বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯ ইং , ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

পোশাক কারখানায় ৪ নারীর একজন যৌন হয়রানির শিকার

মে ৭, ২০১৯ | ৫:০২ অপরাহ্ণ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রতি চার জনের একজনই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়াও শতকরা ৩৫ দশমিক ৩ ভাগ নারী কর্মী কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা শুনেছেন বা দেখেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

মঙ্গলবার (৭ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ ও ‘কর্মজীবী নারী’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ‘তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি: সংগ্রাম ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)।

ঢাকার মিরপুর এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামি রোডে অবস্থিত ২২টি পোশাক কারখানায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে বলা হয়, পোশাক কারখানাগুলোতে শতকরা ২২ দশমিক ৪ ভাগ নারী শ্রমিক যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক কারখানায় যৌন নির্যাতন বলতে শতকরা ৭৯ জন নারী ও ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, নারী দেহে অপ্রত্যাশিত স্পর্শই হলো যৌন নির্যাতন। তবে অশ্লীল গালাগালিকে যৌন নির্যাতন বলে মনে করছেন না তারা।

বিজ্ঞাপন

কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের যে ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কামনার দৃষ্টিতে তাকানো, যার হার ৪২ দশমিক ৩৩ ভাগ। এরপর সংবেদনশীল অঙ্গে কোনো কিছু নিক্ষেপ করা, যার হার ৩৪ দশমিক ৯২ ভাগ। তারপর সংবেদনশীল অঙ্গের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো, যার পরিমাণ শতকরা ৩৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। কাজ বোঝানো বা কথা বলার সময় হাত বা শরীরের কোনো অংশে স্পর্শ করার হার শতকরা ২৮ দশমিক ৫৭ ভাগ। এছাড়াও আছে বাজে গালি দেওয়া, চাকুরিচ্যুতির হুমকি, অশোভন অঙ্গভঙ্গি, পদন্নোতির কথা বলে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব ইত্যাদি।

নারীদের যৌন হয়রানির প্রতি সমাজের উদাসীনতা রয়েছে উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিক্ষা ও গণস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য শিরিন আক্তার বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রার ৮০ শতাংশ পোশাক শিল্প থেকে আসে এবং এখানে কর্মরতদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ নারী। কর্মজীবী এসব নারীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।’

সমাজের উদাসীন আচরণ ও পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা তাদের প্রতি হওয়া যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকাশের ভয়কে যৌন হয়রানির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘এসব (যৌন হয়রানি) ক্ষেত্রে নারীর পোশাক ও আচরণ নিয়েই উল্টো অপমানজনক কথা বলা হয়। তাছাড়া যৌন হয়রানির সমাধান সময়সাপেক্ষ। নারীদের সংসারের ও কাজের চাপের পর হয়রানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।’

এছাড়াও যৌন হয়রানির বিষয়ে শ্রমিকদের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে শিরিন আক্তার আরও বলেন, ‘যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে সে সম্পর্কে শ্রমিকদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। আর যারা জানেন, তাদের ধারণাও খুব একটা স্পষ্ট নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ নারী ও শতকরা ৭৯ শতাংশ পুরুষ এ সম্পর্কে জানেই না।’

কর্মজীবি নারী সংগঠনের সভাপতি ডা. প্রতীমা পল মজুমদার যৌন হয়রানির কারণ ও এর প্রতিকার বিষয়ে বলেন, ‘যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কতৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, অপরাধীদের কোনো ধরনের শাস্তি না হওয়া, কারখানার পক্ষ থেকে যৌন হয়রানিকে অপরাধ মনে না করা, মধ্যরাত পর্যন্ত ওভারটাইম করানো— এগুলো যৌন হয়রানির অন্যতম কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘কঠোর আইন প্রণয়ন, নারী শ্রমিকদের সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ওপর সরকার ও ক্রেতাদের নজরদারি বাড়ানো, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র মনিটরিং সেল বসানো, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর সংখ্যা বাড়ানো– এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি কমানো সম্ভব।’

মতবিনিময় সভায় এমজেএফ’র নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্রম বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান, ডিআইএফই’র উপমহাপরিদর্শক মো মতিউর রহমান, সুইডিশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি ইলভা শালসট্রেনড। সমাপনী বক্তব্য রাখেন কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক।

সারাবাংলা/ওএম/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন