বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯ ইং , ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

যেদিন দেশের ক্রিকেট আকাশে উঠেছিল এক নতুন সূর্য

এপ্রিল ১৩, ২০১৯ | ৩:৪২ অপরাহ্ণ

মুশফিক পিয়াল, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

আনলাকি থার্টিন, অনেকের কাছেই ‘১৩’ অপয়া সংখ্যা? সংস্কারবাদীদের চোখে ‘১৩’ সংখ্যাটা তো চিরজীবনই অপয়া। অনেকেই ১৩ তারিখে শুভ কাজ থেকে বিরত থাকেন। খেলোয়াড়রা ১৩ নম্বর জার্সি নিতে চান না। সংখ্যাতত্ত্বে যতই অপয়া ভাবা হোক না কেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস লিখতে গেলে সেই ‘১৩’ কে বাদ দিতে পারবেন না কিংবা পাশ কাটিয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে গর্ব করবেন আর এদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটিকে মনে করবেন না তা কী করে হয়?

১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল, একদিন পরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। রাত শেষে পূব আকাশ লাল করে উঠবে নতুন সূর্য। বাঙালির তখন বর্ষবরণের প্রস্তুতি চলছে। তার আগের দিনই বাংলাদেশের ক্রিকেট আকাশে উঠেছিল এক নতুন সূর্য। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন দিনের শুরু, আইসিসি ট্রফি জয়ের দিন। বিশ্ব দেখেছিল, জেনেছিল ক্রিকেটের নতুন শক্তি বাংলাদেশের অভ্যুদয়। দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবিস্মরণীয় এক দিন হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে। গোটা দেশ সেদিন মেতে উঠেছিল রঙ খেলায়। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া রাস্তায় নামা মানুষজন কেউ সেই রঙ লাগা থেকে রেহাই পাননি! আইসিসি ট্রফি জয়ের সেই মুহূর্তের পরই আসলে বদলে যেতে থাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গল্প। সেদিন সবার একটাই সংকল্প ছিল, আগের পাঁচবার পারিনি। যে করেই হোক এবার সাফল্যের বন্দরে পৌঁছাতেই হবে। সেটি ছিল এমন এক অবিস্মরণীয় অর্জন, যা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আবারো সবাইকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরেছিল।

সেদিন মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফির শিরোপা জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। আকরাম খানের অধিনায়কত্বে ওই ম্যাচটিতে মরিস ওদুম্বে, স্টিভ টিকোলো, টনি সুজি আর কেনেডি ওটিয়ানোর কেনিয়ার বিপক্ষে ডাকওয়ার্থ লুইস মেথডে (ডিএল পদ্ধতি) দুই উইকেটের জয় তুলে নিয়েছিল টাইগাররা। ওই জয়ই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ চিৎকারে কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠ যেন একখণ্ড বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল। প্রথমবার আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন বলে কথা, প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন পূরণ বলে কথা!

নির্ধারিত ৫০ ওভারের ম্যাচে আগে ব্যাট করে কেনিয়া ৯ উইকেট হারিয়ে তুলেছিল ২৪১ রান। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের জন্য টার্গেট দাঁড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬। শেষ ওভারের শেষ বলের রোমাঞ্চে বাংলাদেশ ৮ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে নোঙ্গর করে। বিশ্ব ক্রিকেট সেদিন দেখেছিল নতুন এক বাংলাদেশকে। ২ উইকেটে জয়টি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে পাল্টে দিয়েছিল। শেষ ওভারে বাংলাদেশের জন্য দরকার ছিল ১১ রান। উইকেটে তখন ছিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট এবং হাসিবুল হোসেন শান্ত। বোলিংয়ে পেসার মার্টিন সুজি। প্রথম বলেই পাইলটের ছক্কা, এরপরে ব্যাটে চুম্বন, শেষ বলে এক রানের জন্য শান্তর ভোঁ দৌড়। মাঝে আরও কয়েকটি বুক ধুকপুক করা সময়।

বিজ্ঞাপন

মালয়েশিয়ার রাবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট মাঠে বৃষ্টির মারপ্যাঁচের সাথে আকরাম খানের অসাধারণ ইনিংসে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। এরপর সেমি ফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে নামে বাংলাদেশ। সেদিন শুরুতে মোহাম্মদ রফিকের ঝড়ো ইনিংস, শেষে খালেদ মাসুদ পাইলটের জোড়া ছক্কা না হলে হয়তো বিশ্বকাপ খেলতে আরো দেরি হতো বাংলাদেশের। টেস্ট স্ট্যাটাস পেতেও লেগে যেত আরো কয়েক বছর।

ফাইনালের দিন নির্ধারিত ছিল ১২ এপ্রিল। রিজার্ভ ডে ছিল ১৩ এপ্রিল। আগেই বলা ছিল, যেহেতু এটা আইসিসি ট্রফি ফাইনাল, তাই প্রাকৃতিক কারণে ১২ এপ্রিল খেলা শেষ না হলে পরদিন মানে রিজার্ভ ডে তে খেলা গড়াবে। বৃষ্টির কারণে ১২ এপ্রিলে ম্যাচ শেষ না হলে বাংলাদেশকে নামতে হয় ১৩ এপ্রিল। স্টিভ টিকোলো ১৫২ বলে ১২টি চার আর তিনটি ছক্কায় করেন ১৪৭ রান। দলপতি মরিস ওদুম্বে করেন ৪৩ রান। বাংলাদেশের স্পিনার মোহাম্মদ রফিক ৬ ওভারে ৪০ রান খরচ করে নেন তিনটি উইকেট। ১৯ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হয়েছিলেন তিনি। দুটি উইকেট পান সাইফুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ সুজন। হাসিবুল শান্ত, আতাহার আলি খান, এনামুল হক মনি, নাইমুর রহমান দুর্জয় আর আকরাম খানরা কেউ উইকেট পাননি।

মাঠের ড্রেনেজ সিস্টেম তেমন ভালো ছিল না। কিন্তু ম্যাচটি যে করেই হোক মাঠে গড়াতে হবে, বাংলাদেশের জন্য। তারপর যা হয়েছে, তা ক্রিকেট ইতিহাসে আর কোনোদিন হয়েছে বলে জানা যায়নি। প্রবাসী বাংলাদেশি যারা খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন, তারা স্বেচ্ছায় গ্রাউন্ডসম্যান হয়ে যান! তৎকালীন বোর্ড সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীও প্যান্ট গুটিয়ে তাদের সাথে যোগ দেন। যে যেভাবে পেরেছেন, তাই নিয়ে কাজ শুরু করেন। দেশপ্রেম বুকে থাকলে যা হয়। বাংলাদেশ থেকে ম্যাচটি দেখতে যাওয়া অনেক তারকা খ্যাতি নিয়ে চলা মানুষও মাঠ পরিচর্যায় নেমেছিলেন। শুধুই দেশের জন্য! ক্রিকেট মাঠে এভাবে গ্রাউন্ডসম্যান হয়ে যাওয়ার এমন ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসে নেই। একসময় মাঠ থেকে পানি সরে যায়, মেঘ থেকে সূর্য উকি দেয়, কার্টেল ওভারের ম্যাচ শুরু হয়।

নতুন টার্গেটে ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। তখন ডিএল মেথড পুরোপুরি পরিস্কার ধারণা না দেওয়ায় কেনিয়ানরা ভেবেছিল বাংলাদেশকে করতে হবে ১৬৭ রান। তারা বুঝতেই পারেনি যেটা টার্গেটে সেটাই লক্ষ্য। তাই শেষ বলের রোমাঞ্চে শেষ হওয়া ম্যাচে কেনিয়ার ফিল্ডাররা ডাবল কিংবা বাউন্ডারি বাঁচাতে চেয়ে ভুলটা করেছিলেন। উইকেটের আশেপাশে ফিল্ডার রাখেননি। শেষ বলে এক রান নিয়ে বাংলাদেশ কাঙ্খিত জয়টি তুলে নিয়েছিল। ওপেনার নাইমুর রহমান ০, মোহাম্মদ রফিক ১৫ বলে করেন ২৬ রান। মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ৩৩ বলে করেন ২৬ রান। আমিনুল ইসলাম বুলবুল ২৭ বলে ৩৭, দলপতি আকরাম খান ২৭ বলে করেন ২৭ রান। মাঝে এনামুল হক মনি ৫ রানে সাজঘরে ফেরেন। সাইফুল ইসলাম ১৩ বলে ১৪ রান করেন। খালেদ মাহমুদের ব্যাট থেকে আসে ৫ রান।

শেষ ওভারের প্রথম বলে ফুলটস ডেলিভারিকে বোলারের মাথার উপর দিয়ে সোজা সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পাইলট। এরপর সেই ট্রেডমার্ক ব্যাটে চুমু। ডাগআউটে তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটার, কর্মকর্তাদের ঘাম ছুটছে। দ্বিতীয় বলেও হাঁকিয়েছিলেন, কিন্তু মিস। পরের বলটা লেগসাইডে, ওয়াইড। বাংলাদেশ তখন স্বপ্ন পূরণের দিকে আরেকটু এগিয়ে, চার বলে দরকার ৪ রান। তৃতীয় বলটা অফে ঠেলে দিয়েই শান্ত-পাইলটের দৌড়, সিঙ্গেল রান। এবার স্ট্রাইকিং প্রান্তে শান্ত, ব্যাটে-বলে সংযোগ করতে পারেননি। কোনো রান না পেলে শেষ দুই বলে বাংলাদেশের দরকার হয় ৩ রান। শান্ত-পাইলটের চোখে চোখ, কিছুটা ইশারায় কথা। ডাগআউটে বাংলাদেশের ক্যারিবীয়ান কোচ গর্ডন গ্রিনিজ, তখনকার বিসিবি প্রধান সাবের হোসেন চৌধুরী দুই ব্যাটসম্যানকে কী জানি একটা ইশারা করলেন। পঞ্চম বলে শান্ত বল পাঠিয়ে দেন লেগসাইডে। দুই রান বাংলাদেশকে স্বপ্ন পূরণের পথে আরও একটু এগিয়ে দেয়।

শেষ বলে দরকার ১ রান, স্ট্রাইকিং প্রান্তে শান্ত। বেতারে ধারা বিবরণী শুনে থর থর করে কাঁপছে গোটা দেশ। কেনিয়ার খেলোয়াড়রা কিছুটা সময় নিলেন। আলোচনা করলেন শান্ত-পাইলটকে আটকে দিতে। দুই ব্যাটসম্যান হয়তো ইচ্ছে করেই তাকালেন না নিজেদের ড্রেসিং রুমের দিকে। প্রচণ্ড মানসিক চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়ে সতীর্থদের দিকে তাকালে দেখতে পেতেন একেকজনের মুখ কতটা ছোটো হয়ে গেছে। বোলিং এন্ডে ফেরেন মার্টিন সুজি, কাদায় ভেজা জার্সিতে একবার নিজের কপালের ঘামটা মুছে নিলেন। ব্যাট হাতে প্রস্তুত শান্ত। লেগসাইডের ডেলিভারিটি প্যাডে লাগলো না কী ব্যাটে লাগলো দেখার সময় কই! শান্ত দিলেন ভোঁ দৌড়। বাংলাদেশ নাম লিখলো বিশ্বকাপে। ৭ বলে দুই ছক্কায় ১৫ রানে অপরাজিত থাকেন পাইলট আর ৫ বলে ৪ রান করে অপরাজিত থাকেন শান্ত।

লাল সবুজের পতাকা নিয়ে তখন মাঠে প্রবেশ করেন ক্রিকেটার, কর্মকর্তা আর টাইগারদের হাজারো সমর্থকরা। এই দিনটিই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের হীরকখচিত একদিন। লাল সবুজ পতাকা উড়েছিল পতপত করে। জয়ের আনন্দে কেঁদে দিয়েছিলেন ক্যারিবীয়ান বাংলাদেশের কোচ গর্ডন গ্রিনিজ। আইসিসি ট্রফি জয়ের পরে যাকে বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিক করা হয়।

সারাবাংলা/এমআরপি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন