শুক্রবার ২১ জুন, ২০১৯ ইং , ৭ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ক্ষতচিহ্ন আর গর্বের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে

মার্চ ২৬, ২০১৯ | ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নবদম্পতি রনজিৎ দে ও রাণী দে। কিন্তু ঘর-সংসার করা সম্ভব হয়নি তাদের। ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে তাদের। রণজিতের অপরাধ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন পরিচালনায় বাবা মধুসূদন দে’কে সাহায্য করা! অন্ধকার সেই কালরাতে হত্যা করা হয় মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে’ কে। মধুসূদনের স্ত্রীসহ পুরো পরিবারটিই বিশেষ টার্গেট হয়েছিল ইতিহাসের ঘৃণ্যতম অপারেশন সার্চলাইটে। হত্যা করা হয় এই পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে।

এছাড়া সেই রাতে টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে রাস্তায় হত্যা করা হয় কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে। ঘরে ঢুকে কবি মেহেরুন্নেসাকে কুপিয়ে হত্যা করে সশস্ত্র বাহিনী। ধ্বংস করে দেয় ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে ফেলে সব। বাংলার বুকে একে দেয় ক্ষতচিহ্ন।

আর এ সব নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিবরণ জানা সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’ শীর্ষক গ্যালারিতে মধুসূদনের ব্যবহৃত শার্ট, রণজিতে স্ত্রী রাণীর শাড়ি, নিজ হাতে লেখা কবি মেহেরুন্নাসার পাণ্ডুলিপি, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার নোটবইসহ সেই সব ক্ষতচিহ্ন আলোকচিত্র ও নিদর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বলছেন জাদুঘর ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ব হচ্ছেন তারা। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সম্মুখ নিদর্শন তাদের নাড়া দিচ্ছে আরও গভীরে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র আর তথ্য জানা যায়।

আগারগাঁওয়ের নতুন ভবনের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রয়েছে চারটি গ্যালারি। এসব গ্যালারিতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক, গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’ নামকরণের প্রথম গ্যালারীতে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কালপর্বে এই জনপদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রত্ননিদর্শন রয়েছে।

‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’ শীর্ষক দ্বিতীয় গ্যালারিতে  ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ঘটনা থেকে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী সরকার গঠন পর্ব পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গ্যালারিতে ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বর্বরতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ার যুদ্ধ এবং সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শন রয়েছে এই গ্যালারিতে। আরো রয়েছে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া বাঙালিদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে যাত্রা, সেখানে আশ্রয়, জীবনযাপনের ঘটনাবলি।

গ্যালারী ৩ ও ৪ এর নামকরণ করা হয়েছে ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ এবং ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। গ্যালারিগুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালির প্রতিরোধ গড়ে তোলার নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গণমানুষের দুরবস্থা, যৌথ বাহিনীর অভিযান, বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঢাকায় পাকিস্তানি দখলদারদের আত্মসমর্পণের নিদর্শন রয়েছে। ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে চারটি গ্যালারির প্রদর্শনী।

দ্বিতীয় গ্যালারীতে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি কক্ষে পাকবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনার ভিত্তি একটি ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কালরাতের সাফল্যের জন্য কী প্রয়োজন তাও বর্ণনা করা হয়েছে। অন্য একটি ছবিতে পাকসেনাদের কথোপকথনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘ওয়ারলেস কনভারসেশন বিটুইন কমান্ড হেডকোয়ার্টার এন্ড লোকাল ইউনিট’ শীর্ষক ওই ছবিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২৫ মার্চ রাতে কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল, তার তথ্য পাওয়া যায়।  ৯৯ থেকে ৮৮ কে ওয়ারলেসের ওই কথোপকথনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ড থেকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘ইউনিভার্সিটি এলাকায় শিকার হলো কত? আন্দাজ মতো বলো। কতজন খতম, জখম অথবা বন্দি। ওভার।’

তখন ৮৮ নং ওয়ারলেস থেকে উত্তর যায়- ‘দাঁড়ান, বলছি। হবে শ’ তিনেক। ওভার।’

৯৯ নং ওয়ারলেস থেকে বলা হয়- ‘খাস কাজ। তিনশ খতম, জখম নাকি বন্দি। ওভার।’ এবার ৮৮ এর উত্তর আসে, ‘আমি কেবল একটাতেই বিশ্বাস করি। ৩০০ সাফ, খতম। ওভার।’

গ্যালারিটিতে পাকিস্তানি সেবাবাহিনী কর্তৃক গ্রামগঞ্জে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, তাণ্ডবের পর ছিন্নবিচ্ছিন্ন ঘর, পড়ে থাকা লাশের পর লাশ, সবই বিভিন্ন ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

২৫ শে মার্চ অন্ধকার সেই কালরাত্রিতে হত্যা করা শিক্ষক, আইনজীবী, কবি-সাহিত্যকদের সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে এই গ্যালারিতে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দ্বিতীয় আসামি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যবহৃত ইউনিফর্ম ও বায়নোকুলারের দেখা মিলবে এই গ্যালারিটিতে। এতে বর্ণনা রয়েছে মোয়াজ্জেম হোসেনকে হত্যার কারণও।

মোয়াজ্জেম সম্পর্কে বলা হয়েছে, পিরোজপুরের মোয়াজ্জেম পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কাজ করতেন। তিনি বারবার বাঙালির অধিকার আদায়েরে সোচ্চার ছিলেন। পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অভিযোগে দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি অভিযুক্ত হন।

এই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তিনি দ্বিতীয়।  ২৫ মার্চ রাতের সামরিক অভিযানে মোয়াজ্জেমকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়। হত্যাভিযানের প্রথম শহিদদের তিনি ছিলেন অন্যতম। সেই রাতে পাকবাহিনীর একটি দল অ্যালিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে টেনে বাইরে এনে হত্যা করা হয়। মোয়াজ্জেমের ব্যবহৃত ইউনিফর্ম ও বায়নোকুলার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিয়েছেন কোহিনুর বেগম।

গ্যালারিতে এমন বর্ণনা রয়েছে ২৫ মার্চ ও তৎপরবর্তী সময়ে হত্যা করা কবি মেহেরুন্নেসা, মামুন মাহমুদ,  ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মশিউর রহমান, নীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মধুসূদন দে সম্পর্কে।

১৯৭১ এর ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ৩৫ জন প্রতিনিধি জাতিসংঘের মহাসচিব উ. থান্ট-এর কাছে গণহত্যা বন্ধের জন্য আবেদন জানায়। যে টাইপরাইটারে সেই আবেদন লেখা হয়েছিল তাও প্রদর্শিত হচ্ছে এই গ্যালারিতে। ওই টাইপরাইটারটির দাতা হারুন হাবীব। জেনোসাইড এর নিন্দার প্রথম প্রতিক্রিয়াও সন্নিবেশিত আছে এই গ্যালারিতে। গ্যালারির একটি ছবিতে বলা হয়েছে, পাকবাহিনী পরিচালিত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ যে জেনোসাইড এর লক্ষণ তার প্রথম প্রতিফলন মেলে ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড কতৃক ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টে প্রেরিত গোপন বার্তায়।

২৮ মার্চ প্রেরিত টেলিগ্রামের শিরোনাম তিনি দেন ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’। ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্ট গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক সংসদীয় প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর পরবর্তী ধারাক্রমও আছে এই গ্যালারিতে। অন্য একপাশে জাতীয় চার নেতার ব্যবহৃত পোশাক, চশমা ও লাইটারও প্রদর্শিত হচ্ছে। দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হিন্দু কাঠমিস্ত্রী নির্মিত চাঁদ-তারা খচিত ভবেরপাড়া খ্রিস্টান মিশনের চেয়ারটি সংরক্ষিত আছে এখানে।

বাকি গ্যালারিতে তুলে ধরা হয়েছে যুদ্ধজয় ও স্বাধীনতার কথা। আরও তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন পর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ, ব্যবহৃত অস্ত্র ও বীরত্ব গাথা।

নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়ার আদর্শ শিশু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  শিক্ষকরা পঞ্চম শ্রেণীর ৮০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষা সফরে এসেছিল জাদুঘরে। শিক্ষক পরিমল দাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে ইতিহাস সম্পর্কে সম্মখ ধারণা দিতে। সামনে ২৬ মার্চ তাই শিক্ষা সফর উপলক্ষে এখানেই আসা। স্কুলের ওই শিক্ষার্থীরা প্রতিটি গ্যালারি ঘুরে দেখেছে।’

আলোকচিত্র আর নিদর্শন দেখে কোন কোন শিক্ষার্থী তথ্য টুকে রাখছিল নিজের নোটবুকে। তেমনই একজন আমিনুল হোসেন ফাইয়াজ। সারাবাংলাকে ফাইয়াজ জানায়, কোন শব্দ বা বাক্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলনা করা যাবে না। সব তথ্য একদিনে মাথায় ধারণ করা সম্ভব নয় বলে সে কিছু কিছু তথ্য টুকে রাখছে। পরবর্তীতে এসব ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ধারণা নেওয়ার ইচ্ছে তার।

পাঁচ বছরের শিশু প্রত্যুষ প্রতিম সাহাকে জাদুঘরে নিয়ে এসেছিলেন মা স্মৃতি দাস। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা স্মৃতি সারাবাংলাকে বলেন, ২৬ মার্চ উপলক্ষেই ছেলেকে নিয়ে এসেছি। আমাদের যুদ্ধ, আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে তো শিশুদের এখন থেকেই ধারণা দিতে হবে। ছেলেও আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখছে।

বরিশাল থেকে আসা মো. মহসীন খান (৭০) বলেন, ‘এখানে এসে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি। ফেলা আসা মুক্তিযুদ্ধের সেইসব দিনের কথা মনে পড়ছে। ইশ, আমাদের সেইসব কী কষ্টের দিন!’

সারাবাংলা/ইএইচটি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন