বুধবার ২৬ জুন, ২০১৯ ইং , ১২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

শাড়ি কি শুধুই আনুষ্ঠানিক?

এপ্রিল ১২, ২০১৯ | ৪:১০ অপরাহ্ণ

তিথি চক্রবর্তী

‘লাল মোরগের পাখার মতো ওড়ে তাহার শাড়ি
ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি।’

শাড়িতে নারীর পোশাকি সৌন্দর্য এভাবেই দেখেছেন জসীম উদ্দীন। কেবল তিনিই নন, পল্লী কবির মতো আরও অনেক অনেক কবি, সাহিত্যিকই পোশাক হিসেবে শাড়িতেই দেখেছেন নারীর চূড়ান্ত সৌন্দর্য।

আর্থিক অবস্থা, সামাজিক প্রতিপত্তি ও ব্যক্তিগত রুচিবোধের ওপর ভিত্তি করে নারীর শাড়ি পরার ধরন ও মানে ভিন্নতা অতীতেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু বাঙালি নারীর জীবনে কোনো আয়োজনই যেন শাড়ি ছাড়া পূর্ণতা পায় না। বাগদান, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বিশেষ দিন, উৎসব কি ঘরোয়া অনুষ্ঠান— শাড়ির ছোঁয়া থাকবেই। বলা যায়, বাঙালির সংস্কৃতিতে শাড়ি অন্যতম অনুষঙ্গ।

শাড়ি শুধু ভূষণই নয়, শাড়িতে ফুটে ওঠে ব্যক্তিত্বও। এ কারণে অনেকে শাড়ি পরেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গ্রুমিং প্রতিষ্ঠান উজ্জ্বলার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও রেড বিউটি স্যালনের স্বত্বাধিকারী আফরোজা পারভীন বলেন, ‘মেয়েদের শাড়ি পরলেই সবচেয়ে সুন্দর লাগে। শাড়ি পরতে পরতেই অভ্যস্ততা চলে আসে। বড় কোনো আয়োজন তো বটেই, ছোটখাটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও শাড়ি পরা যায়। যেমন আমি শাড়ি পরতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, আত্মবিশ্বাসও পাই।’

বিজ্ঞাপন

শাড়ি ঐতিহ্যের প্রতীক

তবে ‘শাড়িতেই নারী’ কথাটি এখনকার দিনে আর তেমন খাটে না। এখন নারীরা শুধু শাড়িই পরেন না, নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে ব্যবহার করেন সালোয়ার কামিজ, ফতুয়া, কুর্তাসহ আরও নানা ধরনের পোশাক। ফলে শাড়ি এখন আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিক পোশাক হয়েছে। কেবল উৎসব, অনুষ্ঠানেই শাড়ি পরার রেওয়াজ এসেছে। অধিকাংশ নারী ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে কর্মক্ষেত্রে শাড়ি পরতে চান না।

আমাদের দেশে একটা সময় মেয়েদের পোশাক ছিল শাড়ি। এ দেশের মেয়েরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন শাড়ি পরেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া হাবিব বলেন, ‘আগে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীরা শাড়ি পরতেন। তখন শাড়িই ছিল নারীর পোশাক। কিন্তু এখন অনেক ধরনের পোশাক এসেছে। শুধু পোশাক নয়, আমাদের খাবারদাবার, রুচি-সংস্কৃতি— সবকিছুতেই বিশ্বায়নের প্রভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফলে বিয়েসহ এখন সব অনুষ্ঠানেই পোশাকের ধরন পাল্টে গেছে।’

এখনো আমাদের দেশের প্রান্তিক নারীরা শাড়ি পরেই কাজ করেন ইট ভাটায়, ক্ষেতে-খামারে। তাদের মধ্যে কোনো জড়তা নেই। শাড়ি পরেই সাবলীলভাবে কাজ করেন তারা। এই প্রসঙ্গে ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিবিয়ানা ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী লিপি খন্দকার বলেন, ‘পোশাক পুরোপুরি একটি মানসিক ব্যাপার। যারা সবসময় শাড়ি পরে সব ধরনের কাজ করতে অভ্যস্ত, তাদের শাড়ি পরতে অসুবিধা হয় না।’

শাড়ি পরার ধরনে এসেছে পরিবর্তন

শুধু আমাদের দেশেই নয়, শাড়ি পরার চল ছিল পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতজুড়েই। উপমহাদেশে তো বটেই, শাড়ি পরার প্রচলন আছে নেপাল ও শ্রিলংকাতেও। এছাড়া ইরান, মালয়েশিয়া ও বার্মার নারীরাও শাড়ি পরেন।

আগে ভারতবর্ষের নারীরা শাড়ি পরতেন কোমড়ে জড়িয়ে, অনেকটা ধুতির মতো। পরে ধীরে ধীরে রুচি-সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে সবক্ষেত্রেই। তারই রেশ ধরে শুরু হয় ব্লাউজ ও পেটিকোট পরার প্রচলন।

ভারতবর্ষে শাড়িকে জনপ্রিয় করার পেছনে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের অবদান রয়েছে। জ্ঞানদাননন্দিনী দেবী কোমড়ে জড়িয়ে শাড়ি পরার বদলে কুচি দিয়ে শাড়ি পরতেন। ইংরেজ নারীদের দেখে তিনি ব্লাউজ, পেটিকোট পরতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, বাম পাশে আঁচল দিয়ে শাড়ি পরার ঢংও তিনিই চালু করেন। এরপর ঠাকুরবাড়ির অন্য নারীদেরও এভাবে শাড়ি পরানো শেখান তিনি। এভাবে জ্ঞানদাননন্দিনী দেবীর হাত ধরেই ভারতবর্ষে শাড়ি জনপ্রিয় হয়।

শাড়িতেও ‘শ্রেণি’ আছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের শাড়ির কাপড়ের মান ও নকশার ভিন্নতা তো বটেই, শাড়ি পরার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য। আগেই বলেছি, প্রান্তিক নারীরা শাড়ি পরেও অনেক সাবলীলভাবে সব কাজ ও চলাফেরা করেন। কিন্তু নগরের অনেক নারী শাড়ি পরলে চেহারায় জড়সড় ভাব ফুটে ওঠে। কোনো পোশাক পরে যদি শরীরিক ভাষা ঠিক না থাকে, তাহলে ব্যক্তিত্বও ফুটে ওঠে না।

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীদের কোমল, নমনীয় মনে করা হয়। অর্থাৎ সমাজ চায়, নারীদের শারীরিক ভাষা যেন প্রতিবাদী না হয়। এই ধরনের চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে নারীদেরই। তাই নারীদের পোশাক পরা, চলাফেরা বা সাজের মধ্যেও থাকতে হবে ব্যক্তিত্বের ছাপ। এই ব্যক্তিত্বই নারীত্বের মর্যাদা বাড়াবে।

ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে শাড়িতে

 

পহেলা বৈশাখে শাড়ি

ঈদ, বিয়ে বা যেকোনো উৎসব মানেই বাঙালি নারীর পছন্দে থাকে শাড়ি। পহেলা বৈশাখের কথা তো বলাই বাহুল্য। যেসব নারী কর্মক্ষেত্রে বা প্রাত্যহিক চর্চায় শাড়ি পরতে স্বচ্ছন্দ্য নন, তাদের কাছেও পহেলা বৈশাখ হয়ে আসে শাড়ি পরার উপলক্ষ। যারা শাড়ি পড়তে অভ্যস্ত তাদের সমস্যা নেই, কিন্তু অভ্যস্ততা নেই যাদের, এই উপলক্ষের দিন শাড়ি পরতে চাইলেও চিন্তা করেন দুইবার।

কীভাবে নারীরা সহজে শাড়ি পরতে পারবেন— জানতে চাইলে আফরোজা পারভীন বলেন, ‘চটজলদি শাড়ি পরা কিন্তু কঠিন না। শাড়ির কুঁচি যদি ডানে দেওয়া যায়, তাহলে আর কোনো ভাবনা নেই। তখন আচঁল বা অন্যান্য ভাঁজ নিয়ে আর কোনো ভাবনা থাকে না। আর শাড়ি পরা মানেই অনেক পিন ব্যবহার করতে হবে, তা কিন্তু নয়। দুয়েকটি পিন ব্যবহার করেই সুন্দরভাবে শাড়ি পরা যায়।’

শুধু বিশেষ দিনগুলোতেই শাড়ি পরতে হবে, এমন নয়। শাড়ির প্রতি ভালোলাগা থাকলে নিয়মিতই পরা যায়। আর একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে শাড়ি পরতেই ভালো লাগে, অন্য পোশাকের প্রতি আগ্রহ কমে যায় বলে মনে করেন আফরোজা পারভীন।
তিনি বলেন, ‘যে যত বেশি শাড়ি পরেন, তার কাছে শাড়ি পরাটা তত সহজ হয়ে যায়। যারা কর্মজীবী, তারা অফিসেও নিয়মিত পরতে পারেন শাড়ি। এভাবে ভাবলেই শাড়ি আনুষ্ঠানিক পোশাক হবে না। যেকোনো উপলক্ষ পেলেই তখন শাড়ি পরার প্রতি আগ্রহ জন্মাবে।’

শিক্ষক সুমাইয়া হাবিবা বলেন, ‘নারীরা যখন তার পরিবারের লোকজনের মধ্যে শাড়ি পরার রেওয়াজ দেখেন, তখন নিজেও অভ্যস্ত হয়ে যান। সহজেই শাড়ি পরতে পারেন। শাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’

নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধই প্রধান

পহেলা বৈশাখ যেমন উৎসবের, তেমনি গরমেরও। গ্রীষ্মের দাবদাহ থাকে এই সময়। ফলে শাড়ি পরলে নিজের স্বস্তির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

এই প্রসঙ্গে ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিবিয়ানা ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী লিপি খন্দকার বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে শাড়ির সাথে অন্য কোনো পোশাকের তুলনা হয় না। তবে এখন যেহেতু গরম, এ কারণে শাড়ির রঙ ও ধরন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় পাতলা সুতির শাড়িতে খুব আরাম পাওয়া যাবে। হালকা মেকআপ এখন উপযোগী। যেহেতু পহেলা বৈশাখে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে হয় বেশি, ফলে এমনভাবে সাজতে হবে যেন নিজের কাছে আরামবোধ হয়। আরেকটি ব্যাপার হলো, অনেকেই মনে করেন শাড়ি পরলেই উঁচু স্যান্ডেল পরতে হবে। আমি এভাবে ভাবি না। বরং অনেক সময় চটি স্যান্ডেলেও শাড়ির সঙ্গে ভালো লাগে।’

আরও পড়ুন, কে সাজে কার সাজ!

অনেক নারী মনে করেন, শাড়ি পরলেই ভারি মেকআপ আর পায়ে হিল থাকতে হবে। এ কারণে শাড়ি পরতে চান না অনেক সময়। এমন ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে আফরোজা পারভীন বলেন, ‘শাড়ি পরলেই ভারি গহনা বা মেকআপ করতে হবে— এমন কোনো কথা নেই। অনেক সময় হালকা মেকআপেই অনেক সুন্দর দেখায়। হালকা সাজ যেকোনো অনুষ্ঠানে মানায়। কপালে বড় টিপ, হালকা রঙের লিপস্টিক দিয়ে চোখে কাজল, আইলাইনার, মাশকারা ব্যবহার করা যেতে পারে। আর চুলে গুঁজে দিতে পারেন সাদা ফুল।’

তিনি বলেন, ‘শাড়ির সঙ্গে পা-বন্ধ জুতা পরা যেতে পারে। স্লিপার, কেডস পরেন অনেকে। পেনসিল হিল পরলে কেবল মেয়েলি ব্যাপারটাই চলে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা, যে ধরনের স্যান্ডেল পরলে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করা যাবে, সেটাই নির্বাচন করা উচিত।’

মডেল- বীথি সপ্তর্ষি ও আত্রোলিতা

সারাবাংলা/টিসি/টিআর

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: , , , , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন