রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

উড়াও শতাবতী (১৭) || মূল: জর্জ অরওয়েল || অনুবাদ: মাহমুদ মেনন

এপ্রিল ৩, ২০১৯ | ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

<<শুরু থেকে পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তৃতীয় অধ্যায়

‘গর্ডন কমস্টক’ ফালতু একটা নাম। আর তার মধ্যে গর্ডন অংশটি আরও ফালতু। আসলে পরিবারটিই ফালতু। নামের গর্ডন অংশটি যে স্কচদের অবদান তাতে সন্দেহমাত্র নেই। এ ধরনের নামগুলো ইংল্যান্ডকে স্কচিকরণ প্রক্রিয়ারই অংশ যা গত পঞ্চাশ বছর ধরে চলে আসছে। ‘গর্ডন’, ‘কলিন’, ‘ম্যালকম’, ‘ডোনাল্ড’- এগুলো গোটা বিশ্বকে দেওয়া স্কটল্যান্ডের উপহার। এর সাথে সাথে তারা দিয়েছে গল্ফ, হুইস্কি, পরিজ এর মতো শব্দগুলো আর দিয়েছে ব্যারি ও স্টেভেনসনের সাহিত্যকর্ম।

সবক’টি শ্রেণির মধ্যে কমস্টকরা আবার সবচেয়ে ফালতু শ্রেণির। মধ্যবিত্তের মধ্যেও মধ্যবিত্ত। ভূমিহীন ভদ্দরলোক এরা। চরম দারিদ্রদশাতেও হামবড়া ভাবটা টিকিয়ে রাখে এতটা সতর্কতায় যেন একদা তারা অভিজাত ছিল ভাব-গাম্ভীর্যে তার কমতি না পড়ে যায়। ভিক্টোরীয় সম্মৃদ্ধির ঢেউয়ে যে পরিবারগুলো মাথা তুলেছিল তারই একটি, যেসব নাম সে ঢেউ মিইয়ে যাবার আগেই আবার উবে গেছে। বছর পঞ্চাশেক তাদেরও কিছু বিত্ত-বৈভব কিছু ছিল বটে, তবে তা গর্ডনের দাদাভাই স্যামুয়েল কমস্টকের আমলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কমস্টক দাদু, এভাবেই ডাকতে শেখানো হয়েছে গর্ডনকে, যদিও তার জন্মের চার বছর আগেই দেহত্যাগ করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এই কমস্টক দাদুর প্রভাব-প্রতিপত্তি যা ছিলো তা মৃত্যুর পরেও কিছুকাল বহাল ছিল- এমনকি কবর থেকেও চলত তার জারিজুরি। তবে জীবদ্দশায় তিনি যে বজ্জাত এক বুড়ো ছিলেন তা গর্ডনের আর অজানা নেই। গরিব আর ভিনদেশিদের ঠকিয়ে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। আর তা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন পিরামিডসম টেকসই এক দালানবাড়ি। জন্ম দিয়েছিলেন বারো পুত্র-কন্যার, যাদের মধ্যে এগারো জন টিকে যায়। আর অবশেষে হঠাৎ তার মৃত্যু হয় মস্তিস্কের রক্তক্ষরণে। কেনসাল গ্রিনে তার পুত্র কন্যারা একটি স্মৃতিফলক বসিয়েছে তাতে লেখা হয়েছে-
স্যামুয়েল জেকিয়েল কমস্টকের চিরভাস্বর স্মৃতির সুরক্ষায়। একজন বিশ্বস্ত স্বামী, দায়িত্বশীল পিতা আর দৃঢ়চেতা ইশ্বরসম পুরুষটি জন্মছিলেন ১৮২৮ সালের ৯ জুলাই, মৃত্যু ৫ সেপ্টম্বর ১৯০১। তার সন্তানেরা এই স্মৃতিপ্রস্তর রচনা করল। তিনি রয়েছেন যিশুর কোলে চিরনিদ্রায়।

কমস্টক দাদুকে যারা চিনতেন তারা এই শেষ বাক্যটি নিয়ে যেসব কটু-কাটব্য করেছেন তার পুনরাবৃত্তি না হয় নাই করা হলো, কিন্তু একথা বলতেই হয়- যে প্রস্তরখণ্ডে এই স্মৃতিবাক্য রচিত হয়েছে তার ওজন ছিল প্রায় পাঁচ টন। ইচ্ছাকৃত না হলেও মনোষ্কামনা হয়তো এই ছিলো যে কমস্টক দাদু যেন ওই পাথর ঠেলে ধরাধামে আর ফিরতে না পারেন। কোনো মৃতব্যক্তির স্বজনেরা তার সম্পর্কে সত্যিই কি ভাবছে তার একটা ছোটখাটো পরীক্ষা এই স্মৃতি প্রস্তরের আকার থেকে করা যেতেই পারে।
গর্ডন যতটা বুঝতে পারে কমস্টকরা ছিল অদ্ভুত এক নির্বোধ, অথর্ব, জীবম্মৃত পরিবার। বিষ্ময়কর পর্যায়ে ছিলো তাদের নির্জিবতা। আর তার জন্য দায়ী ছিলেন কমস্টক দাদু স্বয়ং। যদ্দিনে তিনি দেহত্যাগ করলেন, তদ্দিনে ছেলেরাও গায়ে গতরে বেশ বড়সড়। আর কোনো ধরনের চেতনাবোধ যাতে এই পুত্র-কন্যাদের মনে জাগ্রত হতে না পারে সে কাজটি তিনি সেরে ফেলেছেন অনেক আগেই। ভিম রোলার বাগানের ঘাষগুলো যেমন চাপা দিয়ে থাকে তেমনি সন্তানদের ওপর তিনি থাকতেন সদা উপবিষ্ট। ফলে তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সামান্য সুযোগটুকুও মেলেনি কখনো। এতে তারা ব্যক্তিত্বহীন, ব্যর্থই থেকে গেছে। ছেলেদের কারোই যথার্থ পেশায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি, কারণ কমস্টক দাদুর ইচ্ছায় প্রত্যেককেই এমন সব পেশা বেছে নিতে হয়েছে যা তাদের জন্য উপযোগী ছিল না। কেবল একজন- জন, গর্ডনের বাবা- কমস্টক দাদুর সামনে তার জীবদ্দশায় বিয়ে করার সাহসটুকু দেখাতে পেরেছিলেন। তাদের কারো পক্ষেই এই পৃথিবীতে এতটুকু দাগ কেটে যাওয়ার, কিছু সৃষ্টি কিংবা ধ্বংস করার, সুখী কিংবা একটু বেশি দুখী হওয়ার, এমনকি একটু ভদ্রস্থ আয় রোজগারের কল্পনামাত্র করা সম্ভব ছিলনা। আধা-ভদ্রস্থ ব্যর্থতার গহ্বরে নিমজ্জিত ছিলেন তারা সকলেই। তারা ছিলেন মধ্য-মধ্যবিত্ত সেইসব হতাশাগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি যাদের দিয়ে কক্খোনো কিচ্ছুটি হয়নি।

সেই ছোটবেলা থেকেই আত্মীয় স্বজনদের আচার আচরণ চরম হতাশ করেছে গর্ডনকে। যখন সে বালক, তখনো চাচা-ফুফুদের অনেকেই বেঁচে। প্রায় সকলেই দেখতে অনেকটা একইরকম- ফ্যাকাশে, অগোছালো, নিরানন্দ মানব-মানবী, সকলেই ভগ্নস্বাস্থ্য, দীনহীন। আরও লক্ষ্যণীয় হচ্ছে এদের ছিলোনা প্রজননের ক্ষমতাটুকুও। অনেক মানুষইতো, তাদের টাকা-পয়সা থাকুক কি না থাকুক পশুদের মতোই অনায়াসে জন্ম দিয়ে চলে একের পর এক বাচ্চাকাচ্চা। কমস্টক দাদুইতো ফুটিয়েছেন পুরো এক ডজন। কিন্ত তার মধ্যে টিকে যাওয়া এগারো জনের মধ্যে জন্ম নিয়েছে মোটে দুইজন- গর্ডন ও তার বোন জুলিয়া। আর এই ১৯৩৪ সাল অবধি তাদের কোনো সন্তান-সন্ততি জন্ম নেয়নি। কমস্টক পরিবারের শেষ সদস্য হিসেবে গর্ডনের জন্ম হয় ১৯০৫ সালে, এক অপ্রত্যাশিত শিশু, আর এর পর কেটে গেছে পুরো ত্রিশটি বছর, পরিবারে আর একটি শিশুমাত্র জন্ম নেয়নি, ছিলো কেবল মৃত্যুর মিছিল। তবে কেবল যে বিয়ে করা আর সন্তান জন্ম দিতেই ব্যর্থ, তা নয়, আসলে কমস্টক পরিবারের পক্ষে আর কিচ্ছুটি করা সম্ভব হয় নি। এদের সকলেরই বিধ্বস্ত, অভিশপ্ত, অগোছালো ঘরকুনো জীবন। তাদের কেউ কখনোই কিছু করতে পারেনি। তারা এমন ধরনের মানবসন্তান যারা কোন কাজ, তা যদি হয় সামান্য বাসে চড়া, সেই ঝক্কিটুকুও নিতে জানেনা, অন্যের কনুইয়ের ধাক্কায় তারা পিছনে পড়ে যায়, কোন কিছুরই কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছুতে পারেনা। আর আয় রোজগারের বিষয়ে তারা একেক জন স্রেফ নির্বোধ, অথর্ব।

পরের অংশ>>

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন