বিজ্ঞাপন

কাজ ও অসাম্য

May 1, 2019 | 6:40 am

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

মে দিবস এলে শ্রমিকের অধিকার আর মর্যাদা নিয়ে বড় শোভাযাত্রা করা, সমাবেশ করা, সেমিনার করার একটা রেওয়াজ চলছে অনেকদিন ধরে। শ্রমিকের অধিকার, শ্রমের মর্যাদা দুটো আসলে শেষ অবধি সুশাসনের সঙ্গেই জড়িত। এগুলো আমরা বলি ঠিকই, কিন্তু কখনো প্রশ্ন করি না- সামাজিক ন্যায় এবং দুর্বলের উন্নয়নে কতটা তৎপর আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাত? সংগঠিত কর্মক্ষেত্রে প্রান্তবাসীর অন্তর্ভুক্তি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমুক্তি, কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যে কর্তব্য সে কথা কি তারা মানেন?

বিজ্ঞাপন

দেশের নারী সংগঠনগুলো বেশ সরব। নারী অধিকারের প্রশ্নে অধিক তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু নারী শ্রমিকের বেলায় কি এমন কোনো সরবতা আছে? নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতি বৈষম্য ঘটতে পারে, বেতন নির্ধারণে তা হতে পরে, হতে পারে তাদের প্রতি কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতেও।

গত এক দশকে রাজনীতিতে, সরকারি-আধা সরকারি চাকরিতে, আর্থিক খাতে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। অর্থনীতি প্রধান খাত তৈরী পোশাকখাত শুরু থেকেই নারী শ্রমিক নির্ভর। কৃষি কাজেও নারীদের এখন ব্যাপক উপস্থিতি। দেশে এত এত নারী অধিকার আন্দোলন। কিন্তু তবুও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য আছে। আমরা দেখছি আমাদের দেশে সংগঠিত ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা পুরুষের পাশে নয়, অনেক পিছনে। শ্রমের মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে একটা শক্ত সামন্ত ভাবনা আছে যে, নারী পুরুষের থেকে শক্তিশালী নয় এবং সেই বিবেচনায় তাদের মজুরি কম হবে। সমানাধিকার সংবিধানস্বীকৃত হলেও জনসংখ্যার অর্ধেককে অত্যন্ত সচেতনভাবে বঞ্চিত করে রাখার প্রচেষ্টা আছে কর্মক্ষেত্রে। নারী মনে ও মননে শক্তিশালী হয়ে উন্নততর সমাজ গঠন করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করুক, বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে স্বমহিমায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করুক, সামন্ত ইচ্ছায় আছন্ন একটা শ্রেণি তা চায় না। নারীপ্রগতি ও স্ত্রী-স্বাধীনতার নামে ক্ষমতাবানদের আসর সরগরম হয় ঠিকই, তবে তা কেবল উচ্চ শ্রেণির জন্য। নারী যদি নিতান্ত শ্রমিক হয় তাহলে তাদের অধিকারের কথা উচ্চারণের সময় নেই নাগরিক নারীবাদের। আর অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা নারী শ্রমিকদের কথা কেউই আসলে বলে না।

বিজ্ঞাপন

নারীমুখী চেতনার অভাবে কর্মক্ষেত্রে নারী সম্পর্কীয় নীতি-নির্ণয় ও কাঠামো সৃষ্টি বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। নারী বাংলাদেশের  সমাজের  সবচেয়ে অবহেলিত অর্ধাংশ। যদিও সমাজের শক্তিশালী শিক্ষিত নারীরাও এসব সমস্যার মুখোমুখি হন, তবুও শ্রমিক নারীর সমস্যা আর তাদের সমস্যা এক নয়। সমস্যাগুলো একজায়গায় করলে এমনটা দাঁড়ায় - বেতন-বৈষম্য, ন্যূনতম মজুরি না-দেয়া, মজুরিতে তারতম্য ঘটানো, চাকরিক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, শ্রম ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিধি কার্যকর না-করা। নারীকে শ্রম দিতে হয় বেশি, কিন্তু সে ব্যাপক বঞ্চনা ও বৈষষ্যের শিকার। বিভিন্ন সময়ে গৃহীত জোড়াতালি দেওয়া নানা নীতির কথা বলা হলেও সার্বিকভাবে নারী সম্পর্কিত আর্থিক ভাবনা-চিন্তা ও কাঠামোগত সৃজনশীল কর্মসংস্থানের উল্লেখ কোথাও নেই।

শহরে যেমন তেমন, প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা নানা ধরনের অবিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কর্মক্ষেত্রে একই পর্যায়ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শর্তসমূহ সমাজ নীরবে মেনে নেয়। সন্তান পালন করে, সংসার সামলে যে নারী শ্রমিক হয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাকাকে চলমান রাখে, তার জীবনে কোনো গতি নেই। এই নারী শ্রমিকদের স্বামীরা একেকজন সম্রাট। তাদের শুধু চাওয়া আর চাওয়া। এই চাওয়া শুধু শরীর চাওয়া নয়, তার উপার্জিত অর্থও স্বামীকে সম্প্রদান করতে হয় বিনা বাক্যে। আর রাজি না হলেই, অকথ্য নির্যাতন, যেন নেমে আসে দিনগত পাপক্ষয়ের গ্লানি। নগরের কেন্দ্রে, গণমাধ্যম জগতে কাজ করা, আমাদের সারাবাংলার সহকর্মী আফরোজাকে নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিল তার স্বামী। অথচ সংসারটাই চালাত মেয়েটিই। যদি রাজধানীতে গণমাধ্যমের একজন কর্মীর জীবনে এমন কিছু ঘটে, তাহলে বোঝা যায় বাস্তব অবস্থাটা কী। এসব ঘটনা আমাদের দেখিয়ে দেয় আমাদের নারী কর্মীরা আয় উপার্জন করেও কত অসহায় এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান কত ভঙ্গুর।

স্পর্শকাতর এই সমস্যার সহজ সমাধান আশা করা যায় না। মে দিবসের সমাবেশ, শ্লোগান আর সেমিনার করে এই নারী কর্মীদের নবজীবন লাভের আশা সুদূর-পরাহত। যেসব অসাম্যের দরুন কর্মক্ষেত্রে একটি মেয়েকে একটি ছেলের সঙ্গে অসম লড়াই করতে হয়, তা দূর না-করে সমাবেশ বা স্লোগানো কোনো কাজ হবে না।

সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও পশ্চাৎপদ অংশের আর্থিক ও সামাজিক বঞ্চনা অবসানের জন্য একান্ত আবশ্যক: নারী-পুরুষ সমানুপাতিক হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, নারীদের অধিক কর্মসংস্থানের প্রচেষ্টা নেয়া, তাদের জন্য নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করা।

অনুকূল অবস্থা চাইলে সংগঠিত বা অসংগঠিত – সব ক্ষেত্রে নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করতে হবে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বড় বা ছোট সব শহরেই সুলভ ও কার্যকর পরিবহণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে গতিশীল করতে সুসভ্য পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে দেশকে সত্যিকারের প্রগতির পথে নিয়ে যাওয়ার আশা কোনোদিনই বাস্তবায়িত হবে না।

লেখক: এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন