শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

অদক্ষ ফ্রিল্যান্সিংয়ে নষ্ট হচ্ছে ভাবমূর্তি, সমস্যা এখনও পেপ্যাল

এপ্রিল ২৮, ২০১৯ | ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অদক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের নিম্নমানের কাজে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। কম দামে বিড (দাম হাঁকানো) করে অসম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিয়ে তা শেষ করতে ব্যর্থ হচ্ছে অনেকেই। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা কাজ দিচ্ছেন, তারা বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের আর আস্থায় নিতে পারছেন না। এতে রেমিট্যান্সের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না। যারা সত্যিকারের দক্ষতা অর্জন করে দেশে বসে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ শুরু করছিলেন, তারাও এখন বিপাকে। বাংলাদেশের নাম শুনলে অনেকেই কাজ দিতে চাইছেন না। কিংবা গোড়াতেই বাংলাদেশকে অযোগ্য ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় এক যুগ হতে চললেও দেশকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এছাড়া অনলাইনে অর্থ লেনদেনের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় মাধ্যম পেপ্যাল চালু না হওয়ায় হারাতে হচ্ছে বহু অর্ডার। জুম ও পেওনিয়ারের মতো বিকল্প থাকলেও তার সুফল মিলছে না।

২০১২ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত মো. শহীদুল্লাহ। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘অনলাইনে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে (মার্কেটপ্লেসে) অসম প্রতিযোগিতা হচ্ছে। ১০০ ডলারের কাজ কেউ কেউ ১০ ডলারেও বিড (দাম হাঁকানো) করছে। বায়াররা কিন্তু ভালো মানের কাজই চাইবে। অল্প টাকায় কিন্তু কাজ ভালো হচ্ছে না। এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। আর কিছু কিছু বায়ার বলে দিচ্ছে বাংলাদেশি ও ভারতীয়রা যেন বিড না করে।’

৭ বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত সায়াদ আমিন। অভিজ্ঞ এই ফ্রিল্যান্সার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঠিকমতো প্রস্তুতি না নিয়েই নতুন ফ্রিল্যান্সার মার্কেটপ্লেসে চলে আসে। তারা কম দামে বিড করে। এদের কাজের মানও কিন্তু নিম্ন। ফলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।’

সায়াদ আরও বলেন, ‘অসম প্রতিযোগিতার কারণে আমরা প্রকৃত মজুরির চেয়ে কম পাচ্ছি। অনেক সময় কাজ পেতেও কষ্ট হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও এসইও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পেন্টানিক আইটির পরিচালক ওবায়েদুল ইসলাম রাব্বি সারাবাংলাকে বলেন, ‘মার্কেটপ্লেসগুলোতে বাংলাদেশ থেকে এখন নিম্নমানের কাজও জমা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার দেখলে তো আগে থেকেই এড়িয়ে চলার প্রবণতা ছিল। এখনও আছে। এছাড়া এখন আমরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু  হয়ে গেছি। কে কত কম পয়সায় বিড করবে, এটা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। কিন্তু সবাই ভুলে যায়, কাজের মান খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

গ্রাফিক্স ডিজাইন সম্পর্কিত আইটি প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ ফাইভ স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘মার্কেটপ্লেসে বর্তমানে যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। যোগ্য না হয়ে ফ্রিল্যান্সাররা বাজারে প্রবেশ করায় দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। প্রতিনিয়তই খাতটিতে তরুণরা যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা যদি সঠিকভাবে জেনে, বুঝে, শিখে মার্কেটপ্লেসে প্রবেশ করত, তাহলে সেটি তার নিজের জন্য যেমন, তেমনি দেশের জন্যও ভালো হতো।’

লেনদেনের প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে ফ্রিল্যান্সার শহীদুল্লাহ বলেন, ‘পেমেন্ট গেটওয়ে নিয়ে আগেও সমস্যা ছিল, এখনও আছে। কেবলমাত্র পেপ্যাল না থাকার কারণে কিছুদিন আগে বড় একটি ক্লায়েন্ট হারাতে হয়েছে। কারণ অন্য গেটওয়েতে অনেক তথ্য সরবরাহ করতে হয়। অর্ডারদাতা তাতে অনেক সময় বিরক্ত হন। এটি এখনও অনেক বড় সমস্যা।’

পেপ্যাল না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা তুলে ধরেন আরেক ফ্রিল্যান্সার সায়াদ আমিনও।

আর ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে উন্নত ধাপ অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে যুক্ত রাজু আহমেদ তোহা এ প্রসঙ্গে সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার পেপ্যাল। কারণ আমেরিকা বা অন্য দেশে ক্রেডিট কার্ড বা পেপ্যাল বেশি ব্যবহার করা হয়। দেশে এখনও সেবাটি না থাকায় অবৈধভাবে প্রচুর পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট তৈরি হচ্ছে। যখন দেখা যায় লেনদেন বাংলাদেশ থেকে হচ্ছে এবং অ্যাকাউন্টে ২ থেকে ৩ হাজার ডলার থাকে; তখন হঠাৎ করে ওই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর পেওনিয়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাইরের দেশের মানুষ বেশি আগ্রহ দেখায় না। খাতটির ক্ষেত্রে এখনও এটিই বড় সমস্যা।’

ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, আমার মনে হয় না তারা অপ্রশিক্ষিত। যে পরিমাণ তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মাত্র ১৩ হাজার তরুণ এত বড় একটি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে বলেও আমি মনে করি না।’ ফ্রিল্যান্সিংয়ে যারা কাজ করছে, তাদের সবার দায়ভার সরকারের নয় বলেও উল্লেখ করে তিনি।

পেপ্যাল বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘পেপ্যাল কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয় যে, সরকারিভাবে তার সঙ্গে আলোচনা হবে। দেশে যখন পেপ্যালের ব্যবসায়িক ক্ষেত্র তৈরি হবে তখন তারা নিজেরাই আসবে। আর পেপ্যাল আসার ক্ষেত্রে সরকার কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখেনি।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন