সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

জননীর জন্য ছাদবাগানে হাওয়াই মিঠাই রঙা বাগানবিলাস

মে ৩, ২০১৯ | ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ

৩ মে ১৯৭১ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জন্মদিনেই রুমী সুখবরটা দিয়েছিল মাকে। মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে রুমী, বাঁচা-মরার লড়াই, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে যোগ দিতে রুমী যাচ্ছে। বুকের পাঁজরের হাড় চেপে ধরা বেদনায়, একেবারে অজানা, খোঁজের বাইরে, শর্তহীন ছাড়াছাড়িতে প্রখর শক্তিশালী এক জননীর সাথে আমাদের পরিচয় হবার প্রথম পদক্ষেপটা সেদিনই শুরু। জন্মদিনে সারপ্রাইজড্ হতে ভালোবাসতেন জননী। প্রতি বছরই তাই রুমী আর জামী একসাথে মাকে তাঁর জন্মদিনে বিস্মিত করবার উপায় খুঁজে খুঁজে বের করে নিতো।

বিজ্ঞাপন
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

তাঁদের মা ঘর সাজাতে রজনীগন্ধা ফুল পছন্দ করতেন আর উপহার পেতে ভালোবাসতেন, গোলাপ ফুল। পোর্চের উপর উঠে যাওয়া গাঢ় হাওয়াই মিঠাই রঙা বাগানবিলাস ফুলের ঝাড় ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। সেই বছর দুই ভাই মাকে চমকে দিতে তেমন কোন আয়োজন করেননি। ২৫ শে মার্চ-এর পর বাসার কারোরই মন ভালো ছিল না। চারিদিকে যুদ্ধের ক্রন্দনের গুমরে ওঠা বাড়াবাড়ি।

বিজ্ঞাপন

তারপরও সকাল সকাল মায়ের দরজায় অনুমতি নিয়ে দুজন ঘরে ঢুকেছিল। রুমীর হাতে ছিল নিজস্ব লাইব্রেরী থেকে তুলে আনা লিয়ন উরিসের লেখা বই ‘মাইলা ১৮’ আর জামীর হাতে বাগান থেকে সদ্য তোলা একটা আধ ফোটা কালো গোলাপ যার নাম ‘বনি প্রিন্স’। রুমী হাতের বইটি এগিয়ে দিয়ে মাকে পড়তে বলে বলেছিল, বইটা পড়লে বুঝতে পারবে, এই বইতে যা লেখা আছে, দেশ ও জাতির নাম বদলে দিলে তা অবিকল বাংলাদেশের আর বাঙালির দুঃখের কাহিনী, প্রতিরোধের কাহিনী, বাঁচা মরার লড়াইয়ের কাহিনী বলেই মনে হবে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

আর জামী গোলাপটা হাতে দিতেই রুমী আবারও বলে উঠেছিল, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক।এই রকম রঙের রক্ত ঝরিয়ে তবে স্বাধীনতার রাজপুত্র আসবে। না রুমী আর ফিরে আসেনি। রুমীর লাশ কোথাও পাওয়া যায়নি। রুমীর মৃত্যুদিন কবে জানা হয়নি। ২৯ অগাস্ট রুমীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাক হানাদারবাহিনী। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেঁচে থাকবার খবর ছিল রুমীর।

হায় কালো গোলাপ বনি প্রিন্স, আধ ফোটা, মখমলের মতন মসৃণ, পুরু পাপড়ির গোলাপ। জননীর জন্মদিনে শেষ উপহার দিয়েছিল সে। তাঁর বনি প্রিন্স, স্বাধীনতার রাজপুত্র নির্মম অত্যাচারে রক্ত ঝরিয়ে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, কেউ জানে না।

ছাদবাগানে অনেক প্রিয় মানুষের জন্য আমি তাঁদের প্রিয় অথবা তাঁদের উৎসর্গ করে ফুলের গাছ দত্তক আনি। বনি প্রিন্স নামের গোলাপকে কখনও খুঁজিনি। শহীদ জননী তাঁর বনি প্রিন্স, রুমীকে খুঁজতে খুঁজতে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন। তাঁর বনি প্রিন্স অধরাই থাকুক। শুধু তাঁর জন্যই থাকুক।

তাই শহীদ জননীর প্রিয় ফুল থেকে যেকোন একটি ছাদবাগানে রাখতে চেয়েছিলাম। শহীদ জননীর প্রিয় রঙের প্রিয় ফুলের ঝাড় বাগানবিলাস ফুল খুঁজতে সময় লেগেছিল অনেক দিন। ঠিক রঙ মিলাতে মিলাতে তিন নম্বর বাগান বিলাসের চারা দত্তক নেয়া হয়ে গিয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। তিনজনই আমার ছাদবাগানের এক কোণ বসবাস করে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

হালকা থেকে গাঢ় হাওয়াই মিঠাই রঙে রাঙিয়ে রাখে তাদের ফুলগুলো। জননীর প্রিয় রঙের বাগানবিলাস গাঢ় হাওয়াই মিঠাই রঙা ফুল। চৈত্র থেকে ফুটতে শুরু করে এই বাগান বিলাস, বৈশাখের মাঝামাঝি পুরো ঝাড় ফুলে ফুলে দুলে উঠে। এই গাছে খুব একটা যত্ন লাগে না। প্রতিদিন জল দেয়া দরকার। শীতে হালকা ছেঁটে দিলে ভালো। শীত শেষে গাছের গোড়ায় জৈবসার দিলে ফুল ভালো পাওয়া যায়।

আজ ৩মে শহীদ জননীর জন্মদিনে প্রিয় ফুল বাগানবিলাসের প্রতিটা পাপড়ি তাঁকে জানায় লম্বা অভিবাদন। প্রতিটা লতার মাঝে কাঁটাগুলো জানান দেয় তাঁর স্বাধীনতার রাজপুত্রকে হারানোর বেদনার কথা। সবুজ পাতাগুলো বারবার জানিয়ে যায়, তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের জন্য, আমাদের ভালো থাকবার জন্য। আমার মতন সামান্য চাষী আপনাদের জন্য ভালোবাসার চাষাবাদ করে যাই।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন