শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৪ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

পাহাড়ে কমছে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, চ্যালেঞ্জ ‘ইডিপিটি’

এপ্রিল ২৮, ২০১৯ | ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

রাঙ্গামাটি থেকে ফিরে: দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর প্রায় ৯১ শতাংশ বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়িতে। এই তিন জেলাকে তাই উচ্চ ম্যালেরিয়াপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখন এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। কমেছে আক্রান্ত হওয়ার হারও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হলে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ‘ইডিপিটি’ (আর্লি ডায়াগনোসিস অ্যান্ড প্রম্ট ট্রিটমেন্ট)। যদি কেউ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন, তাহলে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং তাড়াতাড়ি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে এ রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা আর থাকে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে রয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। ২০১৮ সালে সারাদেশে মোট ১০ হাজার ৫২৩ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়। যাদের মধ্যে মারা যান ৭ জন। তবে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা শতকরা ৮৮ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার শতকরা ৯৫ শতাংশ কমিয়ে আনা গেছে। তবে পাবর্ত্য এলাকাগুলো দুর্গম হওয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা দিতে না পারা এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ তিন জেলার একটি রাঙামাটি। সরেজমিনে জানা যায়, ২০০২ সালে এই জেলায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ মোট ১৪৩ জন মারা যান।

বিজ্ঞাপন

রাঙ্গামাটি সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে এ জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিল ১৮ হাজার ৭৯৯ জন, মারা যান ১২ জন; ২০১০ সালে আক্রান্ত হয় ১৫ হাজার ৪৭৩ জন, মারা যান ১০ জন; ২০১১ সালে ১৩ হাজার ৭৫৪ আক্রান্ত হন, মারা যান ৫ জন; ২০১২ সালে আক্রান্ত ছিল ৭ হাজার ৯৮২ জন, মারা যান ১ জন; ২০১৩ সালে আক্রান্ত হয় ৭ হাজার ৯৭৬ জন, মারা যান ২ জন।

তবে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে যথাক্রমে ১৭ হাজার ১৬৬ এবং ১৩ হাজার ৮৩৩ জন আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর সংখ্যা নেই। ২০১৬ সালে ৯ হাজার ৬২৪ জন আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১ জন; ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে যথাক্রমে ৮ হাজার ২৮৭ এবং ৩ হাজার ১৪ জন আক্রান্ত হলেও মৃত্যু নেই কারও।

এছাড়া ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৯২ জন।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এবং রাঙ্গামাটি সিভিল সার্জন সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে দেশজুড়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে ৫ জন পাহাড়ি এবং ১২ জন বাঙালি। আবার ২০১৭ সালে ১৩ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১ জন পাহাড়ি বাকি ১২ জন বাঙালি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পাহাড়ে জুম চাষে যাওয়া পুরুষদের মধ্যে ম্যালরিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়াতে পাহাড়িরা বেশি আক্রান্ত হলেও মৃত্যু হয় বেশি বাঙালিদের।

রাঙ্গামাটি জেলার ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সার্ভিলেন্স মেডিকেল অফিসার ডা. এন্ড্রু বিশ্বাস বলেন, ‘বাঙালি যাদের মৃত্যু হয়েছে, তারা অন্য জায়গা থেকে এখানে কাজের খোঁজে এসেছিল। যাদের বলা হয় সিজনাল ওয়ার্কার। উত্তরবঙ্গ বা অন্য জায়গা থেকে এসে কাজ করে তারা। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার আগেই সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এবং তাদের মৃত্যু হয়।’

তিনি জানান, জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি, জুড়াইছড়ি ও বরকলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। এর মধ্যে বিলাইছড়িতে ৩১ শতাংশ, বাঘাইছড়িতে ২৭ শতাংশ, জুড়াইছড়িতে ১৭ শতাংশ এবং বরকলে ৯ শতাংশ অধিবাসী ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হন।

আক্রান্তদের মধ্যে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি উল্লেখ করে ডা. এন্ড্রু বিশ্বাস জানান, ২০১৭ সালে রাঙ্গামাটিতে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা ছিল চার হাজার ৯৫০ জন আর নারীর সংখ্যা ছিল একহাজার ৮৮০ জন। আর ১৫ বছরের বেশি বয়স যাদের, তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার আক্রান্তের হার বেশি।

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, ‘খাদ্যাভাসের কারণে, যেমন সিদ্ধ খাবার, পাহাড়ি মরিচ বেশি খাওয়াসহ পাহাড়িদের ম্যালেরিয়া রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তবে এখন ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ কমেছে।’

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘যদি কেউ ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয় তাহলে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং তাড়াতাড়ি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো ইডিপিটি (আর্লি ডায়াগনোসিস অ্যান্ড প্রম্ট ট্রিটমেন্ট)। লক্ষ্য রাখাতে হবে, সামনে যেহেতু বৃষ্টির মৌসুম, তাই জ্বর হলে যেন কেউ অবহেলা না করেন।’ দেরী করার কোনো সুযোগও এখানে নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সারাবাংলা/জেএ/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন