বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গারা কবে যাবে

এপ্রিল ৫, ২০১৯ | ৫:০৬ অপরাহ্ণ

কবির য়াহমদ

দেড়বছরের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসন গেড়েছে। লাখ-লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশে অত্যাচার-নিপীড়নের মুখে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে।  আর বাংলাদেশও বিপুল মমতায় তাদের দিয়েছে আশ্রয়, মাথার ওপর দিয়েছে ছাদ, দিয়েছে বেঁচে থাকার সমূহ সহযোগিতা-অবলম্বন। প্রাণ হারানোর সমূহ শঙ্কা শেষে প্রাণ বেঁচেছে তাদের।

দেশ থেকেও নেই তাদের দেশ। ওখানে ভিটেমাটি থাকলেও নেই তাদের সে অধিকার। শাসকের শোষণ, নিপীড়ন আর অত্যাচারকে সঙ্গী করে এতদিন পড়ে থেকেও শেষপর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তাই শেষ সম্বল প্রাণটা হাতে নিয়েই ছুটেছে সীমান্তে।  উদারতার বৈশ্বিক নজির সৃষ্টি করে এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্বের বুকে।

 মানবিকতার উত্তুঙ্গু সেই সময়ের পর এখন বাস্তবতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। এক মিলিয়নের বেশি লোককে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়সহ সামগ্রিক সহযোগিতা দেওয়া কেবল বাংলাদেশই নয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের জন্যেই কঠিন। সেই কঠিনের মুখে থাকা বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের সসম্মানে তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। একবছর ধরে বাংলাদেশ সরকারের সেই প্রচেষ্টা চলমান।  তবে, সেটা সফলতার মুখ দেখেনি এখনো।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গারা কবে যাবে, কবে নাগাদ তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে—এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।  তবে, দেশের বেশিরভাগই এই আলোচনায় ইতিবাচক হতে পারছেন না। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে না বলেই শঙ্কা অনেকেরই। এবং এই শঙ্কার পালে আরও বেশি হাওয়া লাগে তখন, যখন প্রত্যাবাসনের চুক্তি হওয়ার পরও মিয়ানমার সরকার তা মানে না।

ইতোমধ্যে জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয় বাংলাদেশ উপস্থাপন করেছে।  এ নিয়ে বাংলাদেশ  বিশ্বনেতাদের সমর্থন পেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে পারে, এমন সংবাদ ছড়ালেও তেমন কিছু হয়নি। রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক কোনো ধরনের শাস্তির মুখে না পড়ায় প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও সেটা এখনো শুরু করছে না মিয়ানমার।

 বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ না নিলেও মিয়ানমারের শীর্ষ নেত্রী অং সান সু চির প্রাপ্ত বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা প্রত্যাহার করলেও সেটা কেবলই ব্যক্তিগত অবস্থায় রয়েছে। মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগত কিছু কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়লেও সেটা কার্যত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হওয়ার মতো কিছু হয়নি। ফলে অবস্থাটা বদলায়নি।  রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি সু চির পাওয়া শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবিও উঠেছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নোবেল কমিটিকেও এনিয়ে কথা বলতে হয়। কমিটি জানায়,  আগে প্রাপ্ত পুরস্কার পরের কৃতকাজের জন্যে বাতিলের বিধান নেই।  তবে, কমিটির শীর্ষ ব্যক্তি বর্তমান অবস্থার জন্য অং সান সু চির সমালোচনা করেছেন।

 এক মিলিয়নের বেশি লোককে বাস্তুচ্যুত করেও মিয়ানমার বৈশ্বিক কোনো অবরোধের মুখে না পড়ায় তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের আগের অবস্থান পালটায়নি। প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও বাস্তবায়ন করেনি।  এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃতই বেকায়দায় বাংলাদেশ। এত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাকে আশ্রয়সহ আনুষঙ্গিক সুবিধা দেওয়া বাংলাদেশকে আর কতদিন টেনে নিতে হয়, সেটাও শঙ্কার। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সহসা ফেরানো যাচ্ছে না রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গ যখন আসছে, তখনই বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বলছে, রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অবস্থা রাখাইনে তৈরি হয়নি। এই সংস্থা আবার মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে সেই পরিবেশ তৈরিতে বাধ্য করার মতো কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে এখানে বিঘ্নিত হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থ। এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মূলত বেকায়দায় পড়ে গেছে বাংলাদেশ। ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ রাখাইনে নেই—এমন মন্তব্যে অন্যায় করেও লাভবান হচ্ছে মিয়ানমার।  আর মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেও ক্রমশ চাপে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

 এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বমানবতার স্মারক রেখেছে তার উপযুক্ত প্রতিদান পায়নি। বৈশ্বিক নানা সমাবেশ/অনুষ্ঠানে এজন্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বনেতারা ধন্যবাদ, অভিনন্দন জানালেও সেটা দিনশেষে সৌজন্যবোধই। মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক শেখ হাসিনা সম্মাননা পেলেও আরও বড় কিছুর দাবিদার ছিলেন তিনি। এই সব সম্মাননা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মানবিক কাজের স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের জনগণের সম্মানের উপলক্ষ ঠিকই, একইসঙ্গে আরও বড় কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া নিঃসন্দেহে।

মিয়ানমারের সামরিকজান্তা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালানোর সময়ে দেশে-দেশে বিশ্ববিবেককে যেভাবে জাগতে দেখেছি, দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কথিত সেই বিশ্ববিবেক গভীর ঘুমে নিপতিত হয়েছে। নির্যাতনের সময়ে অনেকেই বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ভারতসহ কিছু দেশ যখন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত বন্ধ করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কাউকে কঠোর শব্দ উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি। সীমান্ত বন্ধ করা দেশগুলো মানবিকতা দেখায়নি ঠিকই, তবে দিনশেষে তারাই জয়ী হওয়া পক্ষ।  কারণ ভিনদেশিদের আশ্রয় দেওয়ার সামর্থ্য তাদের থাকলেও তারা নিশ্চিতভাবেই ছিল দূরদর্শী। তারা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল, মুখরোচক ধন্যবাদবার্তা আদতে মূল্যহীন।

 রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সময়ে এবং এর অব্যবহিত পরে কিছু দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার শুভেচ্ছা দূতেরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। ওইসব ব্যক্তি বাংলাদেশের মানবিক কাজের প্রশংসা করেছেন, সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিক কিন্তু একটা সময় পর দেখা যাচ্ছে ওসব তাদের সৌজন্যবোধ ছাড়া আর কিছু নয়। তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করলেও প্রত্যাবসনে মিয়ানমারকে বাধ্য করার মতো অবস্থায় তারাও নেই। রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী নয়, এমনও সংবাদ বেরুচ্ছে।  এই সংবাদগুলো বাংলাদেশকে বেকায়দায় ফেলছে। এগুলোকে উপলক্ষ করে ইউএনএইচসিআর এবং বিভিন্ন সংস্থা তাদের সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য নির্ধারণ করছে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক নন—মিয়ানমারের এমন বক্তব্য যৌক্তিকতা পাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের অনেকেই যেতে আগ্রহী নন, মিয়ানমার তাদের ফেরাতে আগ্রহী নয়, বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমারকে তাদের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া ও ফেরত নিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতিতে নেই—এসব কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখন বাংলাদেশ চাইলেও এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত পাঠাতে পারবে না।  এখনো বাংলাদেশ মানবিক রোহিঙ্গা ইস্যুতে, এখনো বাংলাদেশ চায়, এর মানবিক সমাধান। কিন্তু মিয়ানমারসহ অন্যরা এ বিষয়ে এখনও নীরব। ফলে লাখ-লাখ  লোকের বোঝা বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কবে এই বোঝা মুক্ত হবে বাংলাদেশ—তা কেউ জানে না।

লেখক: সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন