বুধবার ২২ মে, ২০১৯ ইং , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়া, প্রয়োজন বিয়ের আগে সচেতনতা

মে ৮, ২০১৯ | ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চার ভাই বোনের মধ্যে শিউলি, শিখা আর মামুন- তিনজনই থ্যালাসেমিয়া রোগী। শিউলি আড়াই বছর, আর শিখা ও মামুন দেড় বছর বয়স থেকে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। তাদের বয়স এখন যথাক্রমে ২৮, ২৩ ও ১৯। তিন ভাইবোনকেই নিয়ম করে প্রতিমাসে রক্ত নিতে হয়, ওষুধ খেতে হয়। পাশাপাশি আরেক পরিবারের ৮ বছরের ফাতেমা ও ১৬ বছরের জান্নাতুল ফেরদৌস দুই বোনই থ্যালাসেমিয়া রোগী। একবছর আগে ফাতেমা ও জান্নাতুলের একমাত্র ভাই নাঈমুল ইসলাম ১৮ বছর বয়সে মারা যান। তিনিও থ্যালাসেমিয়ার রোগী ছিলেন।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার শিশু জন্ম নেয় থ্যালাসেমিয়া মেজর ও ই-বিটা থ্যালাসেমিয়া নিয়ে। বর্তমানে তিন লাখের বেশি শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। এসব শিশুদের প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর রক্ত নিতে হয়।

আজ বুধবার (৮ মে) বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এ বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত হয়েছে, ‘অনাগত সন্তানকে দিতে থ্যালাসেমিয়া থেকে সুরক্ষা, বিয়ের আগে করুন রক্তের ইলেকট্রোফরেসিস পরীক্ষা।’

চিকিৎসকরা বলছেন, বিয়ের আগে সচেতন হলেই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক যদি আরেক বাহককে বিয়ে করেন, তাহলে তাদের প্রতিটি সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ শতাংশ। তাই পরিবারগুলোতে একাধিক সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবার নজিরও রয়েছে দেশে। তবে রক্তের গ্রুপের সঙ্গে থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার কোনো সর্ম্পক নেই।

মা সন্তানসম্ভবা হওয়ার তিনমাসের মধ্যে ‘প্রিনেটাল’ নামক পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভের সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কিনা সেটা বোঝা সম্ভব। দুর্ভাগ্যবশত সন্তান থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয় মাকে।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকরা জানান, মানুষ এই ‘প্রিনেটাল’ সর্ম্পকেই জানে না, তাই দরকার সচেতনতা। এ কারণে এবছর থ্যালাসেমিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অনাগত সন্তানকে দিতে থ্যালাসেমিয়া থেকে সুরক্ষা, বিয়ের আগে করুন রক্তের ইলেকট্রোফরেসিস পরীক্ষা।’

থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন থেকে জানা যায়, শিশুর জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন ইনফেকশন, শিশুর ওজন না বাড়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ শিশুদের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ডা. আব্দুর রহিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০২৮ সালের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর নিয়েছে, তা অর্জন করতে হলে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রক্ত পরীক্ষা করে যদি থ্যালাসেমিয়া বাহক চিহ্নিত করা যায়, সেক্ষেত্রে তাদের কাউন্সেলিং ও গর্ভস্থ ভ্রুণ পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার রোগীর সংখ্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’

ডা. আব্দুর রহিম বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৭ লাখ বিয়ে হয় এবং এর ৯০ শতাংশই রেজিস্টার্ড। সে হিসেবে এই ৩৪ লাখ নারী-পুরুষকে বিয়ের আগেই স্ক্রিনিং করা গেলে থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কমে যাবে। কেবল এ পদ্ধতি অনুসরণ করা গেলেই ২০২৮ সালের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।’ সামাজিক বাধার কারণে পিছু হটলে কখনোই এ উদ্যোগ সফল হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আজগর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দু’জনই যদি থ্যালাসিময়া বাহক হন, তখনই কেবল সন্তানদের এই রোগ হতে পারে। কিন্ত‍ু স্বামী বা স্ত্রীর একজনও যদি সুস্থ হন, তাহলে তাদের সন্তানের এই রোগ হবে না। তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা করাটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বা লোক কী ভাববে— এ ভাবনা মাথায় নেওয়া যাবে না।’

থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এজন্য আমরা থ্যালাসেমিয়া রোগ নির্ণয়, রোগীদের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরিতে কাজ করছি। এ গাইডলাইনের আওতায় থ্যালাসেমিয়া রোগ শনাক্ত, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা এবং থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মী ও জনগণের মধ্যে সচেতনতার জন্য কাজ করব।’ ২০২৮ সালের মধ্যে দেশে থ্যালাসেমিয়ার রোগী থাকবে না বলেও আশাবাদ জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সরকারিভাবে ব্যপক প্রচারণা চালাতে হবে। সচেতনতা বাড়লে ধীরে ধীরে মানুষ বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার বিষয়টি মেনে নিবে।’ এজন্য আইন মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

সারাবাংলা/জেএ/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন