শনিবার ২০ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৫ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘ব্যয়বহুল’ থ্যালাসেমিয়া: জেলা-উপজেলায় নেই বিশেষায়িত চিকিৎসা

মে ৮, ২০১৯ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ৮ বছরের তৌসিফের বড় আরেক ভাই রয়েছে। দুই ভাই আর বাবা-মায়ের সংসারটি সুখের হওয়ার কথা ছিল। এই বয়সে তৌসিফ বই হাতে স্কুলে যাবে, বিকেলে মাঠে দৌড়ে বেড়াবে, স্কুলে, বাড়িতে দুষ্টুমি করবে, বাড়িতে নালিশ আসবে, টিভিতে ক্রিকেট আর ফুটবল খেলা দেখবে– এটাই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু তৌসিফ এর কিছুই করে না। সারাদিন চুপচাপ ঘরের কোনে বসে থাকে। মা যখন রান্না করে তখন মায়ের আঁচল ধরে থাকে। মা-ই তৌসিফের সবকিছু। মাঝে মাঝে বড় ভাইয়ের সঙ্গে একটু-আধটু যা কথা হয়। বাবার সঙ্গে তার কথাই হয় না।

নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়া, প্রয়োজন বিয়ের আগে সচেতনতা

তৌসিফের চোখ দুটো লাল থাকে, শরীরটা রুগ্ন, হাত দুটো জীর্ণ। হাসতে বললে খুব কষ্টে যেন ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসির দেখা মেলে। হবেই না কেন, গত সাড়ে তিনবছর ধরে তৌসিফ থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত। এই সাড়ে তিনবছর ধরে তৌসিফকে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু তৌসিফের বাবার আয় নেই, মা কোনোরকমে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ধার করে ছেলের রক্ত জোগাড় করেন। আবার বেশিরভাগ সময় তা পারেন না। আর রক্ত দিতে না পারলেই ছেলেটা খেতে পারে না, বমি করে, জ্বর আসে, দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

তৌসিফের মা বলেন, ‘আত্মীয়দের কাছে হাত পাততেও এখন লজ্জা করে। মানুষ আর কতো চাইতে পারে। কিন্তু মা হয়ে ছেলের এ অবস্থা দেখতে পারি না, হাত পাতি দ্বারে দ্বারে। কিন্তু তারাও আর কতো দেবে। সবারই সংসার রয়েছে। তাই মাঝে মাঝে টাকার অভাবে রক্ত দিতে পারি না ছেলেকে।’

‘এরচেয়ে বড় বিপদ একজন মায়ের জীবনে আর কিছু হতে পারে না’— মোবাইল ফোনে বলছিলেন তৌসিফের মা শাহিদা বেগম রীতা।

মঙ্গলবার (৭ মে)  বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, ভেতরের ওয়ার্ডে একটি বেডে সাইফকে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। আর চুপচাপ শুয়ে সাইফ মোবাইলে গেমস খেলছে। বেডের পাশে রয়েছেন বাবা সাইফুল্লাহ। সাইফুল্লাহ জানান, একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ সাইফ আল হাসানের বয়স সাড়ে সাত বছর। জন্মের পর মাত্র সাড়ে তিন মাস বয়সে ছেলের সমস্যা দেখা দেয়। তখনই শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসা চলে প্রায় এক বছরের মতো। তারপর থেকেই চলে এসেছেন শান্তিনগরের এই হাসপাতালে।

শিশু হাসপাতালে নেওয়ার পর সাইফের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে তিন মাস বয়সে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওকে রক্ত দেওয়া শুরু হয় আট মাস বয়স থেকে। একমাস পরপর সাইফকে রক্ত দিতে হয় এবং প্রতিমাসে তিন থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকার মতো ছেলের পেছনে কেবল এই অসুখের জন্যই ব্যয় হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি বলে টাকার সমস্যা নেই। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের জন্য এর চেয়ে কষ্টের কিছু হয় না। একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী পরিবারে থাকা মানে পরিবারে মহাবিপদ। কারণ, যারা একেবারেই স্বচ্ছল না, তাদের তো বাজার খরচই চলে না ঠিকমতো। আর থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, দেশে থ্যালাসেমিয়াকে অন্যতম একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ রোগে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ৬০ হাজার আর দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছেন ১ কোটি ১০ লাখ।

চিকিৎসকরা বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। বাবা অথবা মা কিংবা বাবা-মা উভয়েই এই রোগের জিন বাহক থাকলে এটি সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটা ক্যান্সারও না। এই রোগের ফলে আক্রান্ত রোগীর দেহে ক্রটিযুক্ত লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন হয়। এতে কোষগুলো পূর্ণ জীবনকালের আগেই ভেঙে যায়। ফলে রোগীকে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করে বেঁচে থাকতে হয়। তবে এই রোগের কোনো ওষুধ নেই।’

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ডা. মো. আবদুর রহিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘কিছু কিছু রোগীদের ১২ থেকে ১৫ দিন পরপর রক্ত দিতে হয়। এ রোগে কিছু ওষুধ রয়েছে যেগুলো প্রচুর দামী। আবার এমন কিছু ওষুধ রয়েছে যেগুলো দেশে পাওয়াই যায় না। আমেরিকা, জার্মানি, ভারতসহ উন্নত দেশগুলো থেকে নিয়ে আসতে হয়।’

এই রোগের সবচেয়ে কমদামী ওষুধটাও ২৫ টাকা করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে ওষুধ যদি দিনে দুই থেকে তিনটা করে খেতে হয় তাহলে সে পরিবারের কী অবস্থা হতে পারে সেটা সহজেই অনুমান করা হয়। আর যদি সে পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার বা দরিদ্র হয়ে থাকে, তাহলেতো আর কোনো কথাই নেই। এজন্য আমরা বলি, যেকোনো পরিবারে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী থাকা মানেই সে পরিবারের মহাবিপদ।’

আবার প্রতিবার রক্ত নেওয়ার আগে কিছু কিছু পরীক্ষা অবশ্যই করতে হয়। সে সময়তো এসব পরীক্ষাতেও টাকা খরচ হয় বলেন ডা. মো. আবদুর রহিম।

থ্যালাসেমিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদ জানান, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য হাসপাতালগুলোতেও থ্যালাসেমিয়া নিয়ে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে এ রোগের চিকিৎসার জন্য আলাদা কোনো জায়গাই নেই। এজন্য সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুবিধা তৈরি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসকদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, পাশাপাশি সচেতন করতে হবে রোগীদেরও। সরকারিভাবে কম খরচে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে হবে।’ এটি না পারলে বেশিরভাগ রোগীই চিকিৎসার বাইরে থেকেই প্রাণ হারাবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

সারাবাংলা/জেএ/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন