বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘রাজীবরা মরে যাবে…’

এপ্রিল ১৭, ২০১৯ | ৯:৩৮ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘রাজীবরা মরে যাবে।  বেঁচে থাকবেন বাস মালিকরা।  তাদের অনেক ক্ষমতা, তারা বেঁচে থাকেন।  আমাদের ক্ষমতা নেই। তাই আমরা বিচারের আশায় আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরি।’ গত বছর রাজধানীতে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সামনে দুই বাসের রেষারেষিতে ডান হাত হারানো রাজীবের খালা জাহানারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই আক্ষেপ জানালেন।

বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের বিপরীতে পান্থকুঞ্জ পার্কের সামনে ‘স্বজন বাস’ ও ‘বিআরটিসি’র বাসের রেষারেষিতে সরকারি তিতুমীর কালেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেনের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ১৭ এপ্রিল মারা যান তিনি।

বুধবার (১৭ এপ্রিল) রাজীবের মৃত্যুর একবছর পূর্ণ হয়।  রাজীব বেড়ে উঠেছিলেন যার কাছে, সেই খালা জাহানারা বেগমের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার একটি কক্ষে কোরআন তেলাওয়াত করছে কয়েকজন কিশোর। এরমধ্যে রয়েছে রাজীবের দুই ভাই মেহেদী হাসান ও হৃদয় হোসেন আব্দুল্লাহ।

রাজীবের শৈশব প্রসঙ্গে জাহানারা বেগম বলেন, ‘রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মা আকলিমা খানম মারা যান।  এই সময় রাজীবের বাবা শোকে মুষড়ে পড়েন। হয়ে যান নিরুদ্দেশ। রাজীব ও তার ছোট দুই ভাই পটুয়াখালীর বাউফলে নানার বাড়িতে ছিল।  পরে ঢাকায় এসে পোস্ট অফিস হাইস্কুলে ভর্তি হয়।  আমার বাড়ি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজীব যাত্রাবাড়ীর মেসে গিয়ে ওঠে। জীবিকার তাগিদে সে কম্পিউটার কম্পোজ ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শিখেছিল।’

বিজ্ঞাপন

রাজীবের মর্মান্তিক মৃত্যু প্রসঙ্গে জাহানারা বেগম বলেন,  ‘আমরা ছেলে হারানোর যন্ত্রণা বুঝি।  যার যায় সেই কেবল বোঝে।  আর কেউ বোঝে না, বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে, সেটি গত একবছর ধরে প্রতি পদে পদে টের পাই।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।  এ সময় ডুকরে কেঁদে ওঠে রাজীবের দুই ভাইও।

রাজীবদের মৃত্যুর পর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো পাননি জানিয়ে জাহানারা বেগম বলেন, ‘স্বজন হারানোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হয় না। তবু ক্ষতিপূরণটা পেলে তার ছোট দুই ভাইয়ের বেঁচে থাকাটা আরেকটু সহজ হতো।’

জাহানারা বেগম বলেন, ‘রাজীব মারা যাওয়ার পর আরও অনেক দুর্ঘটনা হয়েছে, একেকটা মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু চালকদের সাজা হচ্ছে না, বাসমালিকরা ক্ষতিপূরণ দিতে চান না।’ তিনি বলেন,  ‘আমরা মনে করি, এসব দুর্ঘটনায় সরাসরি মামলা হওয়া উচিত বাস মালিকদের বিরুদ্ধেই। কারণ তারাই এসব চালককে নিয়োগ দেন।  পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটে গেলো। গত বছর পুরো দেশ সড়ক আন্দোলন করলো, কিন্তু কোথাও কোনও পরিবর্তন হয়েছে?’

এখনো চালকরা রাস্তায় বেপোরোয়া গাড়ি চালায় উল্লেখ করে জাহানারা বেগম বলেন, ‘তাদের কম্পিটিশন থামেনি।  তাদের কোনো শিক্ষাই হয়নি। তারা কে কার আগে যাবে, সে প্রতিযোগিতা করে রাস্তায়। কিন্তু যদি খুব তাড়াতাড়ি এসব চালক- মালিকের কোনও সাজা কার্যকর হতো, তাহলে অন্যরা ভয় পেতো, অন্তত নিয়ম মেনে রাস্তায় গাড়ি চালাতো।’ তিনি বলেন, ‘তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। কিন্তু তাদের সামনে তো শাস্তির কোনো উদাহরণ নেই, তারা ভয় পাবে কেন?’

জানতে চাইলে রাজীবের মামা জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আজ পর্যন্ত যত মানুষ মারা গেলো, তার কোনো বিচার হয়েছে? যদি কোনো একটি ঘটনারও বিচার হতো, তাহলে চালকরা কিছুটা হলেও সংযত হতো, মনে ভয় থাকতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে কিছু হলেই তদন্ত কমিটি হয়। সেই তদন্ত বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে, কিন্তু কোনো বিচার হয় না।’

বাসমালিকদের শক্তিশালী বলে মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘তাদের এ শক্তি কোথা থেকে আসে? কে তাদের ইন্ধন দেয়, সেটা বলতে পারি না। তবে অবশ্যই কোনো না কোনো পাওয়ারে তারা কাজ করে।’ তিনি বলেন, ‘গ্রিন লাইনের মতো পরিবহনের মালিক উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে, তাহলে তো দেশে বিচার-ব্যবস্থা বলতে কিছুই থাকে না।  সর্বোচ্চ আদালতের রায় যদি তারা না মানে, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?’

জাহিদ  হোসেন বলেন, ‘রাজীব মারা যাওয়ার পর এক চিত্রনায়কসহ অনেকেই তার দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন, মিডিয়ায় বাহবা পেয়েছিলেন। কিন্তু সে সবের কিছুই হয়নি। তাদের কেউই এগিয়ে আসেননি রাজীবের দুই ভাইয়ের জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব চেয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। ’ কিন্তু সেই সুযোগ পাননি বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

সারাবাংলা/জেএ/এমএনএইচ

বিজ্ঞাপন
Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন