সোমবার ২০ মে, ২০১৯ ইং , ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

যেভাবে এলো শ্রমিক দিবস

মে ১, ২০১৯ | ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আজ পহেলা মে। বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। কিন্তু ১ মে’তে উদযাপিত দিবসের ব্যাপ্তি কেবল শ্রমিক দিবসে আটকে নেই। মে মাসের প্রথম দিনে উৎসব উদযাপনের ইতিহাস বহু পুরনো। সহস্র বছর আগে ব্রিটিশরা এদিন উদযাপন করতো বেলট্যান উৎসব। তাদের বিশ্বাস ছিল এই দিনটি বছরকে আলো ও অন্ধকার- দুই ভাগে ভাগ করে। পরবর্তীতে রোমানরা এদিন উদযাপন করতো ফ্লোরালিয়া। ফুলের দেবীকে উৎসর্গ করে অনুষ্ঠিত হতো এই উৎসব।

কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এসব উৎসব ছাপিয়ে মে মাসের প্রথম দিন আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপন করা শুরু হয় শ্রমিক দিবস হিসেবে। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক প্রাণঘাতী প্রতিবাদ। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে এলো শ্রমিক দিবস, কেন হয়েছিল সে যুগান্তকারী প্রতিবাদ।

মে দিবস ও শ্রমিক অধিকার

মে দিবসের সঙ্গে শ্রমিক অধিকারের সম্পর্কের সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে। শিল্প বিপ্লব তখন পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ফলে প্রতি বছরই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল হাজারো পুরুষ, নারী ও শিশু শ্রমিক।

কর্মস্থলের অমানবিক পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে ১৯৮৪ সালে তৎকালীন দ্য ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়নস (এফওটিএলইউ) শিকাগোতে একটি কনভেনশনের আয়োজন করে। পরবর্তীতে এফওটিএলইউ নাম বদলে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারস (এএফএল) নামে পরিচিতি পায়। এফওটিএলইউ কনভেনশনের আয়োজকরা দাবি করেন, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা ধরে আইন পাস করতে হবে।

ওই একই বছর তৎকালীন সময়ে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন- নাইঠস অব লেবার এফওটিএলইউ’র দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দাবির পক্ষে শুরু হয় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১৩ হাজার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ প্রত্যাহার করে বের হয়ে যায় ৩ লাখের বেশি শ্রমিক। দুই দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও অনেকে। অচিরেই কাজ প্রত্যাহার করা শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়ায়।

হেমার্কেট দাঙ্গার অঙ্কিত দৃশ্যপট। সূত্র: শাটারস্টক

হেমার্কেট দাঙ্গা

৩ মে’র মধ্যে পুরো দেশজুড়ে শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন থেকেই বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। শিকাগোর ম্যাককরমিক রিপার ওয়ার্কস কারখানার সামনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশের হামলায় হতাহত হন অনেকে। এই হামলার প্রতিবাদে পরদিন হেমার্কেট স্কয়ারে এক সমাবেশের আহ্বান জানান শ্রমিক নেতারা।

সমাবেশের প্রধান বক্তা ছিলেন অগাস্ট স্পাইস। তার বক্তব্যের সময় সমাবেশে আগতদের ছত্রভঙ্গ করতে সেখানে হাজির হয় একদল পুলিশ। পুলিশরা শ্রমিকদের এগিয়ে আসার সময় কেউ একজন সেই পুলিশদের দলটিকে উদ্দেশ্য করে বোমা ছুড়ে। তবে কে ছিল সেই হামলাকারী তা আজও জানা যায়নি।

এদিকে, বোমা হামলার পর সমাবেশে আগমনকারী জনতাকে লক্ষ্য করে উন্মুক্ত গুলি চালায় পুলিশ। সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। সেদিন দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারান আট বেসামরিক ও সাত পুলিশকর্মী। এই ঘটনা পরবর্তীতে ‘দ্য হেমার্কেট রায়ট’ বা ‘হেমার্কেট দাঙ্গা’ নামে পরিচিতি পায়।

হেমার্কেট দাঙ্গার পর পুরো দেশজুড়ে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। ১৮৮৬ সালের আগস্টে আট ব্যক্তিকে এক বিতর্কিত বিচারকার্যের মাধ্যমে নৈরাজ্যতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাত জনকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে দেওয়া হয় ১৫ বছরের কারাদণ্ড। যদিও তাদের কারও বিরুদ্ধে বোমা হামলা চালানোর কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনেকে দাবি করেন ওই মামলার বিচারকরা পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন।

এদিকে, সাত জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও, অবশেষে চার জনের ফাঁসি হয় ও একজন আত্মহত্যা করেন। বাকি তিন জনকে ছয় বছর পরে মুক্তি দেওয়া হয়।

হেমার্কেট দাঙ্গা ও ওই বিতর্কিত বিচারকার্য পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল সেসময়। ইউরোপে এ ঘটনার পর ১৮৯০ সালে গড়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক ও লেবার পার্টিগুলোর নতুন জোট- সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল।। হেমার্কেটে ‘শহীদ’দের সম্মানে সমাবেশের ডাক দেয় ওই জোট। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ওই বছর লন্ডনে ১ মে ৩ লাখেরও বেশি লোক এক সমাবেশে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা নিশ্চিতের পক্ষে বিক্ষোভ করে।

পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে বহু সরকার ওই শ্রমিকদের ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানায়।

তবে মে দিবস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯০৪ সালে। সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধিদের ষষ্ঠ কংগ্রেসের আয়োজন করা হয় ওই বছরের ১৪ থেকে ১৮ আগস্ট। অ্যামস্টারড্যামে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসটি দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস হিসেবে পরিচিতি পায়। এতে অংশগ্রহণ করেন ইউরোপের সকল দেশের সব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। সেদিনই আইনের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য একদিনে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানানো হয়। স্বীকৃতি পায় শ্রমিক দিবস।

বর্তমানে শ্রমিক দিবস

বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রে দিবসটি পহেলা মে হিসবে স্বীকৃতি পায়নি।

১৮৯৪ সালে পুলম্যান হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রুভার ক্লিভল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবারকে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। (হিস্টোরিডটকম অবলম্বনে)

সারাবাংলা/আরএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন