সোমবার ২৭ মে, ২০১৯ ইং , ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘নারীবান্ধব নিরাপদ কর্মস্থল’ নিয়ে কাজ করছে অ্যাকশন এইড

মে ৪, ২০১৯ | ৬:০০ অপরাহ্ণ

রোকেয়া সরণি ডেস্ক।।

ঢাকা: নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে গলদ থাকায় এই সমাজ নারীকে সঠিক মর্যাদা দিতে পারছে না বলে মনে করেন অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। তিনি বলেন, ‘নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। নারীর ওপর ঘটা যৌন নিপীড়ন, মজুরি বৈষম্য, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পদোন্নতিসহ নানা বৈষম্যমূলক আচরণের মূল কারণ হলো, নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই গলদ আছে।’

শনিবার (৪ মে) রাজধানীর গুলশান শুটিং ক্লাবে অ্যাকশন এইড এর আয়োজনে ‘নারীবান্ধব নিরাপদ কর্মস্থল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ফারাহ কবির এসব কথা বলেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যাকশন এইডের সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন। নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ করার জন্য উপযুক্ত আইন বাংলাদেশে দেশে নেই। যৌন হয়রানির সংজ্ঞা কিংবা এক্ষেত্রে শাস্তি কী হবে তা নিয়েও দেশের প্রচলিত আইনে কিছু লেখা নেই।

তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, প্রত্যেকটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই নির্দেশনা কে কতটুকু মানছে তা নিয়ে গবেষণা করেছে অ্যাকশন এইড। সেখানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনার কথা জানেই না, বাস্তবায়ন করা তো দূরের কথা। তাছাড়া বাংলাদেশের শ্রম আইনেও যৌন নিপীড়ন, যৌন সহিংসতা শব্দগুলো নেই। নারীর সঙ্গে কেউ অশালীন আচরণ করলে সামান্য শাস্তির বিধান আছে এই আইনে।

কর্ম হোক যথা তথা, নারী চলুক উঁচিয়ে মাথা

কর্ম হোক যথা তথা, নারী চলুক উঁচিয়ে মাথা

এই ধারাতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিকতার আদলেই করা বলেও জানান ঢাবির এই শিক্ষক। তিনি বলেন, শ্রম আইন ২০০৬ এবং ২০১৩ সালের সংশোধনী, নারী কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ নানাবিধ সুবিধা নিশ্চিত করলেও কর্মক্ষেত্রে নারীদের নির্যাতন ও হয়রানি নির্মূলের জন্য সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা এই আইনে নেই।

গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিত কর্মপরিবেশের বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এবং রাস্তা চলাচলে নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে এখনো নারীরা সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মজুরি বৈষম্য, পদোন্নতি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, আলাদা টয়লেট, শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র, ব্রেস্টফিডিং কর্নার এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধসহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে।

সমাজের বাস্তবতাকে একটি লাইনে তুলে ধরেছেন এক নারী

সমাজের বাস্তবতাকে একটি লাইনে তুলে ধরেছেন এক নারী

মানবাধিকার কর্মী ও নিজেরা করি সংগঠনের সমন্বয়কারী খুশি কবির বলেন, ‘নারীর কর্মক্ষেত্র শুধু বাইরে না, বাড়িতেও। দুঃখজনক হলো, আমাদের সমাজ নারীকে দমন করা কিংবা শ্রমের মর্যাদা না দেওয়ার ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক মনে করে। তাই অনেকক্ষেত্রে আইন থাকলেও প্রয়োগ হচ্ছে না। আইন, নীতিমালা সবকিছুই দরকার। তবে বড় কথা হলো, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে। এজন্য ছোটবেলা থেকেই শিশুকে সেই শিক্ষা দিতে হবে।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের সিনিয়র স্কিল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট কিশোর কুমার সিং বলেন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ে বিভিন্ন দেশে আইএলও কনভেনশন হয়। বাংলাদেশও এই তালিকায় আছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার নারীকে যুক্ত করে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। এ ব্যাপারে কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নকে সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার পেননি মরটোন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা তাদের দেশেও হয়। কেউ প্রতিবাদ করে, আবার কেউ করেনা। নারীর প্রতি বৈষম্য যতদিন থাকবে, সহিংসতাও তত প্রকট হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোকেয়া কবির ট্রেড ইউনিয়নের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে বলেন, নারী নিপীড়িত হলে ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা এগিয়ে আসেন না। নারীর নিরাপত্তার দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন না। তিনি আরো বলেন, ‘শ্রম বিক্রির জন্য না, শ্রম সৃষ্টির জন্য। নারীকে কম মজুরি দিয়ে মালিকরা যে সুবিধা ভোগ করছেন, তাতে কোনভাবেই ভালো কিছু দাঁড়াচ্ছে না। নারীর সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করা যায় এমন চিন্তা বেশিরভাগ পুরুষই পোষণ করেন। আর এটাই হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকের একাংশ

অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকের একাংশ

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নাজমা আক্তার, বিজিএমএ এর সহ-সভাপতি এ. মোমেন প্রমুখ।

সভাপতি ফারাহ কবির অ্যাকশন এইডের আগামী ৩ বছরের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অ্যাকশন এইডের গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের শ্লোগান ‘Womens labour, decent work and public service’। আগামী ৩ বছরে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জেন্ডার সংবেদনশীল কর্মস্থল শীর্ষক প্রচারণা চালিয়ে যাবে অ্যাকশন এইড। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সেল গঠন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ক আইএলও কনভেনশনের জন্য অ্যাডভোকেসি করবে সংস্থাটি।

সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব অবস্থাকে একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে মূর্ত করে তুলে ধরা হয় এই অনুষ্ঠানে।

সারাবাংলা/টিসি/এসএমএন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন