বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯ ইং , ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

টেসেলার কাব্লুম ফ্লাওয়ার ফেস্টিভ্যালের স্বর্গরাজ্যে একদিন

মে ৬, ২০১৯ | ৯:১৫ অপরাহ্ণ

তুহিনা নাসরিন সেতু

বেশ কদিন ধরেই টেসেলার কাব্লুম (Tesselaar  Kabloom) ফ্লাওয়ার ফেস্টিভ্যালের পেজটি নিউজ ফিডে চোখে পড়ছিলো। রঙ বেরঙের নানাধরণের ফুলের সাজানো পসরা দেখে সেখানে যাবার ইচ্ছাটা বেড়েই চলছিলো। কিন্তু বাসা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো রাস্তা। আবার ছুটির দিন ছাড়া আমার পক্ষে কোনভাবে যাওয়াও সম্ভব ছিলনা। তাই অপেক্ষা করছিলাম সুযোগের।

টেসেলার নামক পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবটি বছরে মূলত দুবার হয় থাকে। একবার শরৎকালে আরেকবার, টিউলিপ ফুলের সময় বসন্ত উৎসব। ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু করে প্রায় ৬৫ বছর ধরে হয়ে আসছে এই উৎসব। টেসেলার পরিবার এই ফুল উৎসবের মাধমে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, যা দর্শনীয় স্থান হিসাবে পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ।

অবশেষে আমার ইচ্ছে পূরণের সুযোগ এলো। শুরু হয়ে গেলো ইস্টার ছুটি, সময়টাকে কাজে লাগালাম। খুব সকাল সকাল আমরা পরিবারসহ বের হয়ে পড়লাম। ভরসা গণ পরিবহণ আর গুগল ম্যাপ। মেলবোর্নে ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকলেও সমস্যা হয়না, গুগল ম্যাপে কীভাবে কোথায় যাবেন, ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম সবই পেয়ে যাবেন।

যেকোনো রেল ষ্টেশন আর বাস ষ্টেশন থেকে মাই কি কার্ড নিয়ে রিচার্জ করে নেওয়া যায়। আমরা যেদিন যাবো, সেদিন ট্রেন সার্ভিস বন্ধ থাকায় আমরা প্রথমে বাসে করে সিটিতে গেলাম। সেখান থেকে আবার ট্রেনে করে পরপর কয়েকটা শহর পার হয়ে গেলাম বেল্গ্রেব রেল ষ্টেশন। তারপর বাসে করে ৩৫৭ মিনিবাল্ক রোড, সিলভান শহরে টেসেলার ফ্লাওয়ার ফার্মে পৌছালাম। চোখ জুড়োনো দৃশ্য চার দিকে। পাহাড়ি উঁচু-নীচু রাস্তা আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দিগন্ত বিস্তৃত জায়গাজুড়ে টেসেলার কাব্লুম ফ্লাওয়ার ফেস্টিভাল চলছে।

বিজ্ঞাপন

এক দিকে হেমন্তের জীর্ণ পাতাদের ঝরে পড়ার মুহূর্ত আর অন্যদিকে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বিভিন্ন রঙিন ফুলের উৎসব, যা দেখে মনে হল প্রকৃতি তার বিবর্ণতার মধ্যেও মানুষের মনকে রাঙিয়ে দিয়ে যায় অথচ মানুষ কেন পারেনা! এসব ভাবতে ভাবতে ফুলের রাজ্যে ঢুকে পড়লাম নির্দিষ্ট টিকিট কাউনটার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের দাম ২৫ ডলার আর ১৬ বছরের নীচের শিশুদের জন্য প্রবেশ ফ্রি। যে কেউ চাইলে অনলাইন থেকেও টিকিট কিনতে পারেন।

ফ্লাওয়ার ফেস্টিভ্যালের ঢোকার পর মনে হলো, যেন পৃথিবীর বুকে স্বর্গের এক ছোট্ট অংশ, যেখানে রুপকথার গল্প থেকে বের হয়ে আসা পরী, রঙিন প্রজাপতি আর রঙ বেরঙের বাহারি ফুলের সমাহার। বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার চোখে মুখে অপার্থিব আনন্দ দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল । জমকালো ফুলের গোলকধাঁধার মধ্যে কখন যে হারিয়ে গেলাম, নিজেও জানিনা। সুভাষ মুখোপাধায়্য এর সুরে সুর মিলিয়ে আমারও বলতে ইছা করলো , ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত’।

এক এক সারিতে এক এক ধরণের ফুল। হঠাৎ চোখ পড়ল পৃথিবী বিখ্যাত ল্যাভেন্ডার ফুল যার মোহনীয় সৌন্দর্য আর সুবাসে মোহিত হচ্ছিলাম। কি অপূর্ব! বেগুনী রঙের সারি দিগন্ত থেকে দিগন্তে চলে গেছে। আরেক সারিতে চিত্তাকর্ষক সুপার স্ন্যাপ ড্রাগন, কোনটাতে রূপসী স্যালভিয়া আবার কোনটায় হলুদ আভায় ছেয়ে আছে মেরী গোল্ড। কোনদিকে আবার হালকা বেগুনী আর গোলাপি কসমসের সারি। এছাড়াও বিভিন্নও রঙের বৈচিত্র্যময় পিটুনিয়াও রয়েছে।

নাম না জানা আরও অনেক ফুল চোখে পড়ল। এক এক সারি এক এক সৌন্দর্য নিয়ে মানুষকে আকর্ষণ করে যাচ্ছে। কার থেকে কার সৌন্দর্য বেশি সেটা নির্ণয় করবে, মানূষের সাধ্য নাই! ফুল সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, পবিত্রতা আর নিষ্পাপতারও প্রতীক।

মানুষের সৌন্দর্যবোধ সহজাত। আর এই সহজাত সৌন্দর্যপ্রীতি থেকেই সৌন্দর্যের প্রতীক ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ। এর পাপড়ির বিন্যাস, রঙের বৈচিত্র্য ও গন্ধের মাধুর্য মানুষের মনকে ভরে তোলে অপার্থিব আনন্দে।

ফুল ভালোবাসার প্রতীক, তাই বোধহয় ভালোবাসার মানুষকে ফুল দেয়ার রীতি পৃথিবীতে দীর্ঘকাল থেকে চলে আসছে। ফুল শুধু স্ট্রেস দূর করতেই সাহায্য করে না, এর মাঝে রয়েছে প্লান্ট হরমোন। যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এর জুড়ি নেই। এছাড়াও ফুল প্রাকৃতিকভাবে মেজাজের পরিবর্তন সাধিত করে।

ঘুরতে ঘুরতে আরেক দিকে যেয়ে দেখি, শিশুদের অবাক করবার জন্য মিউজিকসহ রপকথার গল্পের থেকে বের হয় আসা পরি আর প্রজাপতিদের মেলা বসেছে । একটি নির্দিষ্ট সময় টেসেলর পরী বাগানে থেকে টেসেলর বাসিন্দা পরী এসে যোগ দিবে শিশুদের সাথে তখন শুরু হয়ে হয়ে যাবে পরি বাগানের গল্প। গল্পের কিছুক্ষণ পর স্ন্যাপ ড্রাগন দলের দৃষ্টিনন্দন সার্কাস যা শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সবার মধ্যে উত্তেজনা ভরপুর সময় ছিলো। তাদের বাহারি পোশাক আর ফেস পেইন্টিং ডিজাইন মুগ্ধ করলো সবাইকে।

আরও ছিল এখানকার ফুল দিয়ে তৈরি চকলেট ও ললির স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত দোকান।

খরগোশ, বাঘ আর ফুলের মোটিফে করা শিশুদের জন্য ছিলো ফেস পেইন্টিং এর ব্যবস্থা। অনেককেই দেখলাম ফেস পেইন্টিং করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, মনে হলো সত্যি এ যেন কোন রূপকথার রাজ্য।

একটু দূরে দাড়িয়ে ট্রাক্টর ট্রেন অপেক্ষা করছিল। আমরা সেদিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। নির্দিষ্ট পরিমান যাত্রী ফি দিয়ে সম্পূর্ণ ফার্মটি ঘুরে দেখাবার জন্য ট্রাক্টর ট্রেনটি সময়মতো স্টেশন থেকে ছাড়লো। ফুলের এই ফার্মের সম্পূর্ণ দৃশ্যাবলী ঘুরে দেখতে যেয়ে শিশু আর বয়স্ক মানুষের জন্য যাতে কষ্ট না হয় তাই এই ব্যবস্থা। এছাড়াও রেকর্ডারের মাধ্যমে এ ফার্মের ফুল উৎপাদন ইতিহাস, পরিচর্যা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হচ্ছিল।

ট্রাক্টর ট্রেনে ফার্মের দৃশ্যাবলী উপভোগ করে নামার পর দূরে নির্দিষ্ট জায়গায় খাবারের দোকানগুলো চোখে পড়ল। যেহেতু বেলাও অনেক পড়ে গেছে সেজন্য হালকা কিছু খাবার খেতে আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম। এখানে বিখ্যাত ডাচ মিনি প্যানকেক, পর্ক রোল, বার্গার, টুইস্টি আলু, ঐতিহ্যবাহী তুর্কি খাবার, জার্মান সযুগ, চা, কফি, কাবাব আলু, ও নানারকম পানীয় ছিল। খাবারের দাম ছিল ৩ ডলার থেকে ২৩ ডলারের মধ্যে। খাবার নিয়ে যখন আমরা বের হয় আসলাম তখন অনেককে দেখলাম দলবেঁধে বনভোজন করছে। তারা গান বাজনার সাথে নেচে গেয়ে আনন্দ করছিল। এখানে পিকনিকের জন্য আলাদা জায়গা আছে।

আরেকটা তথ্য জানিয়া রাখি, কেউ যদি এই ফুলের রাজ্যে বিয়ের ছবি তুলতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে টাসেলেরের কাব্লুম অনলাইন ফেসবুক পেজ এ সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে। তারা নব বিবাহিত দম্পতির ছবি তুলতে একটি দিন ধার্য করে দেবেন। এছাড়াও এখানে আছে রিসোর্টে থাকার ব্যবস্থা। এই রিসোর্টে থাকতে চাইলেও আপনাকে এই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে।

ফুলেদের সৌরভ মানুষে আনন্দ যেমন মুগ্ধ করছিল তেমনি আর কিছু বিষয় মুগ্ধও হবার মতো ছিল তা হলো এতো মানুষের সমারোহ অথচ কোথাও কোন ময়লা নেই, বিশৃঙ্খলা নেই। কেউ ফুল ছিড়ছেনা। এক মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে সুন্দর একটি দিনের স্মৃতি নিয়ে অবশেষে বাড়ি ফেরার পালা আলো। কিন্তু বারবারই মনে হচ্ছিলো ইস, যদি থেকে যেতে পারতাম এই রঙিন ফুলের দেশে!

চোখের পলকে দিনটা কেমন যেন শেষ হয় আসছিল। আসলে সুন্দর সময় বোধহয় একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়। আমাদের বাসা অনেক দূরে হওয়ায় যাবার তাড়াও ছিল। গেটের কাছে আসতে ছোট্ট একটি দোকান চোখে পড়লো যেখানে বিভিন্ন ফুল গাছের চারা আর বীজ বিক্রি হচ্ছিল।

বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল–
‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা
খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি’
দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার
ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’

আমি অল্প কিছু ফুলের বীজ সংগ্রহ করলাম। অপেক্ষায় আছি এ বছরে সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া টেসেলার এর টিউলিপ উৎসবেও যাবো।  তখন মেলবোর্ন রাজ্যে চলবে বসন্ত আর নতুন নানা রঙের টিউলিপের সুগন্ধে রাঙিয়ে দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিবে টেসেলারের ফুল উৎসব।

ছবি: তুহিনা নাসরিন সেতু

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন