রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘মায়ার খেলা’য় ওয়ার্দা রিহাব ও ধৃতি নর্তনালয়

এপ্রিল ৪, ২০১৯ | ৩:৫২ অপরাহ্ণ

আশীষ সেনগুপ্ত

নাট্যমঞ্চে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব গীতিনাট্যের হাত ধরে। আর এই নাটকগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল নাট্যকারই নন, যুগপৎ সুরস্রষ্টার ভূমিকাতেও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনী নিয়ে ১৮৮১-তে ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’ দিয়ে গীতিনাট্যের মঞ্চে প্রবেশ রবীন্দ্রনাথের। পরের বছর ১৮৮২-তে সেই রামায়ণেরই আরেক কাহিনী নিয়ে রচনা করেন ‘কালমৃগয়া’। সেই তরুণ রবীন্দ্রনাথই ২৭ বছর বয়সে এসে লিখলেন প্রথম মৌলিক গীতিনাট্য— ‘মায়ার খেলা’। প্রেম আর কল্পনার মিশেলে বাঁধা এই গীতিনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য গীতিপ্রাণতা, যারা সুরের বুণনে রবি ঠাকুর অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ইতালীয় অপেরা ও আইরিশ মেলোডিতে। ঘটনার স্রোত নয়, হৃদয়াবেগই এই গীতিনাট্যের প্রধান উপকরণ, যেখানে সংলাপগুলো সবই গানে গানে বাঁধা।

বিজ্ঞাপন

কল্পনা কাতরতায় আক্রান্ত এবং আবেগের অতি সরল প্রকাশে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘মায়ার খেলা’। সংগীতের জালে বাঁধা জটিল এক প্রেমের কাহিনি। এর আখ্যানভাগ রূপকনির্ভর। পুরো গীতিনাট্যে মায়াকুমারীদের রয়েছে এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নাটকের মূল চরিত্র প্রমদা, অমর ও শান্তার মানবীয় হৃদয়াবেগকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে। অমরের প্রতি শান্তার প্রেম প্রত্যাখ্যাত হয়, আবার প্রমদা অমরের প্রেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই অমর ভুল বুঝে শান্তার কাছে ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত তিনজনের কেউই তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার কাছে পৌঁছাতে পারেনা। পাওয়া না পাওয়ার এই দোলাচল তৈরিই মায়াকুমারীদের খেলা। আর এই খেলার সার্থকতার মধ্যেই নাটকের পরিসমাপ্তি।

কবিগুরুর এই গীতিনাট্যটিকে নৃত্যনাট্যের রূপে মঞ্চে নিয়ে আসছে নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যগুরু ওয়ার্দা রিহাবের গড়ে তোলা ‘ধৃতি নর্তনালয়’। ন্যাশনাল সোশিও কালচারাল এ্যাসোসিয়েশানের প্রযোজনায় নৃত্য ভাবনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনাতেও রয়েছেন তিনিই। তার দলের নৃত্যশিল্পীরাই মঞ্চে তুলে ধরবেন রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য অবলম্বনে নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’। রবীন্দ্রভারতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনিপুরী নৃত্যে উচ্চতর ডিগ্রিধারী ওয়ার্দা রিহাব তার এই নৃত্যনাট্য সম্পর্কে জানালেন—

বিজ্ঞাপন

‘মায়ার খেলা’ নৃত্যনাট্যটি আমরা পুরোটাই লাইভ করছি। ইদানিং অধিকাংশ নৃত্যনাট্য ফিউশন করে উপস্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে আমরা মূলধারাটা বজায় রেখে উপস্থাপন করছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে সৃষ্টি করে গেছেন, সেখানে কোনো রকম পরিবর্তন বা পরিমার্জন না করে আমরা এই নৃত্যনাট্য দাঁড় করিয়েছি। কোনো আধুনিকায়ন নয়, একেবারেই রাবীন্দ্রিক, শুদ্ধচর্চায়।”

“দর্শকদের বলতে চাই, আমি যেহেতু মনিপুরী নৃত্যশিল্পী, তাই এই নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে মনিপুরী নৃত্যকেই প্রাধান্য দিয়েছি। পুরো ‘মায়ার খেলা’টাই মনিপুরী নৃত্যের আঙ্গিকে করার চেষ্টা করেছি। তবে, প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনিপুরীর সঙ্গে ভরতনাট্যম ও কত্থক নৃত্যও ব্যবহার করছি। তিনটির মিশ্রণে আর শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা বজায় রেখেই পুরো পরিবেশনাটা। মনিপুরী নাচের ওপর শত ধরনের পরীক্ষামূলক কাজ রয়েছে, তা আমাকে শিখিয়েছেন আমার গুরু শ্রীমতি কলাবতী দেবী। সেই কাজের ধারাই আমি বাংলাদেশে সবসময় প্রয়োগের চেষ্টা করি। ‘মায়ার খেলা’তেও সেই ধারাটি প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেছি। নৃত্যের সঙ্গে যে মৃদঙ্গ, পুংলোন, বোলবানী, বলা যায় মনিপুরী নৃত্যের যত ধরনের আঙ্গিক, সবগুলোই আমরা ‘মায়ার খেলা’তে দেখাব। পাশাপাশি ভরতনাট্যম ও কত্থকের যে সংমিশ্রণ, সেটাকেও কোথাও বিক্ষিপ্ত মনে হবে না।”

দর্শক উপস্থিতিতে সরাসরি গীতি নৃত্যনাট্য পরিবেশনার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়— জানতে চাইলে ওয়ার্দা রিহাব বললেন, “এখন তো লাইভ করা খুবই কঠিন। কারণ শিল্পী, মিউজিশিয়ান ও নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে একসঙ্গে সময় মিলিয়ে একটা কাজকে উপস্থাপন করা— এ যুগে এটা প্রায় অসম্ভব। তাই অনেকেই রেকর্ডেড মিউজিক নিয়েই কাজ করে বেশি। আমরা ভাবলাম, রেকর্ডেড মিউজিক নয়, সরাসরি পরিবেশনায় যাব। একটা সময় পর্যন্ত দর্শক ও শিল্পীদের মধ্যে যে পরিবেশটা ছিল, সেটাকেই আমরা এই পরিবেশনায় আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এখন যদিও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রচুর নিরীক্ষা করা হচ্ছে, আমরা সেই নিরীক্ষায় যেতে চাই না। তবে, সোয়া এক ঘণ্টা ব্যাপ্তির এই নৃত্যনাট্যে নাচ, পোশাক ও সব ধরনের শৈল্পিক দিক থেকে নতুনত্ব থাকবে।”

 

দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণে শতভাগ আশাবাদী নৃত্যজগতের অন্যতম এই নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যগুরু। বললেন, “আমাকে অনেকেই এই নৃত্যনাট্যে তারকা শিল্পীদের নিতে বলেছিল। কিন্তু আমার ভেতরের ভাবনাটা ছিল, আমার দলে এতদিন ধরে যারা শুদ্ধ নৃত্যচর্চা করে আসছে, যারা শিল্পচর্চা হিসাবে শুধু নাচকেই বেছে নিয়েছে, সেই শিল্পীদের নিয়েই কাজ করতে আমি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। তাই তাদের নিয়েই পুরো কাজটা করেছি। দর্শকদের প্রতি এটা আমার চ্যালেঞ্জ, আমি যাদের তৈরি করে মঞ্চে নিয়ে আসছি, তাদের কাজ দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হতে বাধ্য।”

‘মায়ার খেলা’য় সংগীত পরিচালনা করছেন নির্ঝর চৌধুরী। নৃত্যনাট্যে মূল চরিত্র ‘প্রমদা’র ভূমিকায় রয়েছেন ওয়ার্দা রিহাব নিজেই। তার সঙ্গে ‘শান্তা’র চরিত্রে রয়েছেন ফারা সাওয়ার, যিনি ধৃতি নর্তনালয়ের একজন নিয়মিত নৃত্যশিল্পী। আর ‘অমর’ চরিত্রে বাবরুল আলম চৌধুরী, যিনি এখন রবীন্দ্রভারতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনিপুরী নৃত্যে মাস্টার্স করছেন।

‘মায়ার খেলা’ মঞ্চস্থ হচ্ছে আগামী ১২ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে, ২০০ টাকা দর্শনীর বিনিময়ে।

মণিপুরী সংস্কৃতির সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা মণিপুরী নৃত্য। মণিপুরী নৃত্যকলা তার কোমলতা, আঙ্গিক, রুচিশীল ভঙ্গিমা ও সৌন্দর্য দিয়ে জয় করেছে ভারতর্ষের অসংখ্য দর্শকের মন। শুধুমাত্র মণিপুরী জীবনধারা ও ধর্মাচরনের সাথে জড়িত এই নৃত্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৯১৯ সালে তিনি সিলেট ভ্রমণে এলে ৬ই নভেম্বর সিলেট শহরের অদুরে মাছিমপুর পল্লীতে বেড়াতে আসেন। সেখানকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মেয়েরা কবিগুরুকে অভ্যর্থনা জানান এবং পরে তার সম্মানে কবির বাংলোতে মণিপুরী নৃত্যের আসর আয়োজন করা হয়। দুপুরে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী গোষ্ঠলীলা এবং রাতে মণিপুরী রাসলীলা দেখানো হয়। কবিগুরু মণিপুরী নৃত্যের সজ্জা, সাবলীল ছন্দ ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হন এবং শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের এ নৃত্য শেখাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। আর তাই, শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে মণিপুরী নৃত্যশিক্ষক হিসেবে সিলেটের কমলগঞ্জের বালিগাঁও গ্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জিকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। এরপর শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্যের জন্য আলাদা শাখা গঠন করা হয়। রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও কাব্যময়তার সাথে মণিপুরী নৃত্যের সাবলীল গতি ও বিশুদ্ধ নান্দনিকতার মধ্যে বিশেষ সামঞ্জস্য থাকায় শান্তিনিকেতনে উচ্চাঙ্গ নৃত্যধারার মধ্যে মণিপুরী নৃত্য সর্বাপেক্ষা সমাদৃত।

সারাবাংলা/এএসজি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন