বিজ্ঞাপন

বারবার সিদ্ধান্ত অদল-বদলে পার্টির শক্তি বেড়েছে: জি এম কাদের

April 8, 2019 | 11:07 pm

হোমায়রা ফারুকী, অতিথি প্রতিবেদক

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দলের গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারার ক্ষমতাবলে তার ছোট ভাই জিএম কাদেরের বিষয়ে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমে পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জি এম কাদেরকে সরিয়ে দেন এরশাদ। পরদিন সংসদ উপনেতার পদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেন তিনি। এর কয়েকদিন পর আবারও জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদে বহাল করেন এরশাদ। সর্বশেষ এরশাদ সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হবেন।

বিজ্ঞাপন

বারবার এরশাদের সিদ্ধান্ত বদলে রাজনীতি অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা হলেও বড় ভাইয়ের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জিএম কাদের। ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে জাতীয় পার্টির শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সারাবাংলাকে জাতীয় পার্টির নানা বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেন জি এম কাদের। তার এই সাক্ষাৎকারটি নেন অতিথি প্রতিবেদক হোমায়রা ফারুকী।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: অল্প সময়ের ব্যবধানে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং ফের সেই পদে পুনর্বহালের কারণ কী বলে মনে করেন?

উত্তর: স্পষ্টভাবে বলতে গেলে কারণ আমিও বুঝতে পারিনি। পার্টির সবকিছুই ভালোভাবে চলছিল। একটা স্ট্যাবিলিটিও ছিল পার্টিতে। হঠাৎ করে কেন এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তা আমার কাছেও অস্পষ্ট। যে কারণগুলো দেখানো হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। যেকোনো কারণেই হোক, কিছু মানুষ আমার প্রতি বিরক্ত। তারা কোন সুযোগ নিয়ে এটা করার চেষ্টা করেছে। যে অজুহাত বা দায়গুলো আমার ওপরে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অবাস্তব।

বিজ্ঞাপন

আমাকে ব্যর্থ বলা হয়েছে। আমি তিন বছরের মতো কো-চেয়ারম্যান ছিলাম। আমার সঙ্গে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সাংগঠনিক দায়িত্বে দুইজন মহাসচিব ছিলেন। তাদের একজন অল্পদিনের জন্য হলেও অন্যজন তিন বছরের কাছাকাছি সময় এই দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে যদি কোনো ব্যর্থতা থাকে, তবে তার দায় এককভাবে কেন আমার ওপরে পড়বে? দলের চেয়ারম্যানের অবর্তমানে আমাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। উনি (এরশাদ) সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ দিন। সেখানে তার সঙ্গে আমি চার দিন ছিলাম। বাকি ১০ দিনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে আমি কিভাবে ব্যর্থ আর কী কাজ দেখাব? সেজন্য আমাকে কেন ব্যর্থ বলা হলো তা আমার বোধগম্য না।

সর্বশেষ আমি ছিলাম সংসদে। সংসদের প্রারম্ভিক ও সমাপনী ভাষণ আমি জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দিয়েছি বিরোধীদলীয় নেতার নির্দেশে। দুইটি ভাষণই সংসদের ভেতরে এবং বাহিরে প্রশংসিত ও আলোচিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার বক্তব্যের সূত্র ধরে যেভাবে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন, তাতে আমার বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝা যায়। আমার ধারণা, সংসদেও আমি সব সংসদ সদস্যদের চেয়ে বেশি সময় উপস্থিত ছিলাম। সেখানেও আমি আমার অফিসে ছিলাম। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে নির্দেশনা দিয়েছি, দিকনির্দেশনা দিয়েছি নতুন সংসদ সদস্যদেরও। ৪ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ সংসদীয় দলের যে সভা ডাকেন, সেই সভা হয়েছিল আমার অফিসে। তাই সার্বিকভাবে ব্যর্থতা কোথায় তা আমার চোখে পড়েনি।

বিজ্ঞাপন

আরেকটা অভিযোগ করা হয়েছে, বিভাজন সৃষ্টির। কোথায়, কাকে আমি বিভাজন করতে চাইলাম বা কে বিভাজিত হলো দলের মধ্যে সেটা কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ জিনিসটি সাজানো বলেই মনে হলো। তবে যাই হোক না কেন, সেটার খুব একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকায় জনগণ এটা গ্রহণ করেনি। আর তাই আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী, সাধারণ জনগণের মধ্যে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করেছে। আমি তাদের কোনো ধরনের উসকানি দেওয়াতো দূরের কথা, কিছুই বলিনি।

কিছু মানুষ আমাকে জনসমর্থনহীন অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা বলেছিল, আমাকে সাধারণ নেতাকর্মীরা চেনে না। আমি নাকি তাদের সঙ্গে কথাও বলি না, তারা আমাকে পছন্দ করে না। রাজনৈতিকভাবে দেশের জনগণের কাছে আমার কোনো গ্রহণ যোগ্যতা নেই, এমন অপবাদও তারা প্রচার করছিল। হয়তোবা আমার ওপরে বিরাগভাজন হয়েই তারা এসব প্রচার করতো। কিন্তু জনগণ যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার জন্য আন্দোলন করে, তখন তাদের সব অপপ্রচার মিথ্যা হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আমার জন্যে শুধু রংপুরবাসী আন্দোলন করেছে, এটাও নানাভাবে প্রচার করার অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এটাও সিত্য না। এখানে জাতীয় পার্টির সব জেলার লোকই ছিল, তারা স্বতঃস্ফূর্ত আমাকে চেয়েছে। জনগণ আমার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছে, অনেক প্রোগ্রাম করেছে নিজেদের উদ্যোগে।

আর এর পরে যা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ কনসিকোয়েন্স। কারণ মানুষ তাদের আস্থার জায়গা থেকে আমাকে পছন্দ করে। আমার রাজনীতিকে তারা ভালোবাসে। তারা বিশ্বাস করে, আমি ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতি করি না। সব দিক বিবেচনা করে জনগণ যখন বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করেছেন, পার্টির চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে বলেছেন, তারা আমাকে চান এবং আমাকে ছাড়া জাতীয় পার্টি টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে, তখন তিনি আমাকে পদে পুনর্বহাল করেন।

আমাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল, তাই পদ ফিরিয়ে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে যেকোনো কারণেই হোক, আমার সহকর্মী বা যারা আমাকে অপছন্দ করছেন বা কোনো কারণে আমি যাদের বিরাগভাজন হয়েছি, সেটা আমার জন্য দুঃখজনক। আমি চেষ্টা করব সেটা দূর করে সামনে দিকে এগিয়ে যেতে।

প্রশ্ন: শুধু আপনার পদ নয়, মহাসচিব পদেও বেশ কয়েকবার অদল-বদল করা হয়েছে। বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টি সাধারণ মানুষের কাছে এখন হাস্যকর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এতে জাতীয় পার্টির ভাবমূর্তি কি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না ?

জি এম কাদের: ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেও এর যে কোনো ইতিবাচক দিক নেই আমি তা মনে করি না। এগুলো হয়ত ঝট করে করা হচ্ছে কিন্তু এই পরিবর্তনের সুফলও কিন্তু পাওয়া গেছে। জাতীয় পার্টির দাবি-দাওয়া নিয়ে সারাদেশে অনেকদিন আন্দোলন হচ্ছিল না কিন্তু আমাকে যেভাবে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করা হলো তার প্রতিবাদে সারাদেশের জনগণ সাড়া দিলো। আমার বিষয়টাই যদি দেখেন, বুঝবেন জাতীয় পার্টি আবার জেগে উঠেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আমি তাদের কাছে নেতা হিসেবে প্রিয়। যদি এই বহিষ্কার না হতো তবে সবাই মনে করত, এরশাদ সাহেব ওনার ভাইকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন। এখন কিন্তু সকল মানুষের কাছে ভিন্নধর্মী বার্তা গেছে। যোগ্যতার কারণেই জনগণ আমার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলেছে। হয়তবা সার্বিক ভাবমূর্তির জন্য এমন হওয়াটা ঠিক না। কিন্তু আমার জন্য এই পরিবর্তনটা মোটেও নেতিবাচক না বরং ইতিবাচক।

প্রশ্ন: জাতীয় পার্টির সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দলের ভবিষ্যৎ কী?

জি এম কাদের: জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটা একটা পটেনশিয়াল। বাংলাদেশের বড় তিনটি রাজনৈতিক দলগুলোর একটি। দেশ শাসনের অভিজ্ঞতাও আছে দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের সবখানেই জাতীয় পার্টির গ্রহণযোগ্যতা আছে। তৃণমূল পর্যায়েও আছে অনেক সমর্থক। ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনে জাতীয় পার্টি একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।  সঠিকভাবে জনগণের মন বুঝে, দেশ ও দেশের মানুষের প্রত্যাশা ও দেশের প্রয়োজন বুঝে যদি ঠিকমতন এগিয়ে যাওয়া যায় তবে আমাদের যে কাঠামো আছে; তাতে সেই কাঠামোর ওপর একটি বড় বৃক্ষ সৃষ্টি হতে পারে। আমি সবসময়েই বিশ্বাস করি যে, সামনের দিনগুলোতে আমাদের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

প্রশ্ন: সংসদে জাতীয় পার্টির ভূমিকা এখন কী হবে? আপনাদের তো নিশ্চয়ই দলীয় এজেন্ডা আছে। আপনারা কীভাবে এগুতে চান?

জি এম কাদের: সংসদে আমরা বিরোধীদল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখব। সংসদ অধিবেশনের প্রারম্ভিক ভাষণে এবং সমাপনী ভাষণেও বিস্তারিতভাবে বলেছি। সামনের দিকে জাতীয় পার্টির যেভাবে চলা উচিত ও আমাদের পার্টির দিক-নির্দেশনা আমি আমার বক্তব্যে বলেছি। শুধুমাত্র দলের জন্যে নয় বরং দেশের জন্যেও আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করব। সার্বিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা ধারাবাহিকতা ধরে রেখে কাজ করে যেতে চাই। দেশের মানুষের পক্ষে আমরা কথা বলে যাব। এমনভাবে এগিয়ে যেতে পারলে আমি মনে করি জাতীয় পার্টি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সারাবাংলা/এসবি/একে/এসবি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন