বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৩ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!

মার্চ ৩১, ২০১৯ | ১:৪৪ অপরাহ্ণ

রেজানুর রহমান

ছবিটার দিকে তাকাতে পারছি না। কী প্রাণবন্ত দু’টি মুখ! ওরা স্বামী-স্ত্রী। চাকরি করতেন বনানীর এফআর টাওয়ারে একই অফিসে। স্বামীর সামনেই প্রিয়তমা স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা যান। জীবনের মায়া বড় মায়া। স্ত্রীকে চোখের সামনে মরতে দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন স্বামী। প্রাণ বাঁচাতে সুউচ্চ ভবন থেকে লাফ দেন। কিন্তু প্রাণে বাঁচেননি। স্বামীর নাম মাহফুজুর রহমান আর স্ত্রীর নাম রুমকি।

ফেসবুকে আসমা উল হুসনা নামে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী মাহফুজ ও রুমকীর একটি মায়াময় ছবিসহ একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, আগুনে পুড়ে একসঙ্গেই চলে গেলেন মিলব্যারাক এলাকায় বসবাসকারী রুমকি ও মাহফুজুর রহমান। ওরা দু’জনই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। একপর্যায়ে পুড়তে থাকা রুমকির শ্বাসকষ্ট শুরু হলে স্বামীর সামনেই মারা যান তিনি। তখন মাহফুজুর রহমান ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যান। দু’জনই একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন। ধারণা করা হচ্ছে, রুমকি ৩ মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা ছিলেন। কী করুণ মৃত্যু। এর দায় কার?

বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আবার দেখছি বিভিন্ন পর্যায় থেকে যে যেভাবে পারেন, অভিযোগের ফিরিস্তি দিতে শুরু করেছেন! এটা কেন করা হলো না। ওটা কেন করা হয়নি? এটা করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতো না! কত যে কথা। কত যে মন্তব্য বাতাসে উড়ছে! ঘটনা তদন্তে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’—কেন যেন এই কথাটাই বারবার কানের পর্দায় ধাক্কা দিচ্ছে।

এক অর্থে কথা তো ঠিকই। এমন তো নয়, ঢাকা শহরে এই প্রথমবারের এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটলো? মাত্র ৩৭ দিন আগে পুরনো ঢাকায় চকবাজারের চুড়িহাট্টায় এমনই একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তখন কত কথাই না বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রতিবোধে এটা করা হবে, ওটা করা হবে। হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা জাতীয় কত কথাই না বলা হয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনার পরও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, সে ব্যাপারে মোটেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ভাবটা এমন, এবারের মতো তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলো। কাজেই পরেরটা পরে দেখা যাবে?

বিজ্ঞাপন

মূলত ‘পরেরটা পরে দেখা যাবে’—এমন মানসিকতার কারণেই রাজধানীর নাগরিক জীবনযাত্রাকে স্বস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। অতীতে ঢাকা শহরে বাস করা ছিল অনেক আনন্দের এবং অহংকারের। বর্তমানে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে একেবারেই বিপরীত। জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে এই শহরে থাকতে হয় বলেই অনেকে ইচ্ছের বিরুদ্ধেও বসবাস করেন। কিন্তু একটি দেশের রাজধানী শহরের চিত্র তো এতটা আতংকের হতে পারে না! এই শহরের কোথায় আছে স্বস্তি? পথে নামবেন ভয়াবহ যানজট। বাজারে যাবেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখে নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করবে। চাকরির প্রয়োজনে অফিসে বসে আছেন। নির্বিঘ্নে অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা কোথায়? মাহফুজ আর রুমকির মতো আপনিও যে আগুনে পুড়ে যাবেন না, কে দেবে এই নিশ্চয়তা?

বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) বনানীর এফআর টাওয়ারে যখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল, তখন ভবনটিতে আটকে পড়েছিলেন শত শত অসহায় মানুষ! বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করছিল। আমার কখনো কখনো মনে হচ্ছিল টিভি পর্দায় যা দেখছি তা বাস্তব নয়। কোনো ছায়াছবি অথবা নাটকের প্রয়োজনে শুটিং করা হচ্ছে। অথচ শুটিং নয়। বাস্তবেই ঘটছে জীবনের করুণতম ঘটনা। প্রাণ বাঁচাতে সুউচ্চ ভবন থেকে ডিশ-এর তারে বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করে হাত ফসকে কয়েকবার ডিগবাজি দিয়ে কংক্রিকেটর রাস্তায় পড়ে গেলো একজন হতভাগ্য পুরুষ। সঙ্গে সঙ্গেই তার মৃত্যু হয়েছে। ভবনজুড়ে আগুনের ধোঁয়া উপেক্ষা করে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন আরও কিছু অসহায় মানুষ! দমকল বাহিনীর নিবেদিত প্রাণ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ধন্যবাদ দিতেই হবে দমকল বাহিনীকে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেভাবে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে উদ্ধার করেছেন, তা সত্যি প্রশংসা করার মতো!

তবু প্রশ্ন থেকে যায় ঢাকা শহরে এই যে এত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, এ ব্যাপারে আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হতে পারছি? বিভিন্ন পত্রিকায় পড়লাম বনানীর এফআর টাওয়ারের অনুমোদন আছে ১৮ তলার। তাহলে ভবনটি ২৩ তলা হল কীভাবে? অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটলে তো এই তথ্য প্রকাশিত হতো না। শুধু এফআর টাওয়ারই কি এই অনিয়ম করেছে? ঢাকা শহরের আর কোনো ভবন কি রাজউকের নিয়ম ভঙ্গ করেনি? ধারণা করা হচ্ছে, এফআর টাওয়ারের ঘটনার পর এখন হয়তো এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হবে এবং এটাও আগাম বলে দেওয়া যায় কিছুদিন পর হয়তো নজরদারি কমেও যাবে। ১৮ তলা ভবন ২৩ তলা হয়েছে। নিশ্চয়ই ভবন মালিক নির্বিঘ্নে এই অন্যায় কাজটি করতে পারেননি। এজন্য হয়তো ঘাটে ঘাটে নজরানাও দিতে হয়েছে। এ নিয়ে কিছু বলা মানেই উলুবনে মুক্তো ছড়ানো। কিন্তু ঘাটে ঘাটে যারা নজরানা নেন তাদের কি বিবেক বলতে কিছু নেই! একটি সুউচ্চ ভবনে হাজার হাজার মানুষ চাকরি করে। তাদের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব তো ভবন মালিকের। আগুন হয়তো বলে কয়ে আসে না। কিন্তু আগুন থেকে বাঁচার জন্যও কিছু পথ তৈরি করে রাখা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে বনানীর এফআর টাওয়ারে সমন্বিত কোনো সিঁড়ি নেই যেখান দিয়ে অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষ দৌড়ে নেমে আসতে পারবে।

যদি এই অভিযোগ সত্য হয় তাহলে তো মানুষ মারার ফাঁদ বলা যায় এই ভবনটিকে। ভবনে আগুন লাগলে চলন্ত সিঁড়ি আর কার্যকর থাকবে না। অসহায় মানুষকে সমন্বিত সিঁড়ি দিয়েই নিচে নামতে হবে। ঢাকা শহরের অনেক সুউচ্চ ভবনে সমন্বিত সিঁড়ির ব্যবস্থা নেই। কেন নেই? এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সজাগ? না কি আবার কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চোর পালানোর মতো বুদ্ধি বাড়ার পর কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে?

শুক্রবার রাতে এই লেখাটি লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম শনিবার সকালে অফিসে গিয়ে সারাবাংলায় লেখাটি পাঠাব। কিন্তু শনিবার ভোরে ঘুম ভাঙলো আমার মায়ের ফোন পেয়ে। সৈয়দপুর থেকে মা মোবাইলে ফোন করেছেন। এত সকালে মা সাধারণত ফোন করেন না। কোনো দুঃসংবাদ নয়তো? ফোনে মায়ের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন—বাবা তোরা ভালো আছিস? উত্তরে বললাম, হ্যাঁ, মা। আমরা ভালো আছি? হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন? মা বললেন, গুলশানে নাকি আগুন লেগেছে। তোদের বাসা তো গুলশানে। তাই মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। তোরা ভালো আছিস তো বাবা? ভালো আছি মা, বলেই মাকে আশ্বস্ত করে টেলিভিশন অন করতেই দেখি গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দমকল বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। অবাক বিস্ময়ে টিভি পর্দায় তাকিয়ে আছি। মনের ভেতর অনেক প্রশ্ন। বনানীর আগুনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার কেন গুলশানের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা? গুলশানের এই ডিএনসিসি মার্কেটেই দুই বছর আগে এর চেয়েও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পর কত সিদ্ধান্তই না নেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তগুলো কি বাস্তবায়ন করা হয়েছে? অভিযোগ উঠেছে, ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিনির্বাপণ সুবিধা ছিল না। তাই যদি হয়, তাহলে দুই বছর আগের ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নিয়েছে এই মার্কেটের মালিক, অবশ্যই ব্যবসায়ীরা?

টিভিতে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে আগুনে পোড়ার দৃশ্য দেখছি। এমন সময় হকার পত্রিকা দিয়ে গেলো। দৈনিক পত্রিকাটির প্রথম পাতাজুড়ে শুধুই বনানীর অগ্নিকাণ্ডের খবর ছাপা হয়েছে। ‘মৃত্যুকূপে ঢাকার জীবন’ শীর্ষক ব্যানার হেডলাইনের নিচে অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে একাধিক বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে। কারণগুলো হলো, ঢাকার ৯০% ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ভবন বানাতে মানা হয় না ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। নির্মাণের অনুমোদন দিয়েই দায় সারে রাজউক। ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা মনিটর করে না ফায়ার সার্ভিস। নিজস্ব উদ্যোগে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ নেই।

দুই বছর আগে যে ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন লেগেছিল, দুই বছর পর আবারও সেই মার্কেটেই আগুন লাগলো। তাহলে তো দেখি চোর পালালেও এদের বুদ্ধি বাড়ে না। বাহ! কী চমৎকার!

রেজানুর রহমান: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক, আনন্দ আলো।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন