শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৪ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আটচল্লিশ বছরের স্বাধীনতা, নারী কতটুকু পেল?

মার্চ ২৬, ২০১৯ | ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

তিথি চক্রবর্তী

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার জ্যেষ্ঠ সন্তান রুমিকে পাঠিয়েছিলেন যুদ্ধে। বলেছিলেন, ‘দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা (একাত্তরের দিনগুলি)।’

যুদ্ধে গিয়ে রুমি আর ফেরেননি। স্বাধীনতার তিনদিন আগে জাহানারা ইমামের স্বামীকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। তিনি স্বামী, সন্তানকে যুদ্ধে হারিয়েছিলেন, কিন্তু হারাননি মাতৃত্ববোধ। তিনি কেবল রুমির মা ছিলেন না। ছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয়দাতা। মানুষের প্রতি এই নৈর্ব্যত্তিক ভালোবাসার কারণে তিনি হয়ে ওঠেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসে শহীদ আজাদের মা সাফিয়া বেগম। আজাদ ও তার বন্ধুরা গেরিলা দল ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। সাফিয়া বেগম এই মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রাখতেন, অস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে আসতেন, খাবার দিতেন।

এমন অসংখ্য নারী দেশের জন্য কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এই গল্পগুলো সবসময় আমাদের সামনে আসে না। তাই আমরা অনেকেই জানি না। তবুও মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর অবদান অস্বীকার করা উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কি রাজনৈতিক সবক্ষেত্রেই নারীরা মেধা, দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পুরুষের মত অংশগ্রহণ করছেন। তারপরও নারীর প্রাপ্য মর্যাদা কোথায়? দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু নারীরা কি স্বাধীন হতে পেরেছেন? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক নারী নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে গেলেও নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।

নারী স্বাধীনতা

রাষ্ট্র কী নারীবাদী চেতনাকে ধারণ করে?

নারীবাদ বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভূত একটি দর্শন। এই দর্শন নারী পুরুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তাছাড়া সমাজে যে লৈঙ্গিক বৈষম্য আছে তার বিরুদ্ধে কথা বলে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মতামতের স্বাধীনতাসহ সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।

যেকোন দর্শন সেই দেশের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গ্রহণ করতে হয়। তাহলে দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই দর্শনের ছাপ থাকে। কিন্তু এদেশে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীবাদী চেতনাকে ধারণ করার মানসিকতা কতটুকু?

এই রাষ্ট্রকে নারীবান্ধব অন্য অর্থে নারীবাদী চেতনার রাষ্ট্র মনে করেন কিনা জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। সরকারের বিভিন্ন পদে নারীর জন্য সংবেদনশীল লোক থাকতে পারেন, সম্ভবত আছেনই। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে লিঙ্গনিরপেক্ষতা কিংবা নারীবাদিতা আসার প্রসঙ্গ সমূহ ব্যাপক। একটা উদাহরণও দিই, নারীবান্ধব বা নারীবাদী চেতনার রাষ্ট্র প্রথমেই সিনেমা হলগুলো কমতে দেবে না। বরং সিনেমা হলে ভর্তুকিতে অল্প দামের টিকেটে ব্যাপক হারে নারীদের যেতে উৎসাহ দেবে। সেসব ছায়াছবিতে দাঁতমুখ খিচিয়ে মারতে থাকা নায়ক বা ভিলেনের বদলে সংবেদনশীল নারী চরিত্রের গল্প ‘এফডিসি’তে বানানোর ব্যবস্থা করবে। যদি হাতের কাছে অন্যকিছু পাওয়া নাও যায়, তাহলে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বা ‘কাজলরেখা’র মতো কোমল প্রেমের গল্প বানাতে উৎসাহ দেবে। হঠাৎ করে সিনেমার উদাহরণটা বাছাই করলাম কেবলমাত্র একটি ক্ষেত্র দেখানোর জন্য। তবে এটিই একমাত্র উদাহরণ নয়, এমন অজস্র জায়গা দেখানো সম্ভব।’

স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা

‘দাম দিয়াছি মায়ের অশ্রু বোনের সম্ভ্রম রে
বলতে কি কেউ পারো তোমরা, সে দাম কারও কম রে।
কত কুলের কুলাঙ্গনা
নাম নিয়াছে বিরাঙ্গনা…’

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারী সমাজ লড়াই করেছে, অস্ত্র নিয়ে ছেলেদের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, রক্ষা করেছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে অনেক নারীর ঠাঁই মেলেনি পরিবারে। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, একাত্তরের জননী বইয়ের লেখক রমা চৌধুরীর কথা। যুদ্ধ শেষে স্বামীর ঘরে ফিরে এলে কেউ তাকে গ্রহণ করেননি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে বহু নারী এভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন তা কেবল নারী বলেই। শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধই নয়, বিশ্ব ইতিহাসের আরও অনেক স্বাধীনতা যুদ্ধেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল সূর্যের মতো। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নারীর এই লড়াইয়ের কথা উঠলেই প্রথমে আসে বীরকন্যা প্রীতিলতার ওয়াদ্দেদারের নাম। তার নেতৃত্বে ইউরোপীয় ক্লাবে আক্রমণ হয়েছিল। বীণা দাস, মাতঙ্গিনী হাজরা, কনকলতা বড়ুয়াসহ নাম না জানা কত নারী জীবন দিয়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে।

বাঙালি কী আসলেই স্বাধীন হয়েছে?

সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল, শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি মানবিক সমাজ পাবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য অনেক বৈষম্যের মতোই লিঙ্গগত বৈষম্যও রয়ে গেছে। তাহলে আসলেই কী বাঙালিরা স্বাধীন হয়েছে, জানতে চেয়েছিলাম অধ্যাপক মানস চৌধুরীর কাছে।

তিনি বলেন, ‘এই প্রশ্নের অনেক আন্দাজ বা এজাম্পশন কাজ করে। এবং তাতে সমস্যা হয়। যেমন এখানে করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ একটা সমতাকামী যুদ্ধ ছিল এবং এই আন্দাজে আমার সায় আছে। যেমন এখানে কাজ করছে এটা বাঙালিদের একটা রাষ্ট্র বানানোরই যুদ্ধ ছিল; এই আন্দাজ মুক্তিযুদ্ধের অনেক সংগঠকদের বাসনা হলেও, অনেকেরই তার থেকে বৃহত্তর জাতিসমূহ সম্পৃক্ত একটা রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ছিল; আমার সেদিকে মত থাকবে। লৈঙ্গিক বৈষম্য পৃথিবীর নানাবিধ মুনাফাকেন্দ্রিকতা, সমরতান্ত্রিকতা আর মতাদর্শিক ডালপালা বিছিয়ে আছে। ফলে খানিক হেঁয়ালিপূর্ণ খানিক বিষাদপূর্ণভাবে বলতেই পারেন যে, স্বাধীনতা আসলে অর্জিত হয়নি।’

নারীর অংশগ্রহণ প্রতিটি ক্ষেত্রে

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো দুই নারী নাইমা হক ও তামান্না-ই লুতফী যুদ্ধ বিমান পাইলট হিসেবে যোগ দেন। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুনামের সাথে কাজ করছেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক নারী সদস্য। ট্রাফিক পুলিশ, সাংবাদিকতাসহ যে সব চ্যালেঞ্জিং পেশা আছে, সেগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ পিছিয়ে নেই। ক্রিকেট ও ফুটবলে নারীরা সাফল্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন চোখে পড়ার মতো।

তারপরও নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা চলাফেরার পূর্ণ স্বাধীনতা সে অর্থে নেই। এখনও নারীর পোশাক, বাহ্যিক চেহারা ও পেশা নিয়ে কটুক্তি করা হয়। পরিবার ও প্রথাগত নিয়ম কানুনের মধ্যেও নারীর সমান অধিকার নেই। নারী পুরুষের অধস্তন- এই বোধ পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রেই কাজ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘এখন নারীদের অর্জনের জায়গা অনেক। নারীরা ঘরে, বাইরে কাজ করছেন। তারপরও প্রকৃতভাবে নারী স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। এখনও ঘরের বউকে স্বামীর কাছে অনুমতি নিয়ে চাকরি করতে হয়। মাত্র শতকরা ১০ ভাগ মেয়ে নিজের মতো কাজ করার স্বাধীনতা পায়। গার্মেন্টসের একটি বড় অংশ মেয়ে। তাদের বেশিরভাগই পরিবারের কথায় গার্মেন্টসে কাজ করতে আসে। নারীর নিজের মতামতের স্বাধীনতা নেই।’

তিনি বলেন, ‘অনেক পুরুষ তার কর্মজীবী স্ত্রীকে বলেন, আমি অনুমতি দিয়েছি বলেই তুমি চাকরি করতে পেরেছো। এটি চূড়ান্ত অবমাননাকর কথা। পুরুষ অনুমতি দেওয়ার কে? নারী তার নিজের যোগ্যতায় চাকরি করেন। তাছাড়া যে মেয়েদের কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতে রাত হয়, সমাজের চোখে তারা খারাপ মেয়ে। পুরুষ কোন কাজে এগিয়ে গেলে সেটা পুরুষের সফলতা হিসেবে ধরা হয়। আর নারী এগিয়ে গেলে বলা হয়, ওর সংসার বলে কিছু নেই তাই পেরেছে। এই কথাগুলো নারীর জন্য অত্যন্ত অপমানজনক।’

নারী স্বাধীনতা

ধর্মের নামে মেয়েদের ঘরে বন্দী করা হয়

নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো ধর্ম ব্যবসায়ীরা ব্যাখ্যা করেন ভিন্নভাবে। তারা বলেন, ধর্ম মেনে চললে, পর্দা করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। পুরুষের আবার দোষ কি?

এদিকে ছোট ছোট শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তা কি পর্দা না থাকার কারণে? না অশালীন পোশাকের কারণে? যারা নূন্যতম ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান রাখেন তারা জানেন, একজন নারী সম্পূর্ণ বিবস্ত্র থাকলেও তাকে স্পর্শ করার অনুমতি কোন ধর্ম দেয়নি। তাছাড়া কেবল মানুষই পারে প্রবৃত্তির ওপর যৌক্তিক ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে। আর এজন্যই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করা হয়।

যারা কেবল যৌনতাকেই প্রধান করে দেখেন তাদের রুচি ও সংস্কৃতিবোধ এতোটাই স্থূল যে নারী নিপীড়নের ঘটনাগুলোর সাথে তারাই সম্পৃক্ত হন। তাই নারী নির্যাতনের কারণ কখনোই পোশাক নয়, এর কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। আর পুরুষতন্ত্র ধর্মকে ব্যবহার করে সুবিধামতো, নারীকে করে গৃহবন্দী।

এই প্রসঙ্গে শিক্ষক তানিয়া হক বলেন, ‘মেয়েরা কোথাও নিরাপদ না। ঘরে বাইরে সবখানেই নারী অনিরাপদ। ছোট ছোট শিশুরা এখন বাবা কিংবা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। কোথায় নারীর স্বাধীনতা? নারীরা বাবার বাড়ি কিংবা স্বামীর বাড়ি কোথাও স্বাধীন না।’

ভোগবাদী সংস্কৃতির কবলে নারী

অধিকাংশ নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকেই প্রধান করে দেখানো হয়। ত্বক ফর্সা করার প্রচেষ্টার মধ্যেই স্মার্ট হওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে এমন ধারণা দেওয়া হয়। দেহের সৌন্দর্য দিয়ে ক্রেতাকে পন্য কিনতে উৎসাহিত করার জন্যেই এসব আয়োজন। এই সংস্কৃতির প্রভাব পড়ছে গোটা সমাজের উপরই। ফলে নারীকে মনে করা হয় ভোগের বস্তু।

শিক্ষক তানিয়া হক বলেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের যোগ্যতায় প্রথমেই আসে মেয়েটি সুন্দর কিনা। তারপর তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখা হয়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে দেখা হয়, অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা কেমন চাকরি করে। কোন মেয়ের ডিভোর্স হলে সে সবার চোখে খারাপ হয়ে যায়। অথচ কোন পুরুষের ডিভোর্স হলে সেটাকে স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে মানা হয় এবং আবার বিয়ে করার পথ অনেকটাই তৈরি হয়ে যায়।’

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটুকু

বিগত সরকারগুলো নারী অধিকারে যেসব কাজ করেছে, সেগুলো যথেষ্ট কিনা জানতে চাইলে অধ্যাপক মানস চৌধুরী বলেন, ‘সরকারগুলো বড়জোর পলিসি বা নীতিমালার আশ্রয় নিয়ে কাজ করেন। লিঙ্গীয় সমতা সমাজের বৃহত্তর পাটাতনের মতাদর্শ বা ইডিওলজির কারিগরি বদলের উপর নির্ভর করছে। শিক্ষার নীতি বদলানোও পলিসিগত প্রসঙ্গ। কিংবা প্রচারমাধ্যমের স্বর ঠিক করা। আমি সেই অর্থে স্থূল “ফ্রি এক্সপ্রেশন” এর পক্ষের লোক নই। বরং লিঙ্গীয় সমতা, কিংবা জাতিগত সমতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে চাইলে শিক্ষা ও মিডিয়া দুই ক্ষেত্রেই গাইডেড পলিসি প্রয়োজন। কিন্তু আরও মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারগুলো লিঙ্গনিরপেক্ষ কিনা। আমি এই ব্যাপারে অত নিঃসংশয় নই।’

ইতিহাস বলে নারী চিরকাল অবরুদ্ধ ছিল না

দার্শনিক ফ্রেডারিক এঙ্গেলস দেখান যে, শুরুতে মানব সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। কিন্তু সমাজে যখন স্থায়ী সম্পত্তি ও তার মালিকানা তৈরি হলো তখনই মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ল। সম্পত্তিতে ব্যক্তি মালিকানা আসার পর পরিবার ও সম্পদের কর্তৃত্ব চলে গেল পুরুষের হাতে। সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রয়োজনে বংশধারা নিশ্চিত করতেই সতীত্ব রক্ষার নামে নারীকে গৃহবন্দী করা হলো। পরবর্তীতে ধর্মীয় ও নানা সামাজিক বিধিনিষেধ নারীর ওপর শৃঙ্খল এনেছে এবং নারী, পুরুষের বৈষম্য তৈরি করেছে।

নারী স্বাধীনতা

সমাধান কীভাবে?

বহু বছর আগে নারীদের দুর্দশা দেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘যে দেশের পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায়-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিকতা রক্ষাই প্রধান কর্ম ও প্রধান ধর্ম, আর যেন সে দেশে হতভাগা অবলা জাতি জন্মগ্রহণ না করে।’

অত্যন্ত আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেছিলেন বিদ্যাসাগর। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সেই আক্ষেপের জায়গাটি কী পরিবর্তন করতে পেরেছি?

শিক্ষক তানিয়া হক বলেন, ‘নারীর অর্জনের জায়গা বেড়েছে। কিন্তু এখনও মানুষের মধ্যে প্রচলিত কিছু কথা ও ধারণা আছে। যেগুলো নারীকে হেয় করে। নারী এখন সংসারের আর্থিক ভার নিতে সক্ষম। আবার ঘরের কাজগুলো তো করতেই হয়। তারপরও অনেকের মুখে শোনা যায়, পুরুষ সুযোগ করে দিচ্ছে বলেই নারী কাজ করতে পারছে। এ ধরনের কথার মধ্য দিয়ে নারীর মেধা, দক্ষতাকে খাটো করা হয়। নারীর কাজের একটা সীমিত গন্ডি করে রাখা হয়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এর জন্য দায়ী। তবে আমি মনে করি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কেবল পুরুষের না, কোন কোন নারীর মধ্যেও আছে। অনেক মেয়ে আছেন যারা অন্য মেয়ের ভালো থাকা কিংবা স্বাধীনতা দেখতে পারেন না। ঈর্ষা অনুভব করেন। এই ধরনের মানসিকতা দূর করতে হবে। তবেই নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।’

ছবি- ফারহানা আক্তার 

মডেল: জাকিয়া সুলতানা

সারাবাংলা/টিসি/এসএস/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন