতেনের মা তখন আঁচলে চোখ মোছেন।
এ কান্না সন্তান হারানোর, এ কান্না উপেক্ষার ।
চুন-সুড়কীর দেয়াল ভেদ করে এ কান্না আমাদের কানে পৌঁছাতে পারে না।

[ ফুটনোটঃ দোয়ারাবাজার বিপর্যয়ে শহীদ সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আছে। থার্ড ইস্টবেঙ্গল বলছে ২৩জন, ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিন বলছেন ২৬জন। শহীদের সংখ্যা যাই হোক  না কেন দোয়ারাবাজারে যে একটা ম্যাসাকার হয়েছিল এবং শহীদ বাতেন যে দোয়ারাবাজারে শহীদ হন, তা ঐতিহাসিক সত্য]

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন

 

সারাবাংলা/আরএফ/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন