বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ঢামেক, পঙ্গু, ক্যান্সার, বক্ষব্যাধিসহ অগ্নিঝুঁকিতে ১৭৪ হাসপাতাল

এপ্রিল ১০, ২০১৯ | ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ঢাকা মহানগরের ৯৮ শতাংশ হাসপাতাল অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে। হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করে ফায়ার সার্ভিস সম্প্রতি এ তথ্য জানায়।

গত ১৪ এপ্রিল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার ঘটনার পর ২১ ফেব্রুয়ারিতে সংবাদ সম্মেলন করে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার বিষয়টি ছিল ওয়েকআপ কল। অধিকাংশ হাসপাতাল-ক্লিনিকে আগুন লাগলে রোগী ও স্বজনরা কী করে বেরুবেন, তাও তারা জানেন না।’

ডিজি ওইদিন বলেন, ‘অনেক হাসপাতাল এ স্টোরেজ সিস্টেম ঠিক নেই। হাসপাতালে রোগী নির্গমন ব্যবস্থা একেবারে নাজুক।’ ফায়ার সার্ভিস প্রতিনিয়ত ঝুঁকি মনিটরিং ও সে অনুযায়ী করণীয় সুপারিশ করে আসছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বিশেষ স্থাপনার প্রয়োজন জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, ‘ঢাকা মহানগরের যেখানে-সেখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে দুর্বল হাউসকিপিং, রান্নাঘর, বয়লার, কারপার্কিং বয়লার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়। সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।’

২০১৭ সালের ১২ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার চারটি অঞ্চলে ভাগ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নিয়ে কাজ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। ফায়ার সার্ভিসের হাতে তথ্য আসে দেশের বেশির ভাগ হাসপাতাল-ক্লিনিক অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

সে বছরেই ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত পুনরায় পরিদর্শন করে তারা অন্তত ৪২২টি হাসপাতালকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসিবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ১৭৪টি হাসপাতাল, ২৪৮টি হাসপাতালকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং মাত্র ১১টি হাসপাতালকে সন্তোষজনক হিসেবে ঘোষণা করে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে তারা পদক্ষেপ নিতে হাসপাতালগুলোকে সতর্কীকরণ চিঠি দেয় একাধিকবার, দেয় নির্দেশনাও। গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালগুলোতে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়েও নির্দেশনা দেন।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, এসব হাসপাতালগুলোকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে কয়কদফা নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বেশিরভাগ হাসপাতালই আমলে নেয়নি। যদি তারা দ্রুত ব্যবস্থা না নেয় তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এদিকে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল অগ্নিনির্বপাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

এসব ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের তালিকাতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল, মহাখালীর আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, নাজিরা বাজার মাতৃসদন হাসপাতাল, মনোয়ারা হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এম.এইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ, ল্যাবএইড হাসপাতাল, পপুলার ডায়গনস্টিক সেন্টার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিরপুরের মেরিস্টোপ বাংলাদেশ, ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হসপিটাল অ্যান্ড ডায়গনস্টিক কমপ্লেক্স, সিকদার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সরকারি ইউনানী আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতাল, ধানমন্ডি কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ধানমন্ডি মেডি এইড জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেড, বিএসওএইচ হাসপাতাল ও প্যানোরমা হসপিটাল লিমিটেড।

আর ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকাতে রয়েছে, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট ও হাপসাতাল, শমরিতা হাসপাতাল, সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার-২, ধানমণ্ডি মেডি এইড জেনারেল হাসপাতাল লি. ধানমণ্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতাল, ক্রিসেন্ট গ্যাস্ট্রোলিভার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, ধানমণ্ডি কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিএসওএইচ হাসপাতাল, প্যানোরমা হসপিটাল লিমিটেড, এবং মেরিস্টোপ বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখে সঠিকভাবে ভবন নির্মাণ করা খুবই জরুরি। নির্মিত ভবনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। শিক্ষা কারিকুলামেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরইমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

তিনি জানান, ‘ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ যেকোনো দুর্যোগকালীন সময়ে হাসপাতালগুলোর জরুরি প্রস্তুতি, মোকাবিলা ও করণীয়’ নিয়ে ৩৫টি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হয়েছে। এর আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রংপুর, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ২৪টি সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সালের জুন মাসে ‘স্ট্রেনদেনিং আর্থকোয়াক রেজিলিয়েন্সি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং এ প্রকল্প চলবে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত।

গত ৪ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনির্বাচনে সক্ষমতা বাড়াতে একটি বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তবে এর জন্য সময় লাগবে জানিয়ে বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে তাকে কী করে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সচিবালায়ে জানান।

মন্ত্রী বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে অগ্নিমহড়া করার নির্দেশনাও দিয়েছেন।’ হাসপাতালগুলোতে আগুন নির্বাপনে যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো পরীক্ষার জন্যও বলেছেন তিনি।

এদিকে, আগামী ১৬ থেকে ২০ এপ্রিল স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ পালন করা হবে এবং তার মধ্যে একদিন অগ্নি নির্বাপণ মহড়া করতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এছাড়াও একটি কমিটি করতে বলা হয়েছে যারা প্রত্যেক মাসে সভা হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তাজনিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

জানতে চাইলে খুবই অগ্নিঝুঁকিতে থাকা জাতীয় বক্ষ্যব্যাধী হাসপাতালের রেসপেরটরি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. বশীর আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘অগ্নিনির্বাপক হিসেবে প্রতিটি ওয়ার্ডে ফায়ার এক্সটিইগুইশার রয়েছে। আর হাসপাতালের সামনে প্রতিরোধমূলক বা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক ( অপারেশন্স) চিঠি দেওয়া হয়েছে দুইদিন আগে। তারা তাদের একজন ডেপুটি ডিরেক্টরকে দায়িত্ব দিয়েছেন আগামী ১৬ তারিখ থেকে বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহে তারা আসবেন এবং আমাদের প্রতিটি স্টাফকে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং মহড়া দেবেন।’

তিনি বলেন, ‘যারা ফিল্ড লেভেলে কাজ করেন তাদেরকেও আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যন্ত্রটা কীভাবে ব্যবহার করা সে বিষয়ে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ’

দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আগুনের ‍ঝুঁকিতে, ঢামেক নিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরুদ্দীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পরিকল্পনা শুধু না, আমরা অনেক কাজ করেছি এবং কিছুকিছু কাজ সামনে আরও করা হবে। কেবল পরিকল্পনা না। আমরা অ্যাকশনে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘কমপ্লিট যে ফায়ার সিস্টেম, সেই অর্থে আমরা বলতে পারি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছি। পুরনো ভবনে নেই-এটা সত্য কিন্তু হাসপাতালের ভবন-২ ও যেটাকে হাইড্রেন্ট সিস্টেম বলা যায়।’

হাসপাতালের পরিচালক আরও বলেন, ‘অগ্নি-নিরাপত্তার সরঞ্জামগুলো অনেকদিন ব্যবহার হয় না। তাই অকার্যকর আছে কিছু, কিছু রিপেয়ার করতে হবে। আর এ জন্য আমরা বাজেটও চেয়েছি। হয়ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা পেয়ে যাব। আর পেয়ে গেলেই পুরোপুরি কার্যকর করা হবে। তবে আমাদের যে ফায়ার এক্সটিংগুইশার রয়েছে সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ রয়েছে এবং ব্যবহার করার মতো লোক রয়েছে। বিশেষ করে এই হাসপাতালের ২৫০ এর মতো আনসার সদস্য রয়েছে তারা সকলেই ফায়ার ফাইটিং এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যার জন্য ছোট ছোট ফায়ার যখন হয়েছে তখন আমরা টেরও পাইনি, তারাই নির্বাপণ করেছে। তবে পুরনো ভবনে এখন নতুন করে হাইড্রেন্ট সিস্টেম করা যাবে না, দুইবার সার্ভে করেছি।’

এ কে এম নাসিরুদ্দীন আরও বলেন, ‘ফায়ারের সাজেশন নিয়েছি এবং কিছু কিছু কাজ এরইমধ্যে করা হয়েছে। কিন্তু ‘লংটার্মে’ ব্যাপকভিত্তিক যে কাজ সেটা করতে আমাদের বেশ বড় বাজেট লাগবে যেটা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। যেহেতু আমাদের ইমিডিয়েট ফায়ার কন্ট্রোল করাকে আমাদের হাতেই আছে এবং আপডেট আছে। আমরা ফায়ার সার্ভিসের কাছে সার্পোট চেয়েছিলাম, একটা ইমিডিয়েট স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন করে দেওয়ার জন্য। ফায়ারের যে ভেইকেল রয়েছে সেটা থাকবে, যেটাতে পানি থাকবে এবং ছয়জনের মতো ফায়ার ফাইটার থাকবে যারা হাসপাতালেই ২৪ ঘণ্টা থাকবে। এই স্যাটেলাইট ফায়ার স্ট্যাশনের জন্য তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং চিঠিও দিয়েছি তাদের কিছুদিন আগে। তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সেটা সময় লাগবে।’

সারাবাংলা/জেএ/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন