বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘আমার মেয়েকে ওই এলাকায় গোসলও দিবা না’

এপ্রিল ১১, ২০১৯ | ৭:৪৩ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘নুসরাতের মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়ার পর ধীর পায়ে মেয়ের বেডের পাশে আসেন তার মা। এসে কলেমা পড়ে মেয়েকে চুমু দেন। সে সময় তিনি শুধু একটা কথাই বলেন, আমার মেয়েকে ওই এলাকায় গোসলও দিবা না, আমার মেয়েকে এখানেই গোসল দিবা, আমার মেয়েকে কোনোভাবেই ওখানে গোসল দিবা না’—একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে এসব কথা জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. হোসাইন ইমাম।

নুসরাতের জানাজায় হাজারও মানুষ, দাদির পাশেই চিরঘুম

নুসরাতের মৃত্যুর সময়ের কথা বলতে গিয়ে বার বার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ডা. হোসাইন ইমাম। তিনি বলেন, ‘সে সময় তার চোখের পানি আমাদের সবাইকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। এমন একটা পর্যায়ে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন, তাকে তখনই আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেই। নুসরাতের দিকে তখন তাকানো যাচ্ছিল না, ওর চেহারাটা আসলে তাকানোর মতো ছিল না। ভাসা ভাসা চোখ…এটা আসলে, আসলে..’

বিজ্ঞাপন

এটা আসলে আমাদের এত একটা…। কথা শেষ হয় না এই চিকিৎসকের।

নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের সহকর্মীদের অনেককেই দেখেছি, পাশে থেকে কাজ করছে আর চোখ মুছছে, এটা আসলে—পুরো পরিবেশটাই ওরকম ছিল, বলে বোঝানো যাবে না, পরিস্থিতিটা ওখানে এতটাই হৃদয়বিদারক ছিল, এতটাই আমাদের ছুঁয়ে গিয়েছে। আমরা আসলে মানুষ তো, চিকিৎসকের আগেও কিন্তু আমরা মানুষ।’

নুসরাত মারা যাওয়ার সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাল সারাদিন সব চিকিৎসকই হাসপাতালে ছিলেন। সাড়ে ছয় বা সাতটার দিকে তারা হাসপাতাল ছেড়ে গেলেও নুসরাতের খারাপ অবস্থার কথা শুনে আবার সবাই হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সব চেষ্টা করেও নুসরাতে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’

ঠিক কী কারণে নুসরাতের মৃত্যু হলো, উপস্থাপক মিথিলা ফারজানার এ প্রশ্নে ডা. হোসাইন ইমাম বলেন, ‘আমাদের শরীরের ৮০ শতাংশ চামড়া শরীরের প্রটেকশন দেয়। কিন্তু সেই চামড়া যখন পুড়ে যায়, তখন জীবাণু খুব সহজে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সংক্রমিত হয়ে যায়। নুসরাতের পুরো শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। সংক্রমণের হার এত বেশি ছিল যে তার কিডনি, ফুসফুসসহ প্রতিটি অঙ্গে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।’

‘তার ফুসফুসের মধ্যেও সংক্রমন হয়ে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে হৃদস্পন্দন কাজ করছিল না। ওই সময়ে আমাদের ওপর দিয়ে মনে হয় ঝড় বয়ে গিয়েছে। আমরা চেষ্টা করছিলাম, আমাদের সর্বস্ব দিয়ে নুসরাতকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু আমরা পারিনি, তার রক্ত এবং ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান নুসরাত।’

ডা. হোসাইন ইমাম বলেন, ‘আমরা এরকম একটা ঘটনার বিচার চাই। আজকে যদি নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো না হতো, যদি যৌন হয়রানির যে বিষয়টা এসেছে, তার মধ্যেই থাকতো, সে বিচার পেতো কি-না।’ আসলে হওয়া উচিত মন্তব্য করে ওই চিকিৎসক বলেন, নুসরাতের বিষয়টি যখন প্রধানমন্ত্রী জানলেন, আমরা যখন তাকে জানালাম, উনি কিন্তু তৎক্ষণাত বলেছেন, যেই হোক, অপরাধী যে পর্যায়েরই হোক, যেখানেই থাকুক, খুঁজে বের করে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক।’

‘এ বার্তাটা এখন বহন করার দায়িত্ব সবার, প্রশাসন থেকে শুরু করে সবার। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে, আমাদেরকে বিচার করতে হবে, সব পর্যায় থেকে সাহায্য করতে হবে, এই বিচারটা হতে হবে, আমরা দেখতে চাই, এই বিচারটা হচ্ছে’—বলেন ডা. হোসাইন ইমাম।

সারাবাংলা/জেএ

‘আমার মেয়েকে ওই এলাকায় গোসলও দিবা না’
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন