শনিবার ২৫ মে, ২০১৯ ইং , ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব

মে ৯, ২০১৯ | ৫:০৩ অপরাহ্ণ

সুমন জাহিদ

প্রসঙ্গকথন:

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নায়ক ফেরদৌস এবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনে মমতা ব্যনার্জির হয়ে প্রচারণায় নামলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার ধারাবাহিকতায় ইত্তেফাক একটি অসত্য রিপোর্ট পরিবেশন করে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ফেরদৌস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ক্যাম্পাসে ১৯৯৩ সালে ছাত্রদলের মিছিল মিটিং করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদেরও (ডিইউএফএস) কর্মী ছিলেন। এই খবরে দেখলাম ক্যাম্পাসের বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছাত্র-নেতাকর্মীই বিভ্রান্ত। আদর্শবাদী বা অনুপ্রবেশকারী যাই হোক না কেন, ক্যাম্পাসের তরুণ নেতৃত্বের বিভ্রান্তি ডিইউএফএসের বর্তমান প্রজন্মকেও কিছুটা অস্থির করে তুলেছে। ক্যাম্পাসের নবীন নেতৃত্বের অনেকেই বলছেন যে ডিইউএফএস নাকি ছাত্রদলের সংগঠন। ইত্তেফাকের মতন গণমাধ্যমে এমন সংবাদের পরে সে আলোচনাটাই স্বাভাবিক। ঈর্ষান্বিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অপপ্রচারকারী আষাঢ়ের গল্পও রচনা করছেন। ফিল্ম সোসাইটি ফ্যামিলির সিনিয়র হিসেবে ডিইউএফএস’র বর্তমান নেতারাও আমার কাছ থেকে তৎকালীন প্রেক্ষাপটটা জানতে চাচ্ছে।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে দায়িত্ব নিয়ে একটা কথা বলতে চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ শুধু দেশই নয় বিশ্বের খুব কম স্থানেই বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে যেটি অনেক আগেই অর্ধশত বছর পার করেছে এবং পুনর্গঠিত হওয়ার পর বিগত দুই যুগ কোন প্রকার বর্হিশক্তির প্রভাব মুক্তভাবে নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে প্রতিবছর নতুন কমিটি হয়েছে তাও কোন রকমের ছন্দপতন ছাড়াই। একই সঙ্গে বিগত দুই যুগ ধরে তৈরি করেছে চলচ্চিত্র সংসদকর্মী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট নানা ইভেন্ট যেভাবে ধারাবাহিকভাবে করে আসছে তার নজিরও দেশ-বিদেশে খুব বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগ চালু করাও ডিইউএফএস’র ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ আন্তর্জাতিকভাবে আদৃত একটি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। শুধু IIUSFF (International inter university short film festival) এ প্রতিবছর সারা পৃথিবী থেকে হাজারের ওপর শর্টফিল্ম জমা পড়ে। সংখ্যাটা হাজারের ওপর। প্রতিটা ফিল্ম দেখে, পর্যালোচনা করে সেখান থেকে বাছাই করে কয়েকটা ক্যাটাগরিতে সেরা কিছু ফিল্মকে পুরস্কৃত করা হয়। World Film Manifestation Program এর ১২৫তম শো শেষ হয়েছে। দেশে নিয়মিতভাবে থিমেটিক ফিল্ম ফেস্টিভাল আমরাই শুরু করি। ডিইউএফএস’র এর উদ্যোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ঢাকা কলেজসহ প্রায় ১৫ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান প্রজন্মের কাছে চলচ্চিত্র বিষয়ে কিছু বলতে হলে টিএসসিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চার প্রেক্ষিত, প্রেক্ষাপট ও বিবর্তনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকাটা জরুরি যা দুই লাইনে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। টিএসসিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চায় ২৫ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পুনর্জাগরণ, সফল সংস্কার ও পুনর্গঠন যেভাবে সম্ভব হয়েছিল, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ছাত্রকর্মীদের না থাকাটাই স্বাভাবিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও তার ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বতন্ত্র যাত্রা ও আত্মপরিচয় বিনির্মাণের সংগ্রামে সাংস্কৃতিক লড়াইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চায় ১৯৯৫-৯৬ সালে যে নীরব বিপ্লব ও সংস্কার হয়েছিল, ডিইউএফএসে তার প্রভাব নিয়ে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি। টিএসসিকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংস্কৃতি চর্চা মূলত দু’টি ধারায় বহমান— জাতীয় প্রেক্ষাপট ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক চর্চা।

১. জাতীয় প্রেক্ষাপট

জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রধান সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে— জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, পথনাটক পরিষদ ইত্যাদি কেন্দ্রীয় সংগঠন ও তাদের এফিলিয়েটেড বিভিন্ন সদস্য সংগঠন। এদের কার্যক্রম জাতীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর শুরুটা মুক্তিযুদ্ধের পরপরই। সত্তরের দশকে টিএসসিকেন্দ্রিক নাট্য আন্দোলন ও আশির দশকে অনেকগুলো আবৃত্তি সংগঠন গড়ে ওঠে। এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তারা প্রায় সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং অধিকাংশই জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে এ ধারাটির প্রায় শতভাগই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আদর্শ ও চেতনায় এসে বিলীন হয়েছে। এ ধারার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর সরাসরি তেমন যোগসূত্র নেই। যদিও টিএসসির জাতীয় সাংস্কৃতিক নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের ফেডারেটিভ বডিরই সদস্য এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারাই পরিচালিত। এটা অসত্য কথন। ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে কখনোই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সদস্য করা হয়নি।

২. বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বলতে এখনকার মতো অসংখ্য সংগঠন নয়, তখন মূলত সংগঠন ছিল তিনটি— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি (ডিইউডিএস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডিইউজেএস) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ (ডিইউএফএস)। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চেজ ক্লাব, প্রগতির পরিব্রাজক দলের (প্রপদ) মতো কিছু সংগঠন থাকলেও এগুলোর ভূমিকা ততটা উল্লেখযোগ্য নয়।

ঢাবিকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার  পর থেকেই। তবে এর স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল ডাকসুর নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের হাত ধরে, ১৯৮২ সাল থেকে। ডাকসু’র উদ্যোগে লাকী ভাই গঠন করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। বিশাল এক সাংস্কৃতিক যজ্ঞ শুরু হলো। সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বিতর্ক, নাটক— প্রায় সব শাখায় দেশ বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পরিচর্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হলো অনবদ্য এক সাংস্কৃতিক জাগরণ। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত শত শত শিল্পী তৈরি হলো এখান থেকে। ১৯৮৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের অশোক কর্মকার সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে এবং জাসদ ছাত্রলীগের আবৃত্তিকার ইস্তেকবাল হোসেন সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। অশোক দা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ‘ডাকসু সাংস্কৃতিক দল’। লাকী ভাইর উত্তরাধিকারী হিসেবে তারাও দারুণভাবে ঋদ্ধ করলেন এই সাংস্কৃতিক জাগরণকে।

গৌরবময় অধ্যায়ে অশুভ ছায়া

১৯৯০ সালে ডাকসুতে ছাত্রদল নির্বাচিত হলে নতুন বাঁক নিলো এই সাংস্কৃতিক ধারা। ৯০-এর ডাকসুতে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হলেন মিলন মেহদী, সাহিত্য সম্পাদক নিয়ামত এলাহী। মিলন মেহেদীর অযোগ্যতা ও নির্লজ্জ সুবিধাবাদিতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়লো ‘ডাকসু সাংস্কৃতিক দল’। অপমৃত্যু ঘটে অসাধারণ এই সাংস্কৃতিক জাগরণের।  ‘ডাকসু সাংস্কৃতিক দল’-এর রুমটি হয়ে উঠলো বিএনপি-শিবিরমনাদের আখড়া। জিয়া, খালেদা জিয়া ও গোলাম আজমকে নিয়ে লেখা কয়েকটি তৃতীয় শ্রেণির পুস্তক প্রকাশন ছাড়া আর কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি। এই সময়েই ক্যাম্পাসের অন্য তিন সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ (ডিইউএফএস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি (ডিইউডিএস) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি(ডিইউজেএস)ওপরও পড়ে ছাত্রদল/শিবিরপন্থীদের অশুভ ছায়া।

ক্যাম্পাসে নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব

৯০এর ডাকসু, ৯০এর আন্দোলন এবং ৯১-এ বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে দারুণ অস্থিরতা তৈরি হয়। ছাত্রলীগ একপ্রকার ক্যাম্পাস ছাড়া হলেও টিএসসিকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ছাত্রদল/শিবিরের দৃশ্যমান কোন প্রভাব ছিল না। যেটা হয়েছিল তা হল ডাকসু সাংস্কৃতিক দল বিলুপ্তি এবং ডিইউএফএস, ডিইউডিএস ও ডিইউজেএস-এ ছাত্রদল/শিবিরমনাদের ষড়যন্ত্রমূলক দখলদারিত্ব যা বাইরে থেকে বোঝা যেতো না। এর প্রধান কারণ হলো সারাদেশে বিএনপি জামাতের বল্গাহীন আধিপত্য শুরু হওয়ার পরেও টিএসসির বহমান সাংস্কৃতিক চর্চা ও বাংলা একাডেমির বই মেলা বরাবরই রাজাকার ও শিবির মুক্ত ছিল বলা যায়, এমনকি ১৯৯১-৯৬ সালেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির হাতেই নিয়ন্ত্রণ ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের। ক্যাম্পাসের উত্তরপাড়া ছাত্রদলের দখলে এবং জহুরুলহক হল ও এসএম হল মন্টু গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও জগন্নাথ হল ছিল আমাদের সবার আশ্রয়স্থল।

স্বাধীনতা উত্তর সময় থেকেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সবারই প্রাণের জায়গা টিএসসি। সবাই যে যার মতন ক্লাস করেন বা সাবেকরা পেশাগত ব্যস্ততা শেষ করে টিএসসিতেই আসেন। সংস্কৃতিকর্মীরাই শুধু নয় অন্যরা আসতো শুধুই আড্ডা দিতে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আমার ২৫/৩০ জন ছোট বেলার বন্ধু (পটুয়াখালী), সিনিয়র/ জুনিয়রসহ তারা সবাই বিকেল থেকে প্রায় মধ্যরাত অবধি ডাসের উল্টো দিকে নুরুর দোকানকে কেন্দ্র করে টিএসসির ওয়ালে বসে আড্ডা দিতো। টিএসসির আড্ডাবাজ প্রায় সব গ্রুপের সঙ্গেই আমাদের একপ্রকার বন্ধন ছিল। সার্বজনীন উদ্যোগে শিবিরমনাকর্মীদের নিয়মিতভাবে সকাল বিকাল ধোলাই করা হয় টিএসসি এলাকায়, তাতে ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন। আর  টিএসসি চত্বরে ছাত্রদলের ধান্দাবাজ সাংস্কৃতিক নেতারা সব সময় চোরের মতোই ঢুকতো। তারা এক্সপোজও হতে না চাওয়ার আরেকটা বড় কারণ মনে হয়েছে, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় বা হল পর্যায়ের অধিকাংশ নেতারা ব্যস্ত থাকে টেন্ডারবাজিতে, আর্থিক সুবিধা ছাড়া তারা নড়েচড়ে না সংস্কৃতি চর্চা ওদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অসহ্য মনে হয়। যে কয়েকজন সুবিধাবাদী ছাত্রদল/শিবিরের নেতা-কর্মীরা যে কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে দখলদারিত্ব কায়েম করেছে, তার কোনোভাবেই চায় না অন্যকোনো ছাত্রদল নেতা তাদের ধান্দাবাজিতে ভাগ বসাক। তাই তারা মুখচোরা শিবিরকর্মীদের নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪৭ বছর পর ১৯৬৮ সালে চালু হয় টিএসসি। বোধকরি জন্মের পর থেকেই টিএসসি ছিল প্রগতিশীল মুক্তবুদ্ধির সাংস্কৃতিক চেতনা ও চর্চার সূতিকাগার। আর আমাদের সময়ে রাজনৈতিক বিরুদ্ধ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও টিএসসিতে আমরা শক্তিমান ছিলাম, শুধু ৭১ আর  ৭৫এর শত্রুরাই নয় উত্তরপাড়া থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা ক্ষমতাশালী শক্তির অনুগামী গুণ্ডা সন্ত্রাসী থেকে তাদের বিভ্রান্ত উত্তরাধিকার ধর্মান্ধ জঙ্গি-কেউই সাহস পায়নি টিএসসি’র সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আঘাত করার।

এর আরেকটা বড় কারণ ছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ আদালত আন্দোলনের ব্যপ্তি। আমরা সবাই তখন রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে রাজপথে। ১৯৯৩ সালে সাবেক জাসদ ছাত্রলীগ নেতা কামালপাশা চৌধুরী ও সাদেকুর রহমান পরাগ ভাইয়ের নেতৃত্বে টিএসসিতে গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আফজাল হোসেন ও কালাম ভাইও ছিলেন শীর্ষস্থানীয় পদে। আফজাল বাবু,শাহাদৎ হোসেন নিপু, কিরিটী রঞ্জন বিশ্বাস, জাকারিয়া দ্বীপ, তুহিন ভাই, রনি ভাই, মামুন ভাই, আলম ভাই, পাভেল ভাই, ইমরান ভাই, মৃদুল দা, সোহেলা পারভীন শোভা, মোস্তাক হোসেন বিপুসহ অনেক প্রিয় অগ্রজ সহযোদ্ধারা ছাত্রকমান্ডের নেতৃত্বে দেশব্যাপী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুললেন।

টিএসসিতে আমাদের সব কর্মকাণ্ড ও আয়োজনে নির্ভরতার আশ্রয় ছিলেন কয়েকজন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সংস্কৃতিমনা সিনিয়র ছাত্রলীগ নেতা যেমন হাসান আরিফ, আহকাম উল্লাহ, লিয়াকত শিকদার, মাহাবুবুল হক শাকিল, আব্দুল ওয়াদুদ খোকন, সাজ্জাদ হোসেন, দুলাল ভাই, নাজমুল হক অনিক, মারুফা আক্তার পপি, শিখা বোস, মশরুর জামান রনি, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল প্রমুখ। আমাদের ব্যাচের রফিক জামান রিমু, বিপ্লব মোস্তাফিজ, শহীদুল ইসলাম, আনিসুর রহমান সরকার লিটু, একেএম আজিম, শাহজাহান কচি, মেহেদী হাসানসহ আমাদের পরবর্তী কয়েকটি ব্যাচের শতাধিক সহযোদ্ধারাই আমাদের মূল শক্তি ছিল যে কোনো আয়োজনের।

৯১ থেকে ৯৬ এই বৈরী সময়ে আমাদের রুটিন ছিল-সবাই দিনের বেলা ছাত্রলীগের মিছিল মিটিং করে বিকেল থেকে টিএসসির আড্ডা ও সন্ধ্যায় হাজির ছাত্র কমান্ডের রুমে। বিশেষ করে ৯৬ এর আন্দোলনের রাজপথের এর যাবতীয় কর্মসূচির পরিকল্পনা সবই নির্ধারিত হতো টিএসসির সান্ধ্যকালিন আড্ডায়। এর ফলে ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের সমান্তরালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে ছাত্রদল/শিবির মুক্ত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠাকাল ধরা হয় ১৯৬৩ সালকে। গত শতাব্দীর ২০ এর সিনে ক্লাব দ্য ফ্রান্স(১৯২০), ১৯২৫ সালে দ্য ফিল্ম সোসাইটি অব লন্ডন (১৯২৫), বোম্বে ফিল্ম সোসাইটি (১৯৪২, শ্রীলঙ্কা ফিল্ম সোসাইটি (১৯৪৫), ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি (১৯৪৬), বেঙ্গল ফিল্ম সোসাইটি (১৯৫০) এর আদলে ১৯৬৩ সালে মাহাবুব জামিলের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাব”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা সময় হিসেবে এটাকেই বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৩ সালে মাহাবুব জামিলদের হাত ধরে। প্রতিষ্ঠাকালে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী বর্তমান বিএনপি নেতা মঈন খান, প্রফেসর আব্দুস সেলিমও ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স সিনে ক্লাবও প্রতিষ্ঠিত হয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সদ্য প্রয়াত মোহম্মদ খসরুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল মাহাবুব জামিলেদের। ১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর গঠিত হয় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ মোহম্মদ খসরুর হাত ধরে যেটি আজ বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূতিকাগার এই বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাব বেশ কিছু ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং পরে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’কে এগিয়ে নিয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭৮-১৯৮৯ এর মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে আরও দু একটি চলচ্চিত্র সংসদ কাজ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সঙ্গে রেখে। যেমন এরশাদের সময়কালে শবমেহের চলচ্চিত্রের পরিচালক ইসমাইল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ফিল্ম ক্লাবকে “ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি” নামকরণ দিয়ে কিছুদিন কার্যক্রম চালান।

শামসুল আলম  লিটন নামে ঢাকা কলেজের তুখোড় জাসদ ছাত্রলীগ নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন ১৯৮৯-৯০ সেশনে। তার বড় ভাইও জাসদের বড় নেতা। ৯০ এর ডাকসুতে জাসদ ছাত্রলীগ থেকেই জসিম উদ্দিন হলে হল সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন করেছিলেন। ডাকসু নির্বাচনের পর ৯১সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে লিটন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ছেড়ে জিন্দাবাদের ঝাণ্ডা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন। বিএনপিপন্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক তৌহিদুল আনোয়ার স্যারের সঙ্গে গড়ে তুললেন সখ্যতা। অধ্যাপক তৌহিদুল আনোয়ার বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হলে তার সুপারিশে লিটন দৈনিক দিনকালের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হলেন। এই সময়ে সে তারেক জিয়ার সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে লিটন বহিরাগত ও শিবিরমনা কিছু অনুগত শিষ্য সমেত “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ” পুনর্গঠন করেন। অধ্যাপক তৌহিদুল আনোয়ারকে করা হয় এর মডারেটর। ২০ শতাংশ বহিরাগত কোঠা রেখে সভাপতির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে গঠনতন্ত্র তৈরি করা হয়। লিটন স্বেচ্ছাচারী হলেও খুবই চিকন বুদ্ধির সংগঠক ছিল। প্রতিষ্ঠার পরপরই সরকারি ডোনেশন ও কর্পোরেট সহায়তা নিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব এর আয়োজন করে। ১৯৯৪ সালে বিএফডিসির উদ্যোগে তথ্য মন্ত্রণালয় ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় চলচ্চিত্রের ১০০ বছর উদযাপনের উদ্যোগ নেয় যেখানে ডিইউএফএস’র উপর ছিল অর্থসংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান ইভেন্টগুলোর দায়িত্ব। যার মধ্যে দুটি ভাস্কর্য নির্মাণ, সকল পাবলিকেশন্স, র‍্যালী, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। এই প্রোগ্রামের অর্থকড়ির হিসাব চাইলে শুরু হয় আভ্যন্তরীন দ্বন্দ। ১৯৯৪ সালে সোসাইটির সদস্য যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তারা ২০ শতাংশ বহিরাগত কোটা তুলে সংগঠনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু লিটন তা পাত্তা দেয় না। লিটন-সেতু কমিটিতে শাহেদ নামে শিবিরমনা এক বহিরাগতকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। এই সময়ে লিটন তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটা অস্ট্রেলিয়া ট্যুরে আমন্ত্রণ পায় এবং অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে যাওয়ার সময় বহিরাগত শাহেদ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পায়। এই ইস্যুতে সংগঠন দ্বিধাবিভক্ত হয়।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৯১-৯২ সেশনে কিন্তু টিএসসির সংস্কৃতি অঙ্গন ইন্টার লাইফ থেকেই পরিচিত। ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়ে পূর্ণদমে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন দাপিয়ে বেড়াই। আলিয়াস ফ্রাসেস, গ্যাটে ইন্সটিটিউট, রাশান কালচারাল সেন্টারে, পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে আড্ডা দেই, মুভি দেখি ইন্টার থেকেই। বিকল্পধারার চলচ্চিত্র এবং শর্ট ফিল্ম জগতের অনেককেই দেখি, টুকটাক চিনিও কয়েকজনকে। টিএসসির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রায় সবাই খুব পরিচিত মুখ। কিন্তু খটকা লাগলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের কাউকেই চিনি না। তাদের আগেও কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। তারা চুপিসারে দোতলায় যায়, সংসদের রুমে বসে কি করে টের পাই না। জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবের পোস্টার দেখলাম আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ। আমার ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ জন্মালো। ১৯৯৪ সালে একদিন কয়েকজন বন্ধুসহ লিটনকে ধরলাম, জাস্ট সৌজন্য সাক্ষাৎ। বললাম “ভাই আপনি বোধহয় ফিল্ম সোসাইটির লোক। উৎসব করছেন আমরা তো ছবি টবি দেখবো।” লিটন পুরা শিবির স্টাইলে, ভাইয়া কি নাম তোমার, হ্যাঁ ছবিতো দেখবাই, স্ট্যাম্প সাইজের ছবি নিয়ে এসো, তোমাদের আইডি কার্ড করে দিব যাতে সব ছবি দেখতে পাও…ইত্যাদি নানা প্রকার ছেলে ভুলানো কথা। বললাম সংসদের সদস্য হতে চাই, কি করতে হবে। বললো অবশ্যই হবে। উৎসবটা শেষ হোক..। তারপর আর লিটনরে ধরতে পারি না সে সযত্নে আমারে এড়িয়ে চিল। একটা রিপ্রেজেন্টটেটিবদের মত একটা ব্যাগ হাতে শশব্যস্ত। রিক্সা থেকে নেমে সোজা ক্যাফেটেরিয়ার টিচার্স লাউঞ্জে। ওখানে বসে গোপন মিটিং করে, আর লাঞ্চ করে পেছন থেকেই চলে যায়। আমার সামনে পড়ে না। যে দুই একবার পড়েছে, ভাইয়া খুব জরুরি একটা মিটিং আছে- তোমার সঙ্গে কথা আছে, পরে বলবো। পরে বুঝেছি লিটন তখন ঘরে বাইরে ব্যাপক প্রেসারে।

এরই মধ্যে ডিইউএফএস-এর অন্তর্দ্বন্দ চরমে ওঠে। লিটন-সেতুর বিরুদ্ধে মামুন-কালাম নতুন কমিটি ঘোষণা করলো। কিছু বহিরাগতের আনাগোনা টের পাই। মামুন ভাই কালাম ভাই দুজনই আমার কিছুটা পূর্বপরিচিত। মামুন ভাই আমাকে নিয়ে তাদের সংকট বিশদভাবে বোঝালেন। সিদ্ধান্ত নিলাম এই কমিটিকে স্টাবলিশ করেই ফিল্ম সোসাইটিকে ছাত্রদল/শিবিরমুক্ত করবো। এই ক্রান্তিকালে পরাগ ভাই আমাদের বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন পর্দার আড়াল থেকে। ফিল্ম সোসাইটি করতে আগ্রহী আমাদের বন্ধু ও ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। এর মধ্যে একদিন মামুন ভাইর নামে একটা মিথ্যা মামলা দায়ের করলো লিটন। মামুন ভাইকে গ্রেফতার করা হলো রমনা থানায়। আমরা গিয়ে তাকে থানা থেকে মুক্ত করে আনি। পরদিন টিএসসিতে লিটনসহ ওর সকল দোসরদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম। লিটন সেই যে ক্যাম্পাস ছাড়লো আর আসে নাই। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরির এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিল। তারেক জিয়া দেশ ছেড়ে পালানোর অব্যবহিত পরে সে ও লন্ডনে চলে যায়। বন্ধু বিপ্লব মোস্তাফিজ তখন সময় দেয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে, ওকে বললাম ফিল্ম সোসাইটির দায়িত্ব নেয়ার জন্যও রাজী হলো। মামুন-কালাম কমিটির পর ১৯৯৬ সালের বিপ্লব-সাব্বির কমিটি সমমনা বেশ কিছু অনুজ সতীর্থদের নিয়ে চলচ্চিত্র সংসদের নবযাত্রা শুরু করলো। সেই থেকে অদ্যাবধি বিরামহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ যা এখন আন্তর্জাতিকভাবে আদৃত একটি স্টুডেন্ট ফিল্ম সোসাইটি, সারা পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রপ্রেমী ছাত্রদের কাছে নন্দিত একটি প্রতিষ্ঠান।

চলচ্চিত্র সংসদ পুনর্গঠনের পরও ডিইউডিএস ও সাংবাদিক সমিতিতে ছাত্রদল/শিবিরের একটি কালো ছায়া তখনও অপসারিত হয় নি। এরই মধ্যে ৯৬ এর আন্দোলনে উত্তপ্ত ঢাকার রাজপথ। টিএসসিতে খোকন ভাই-সাজ্জাদ ভাইর নেতৃত্বে আমরা গোপন প্রস্তুতি নেই পিকেটিং এর। পিকেটিং এর নিত্য নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করি। সেই দুর্বার সময়ে আমি একদিন টিএসসির বাইরে ছিলাম কি একটা কাজে। এরই মধ্যে সাজ্জাদ ভাই, পরাগ ভাইর নেতৃত্বে আমাদের সহযোদ্ধারা ডাকসু সাংস্কৃতিক দলের নামে বরাদ্দ মিলন মেহেদীর রুমটা ভেঙে জিয়া-খালেদা ও গোলাম আজমকে নিয়ে লেখা শত শত বই উদ্ধার করে টিএসসির সামনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমি সন্ধ্যার দিকে এসে দেখি টিএসসি এক প্রকার স্বাধীন হয়ে গেছে। সিনিয়ররা রুমটা আমার হাতে বুঝিয়ে দেয়। পরবর্তীতে আমরা স্লোগান’৭১ গঠন করে এই রুমেই তার কার্যক্রম শুরু করি। সেদিন থেকে টিএসসির অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার একটা দায়বদ্ধতা আমাদের চলে আসে। বিশেষ করে সংগঠনগুলোর রিহার্সাল করার জন্য রুম বরাদ্দ করার মতো জটিল দায়িত্ব মাথায় নিতে হয়। কয়েকজন প্রিয় অনুজকে এ কাজটা দিলে তারা বেশ দক্ষভাবেই ৫/৬ বছর এ দায়িত্বটি মহা উৎসাহে সুচারুভাবে পালন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি:

দেশবরেণ্য যত মেধাবী বিতার্কিক আছে তার সিংহভাগই এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। লাকী ভাইয়ের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের বিতর্ক বিভাগটি খুবই ঋদ্ধ ছিল। নিয়মিতভাবে আন্ত:হল, আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। অনেক হলে ডিবেটিং ক্লাব ছিল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ডিবেটিং ক্লাবগুলো নিয়ে ১৯৯০ সালে বিরূপাক্ষ পালের নেতৃত্বে তৈরি হল বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বিতর্ক সংগঠনগুলোর অ্যাসোসিয়েশন। যেখানে প্রথম কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিয়ামত এলাহী। অন্যান্য ডিবেটরদের মধ্যে ডা: নাকিব উদ্দিন, আব্দুর নূর তুষার, তোফায়েল, ডা. মুহিত, মেহের নিগার জুন, ইশতিয়াক মান্নান, আমিনুল হক মিঠু আমাদের বন্ধুদের মধ্যে লায়লা খন্দকার, শহীদুল হক রোমেল, মোখলেসুর রহমান টোকন, বিপ্লব মোস্তাফিজ প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে ডিবেট আছে। ১৯৮২ সালকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিষ্ঠাবর্ষ ধরা হয়, প্রতিষ্ঠাতা ড. জাহানারা বেগমসহ অন্যান্য শিক্ষকরা। ৯০র ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক নিয়ামত এলাহী বিডিএফ-এ খুব বেশি সুবিধা করতে না পারায় ডানপন্থী ডিবেটরদের নিয়ে ডিইউডিএস এর নবযাত্রা শুরু করে। প্রথমে তৈরি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিওসোফিকাল সোসাইটি। সেটা পরে পরিবর্তিত হয়ে হয় ডিইউডিএস। মূলত ডাকসুর গাইডেন্সেই।

১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিওসোফিকাল সোসাইটির প্রথম কমিটির সভাপতি হন নিয়ামত এলাহী সাধারণ সম্পাদক মুনির খসরু। হাসান আহমেদ কিরণের সঙ্গে মুনির খসরুর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিওসোফিকাল সোসাইটি নাম পরিবর্তন করে নিয়ামত এলাহীর সঙ্গে কিরণকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২সালে কিরণ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শামীম রেজা/সৈয়দ আশিক। ১৯৯৪ সালে একেএম শোয়েব-নেওয়াজ খালিদ আহমেদ, ১৯৯৬ সালে আনিস-রথীন। এই কমিটির প্রায় সবাই ছাত্রদল সমর্থক যাদের মধ্যে মুখচোরা শিবিরপন্থীও ছিল। নিয়ামত এলাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর বিদেশে চলে যায়। হাসান আহমেদ কিরণ করেন আদম ব্যবসা। ডিইউডিএসএর সভাপতি হওয়ার পরপরই কিরণ বিটিভি দখলে নেয় সেই সঙ্গে ডিইউডিএসএর ডানপন্থী অংশের পৃষ্টপোষকতা দেয়া শুরু করে। প্রগতিশীল অংশের বিতার্কিকরা বিভিন্নভাবে সুভাষ সিংহ রায়, প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া প্রমুখকে বিভিন্ন প্রোগ্রামে সংযুক্ত করলো। হাসান আহমেদ কিরণ সুবিধাবাদী চরিত্রের হলেও বাংলাদেশের টিভি বিতর্ক তথা বিতর্ককে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তার অবদান বর্তমান সময়ে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার উত্তাল সময়ে টিএসসিকেন্দ্রিক যে নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হলো তার ঠেউ লাগলো ডিইউডিএস-এ। কিরণকে টিএসসিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল সেই সঙ্গে সাধারণ বিতার্কিকরা পকেট কমিটির বিরুদ্ধে শুরু করলো বিদ্রোহ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আহকাম উল্লাহসহ সিনিয়র কয়েকজন বিতার্কিক সবপক্ষকে নিয়ে ডিইউডিএস এ গণতান্ত্রায়নের জন্য একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচন কমিটি ঘোষণা করলো। সেই কমিটির সভাপতি বা প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন হারুন উর রশীদ স্বপন। অন্যান্য অ্যাডভাইজাররা হলেন শিউলী আফসার, আমিনুল হক সজল, রুমানা হাশেম, তুলি ও রফিক উল্লাহ রোমেল সানা। সেই নির্বাচনে প্রোগ্রেসিভ অংশ থেকে তানজিবুল রনি সভাপতি ও নিয়ামত এলাহীর গ্রুপ থেকে মুনির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে ডিবেটিং সোসাইটিকে মোটামুটি ছাত্রদল/শিবিরমুক্ত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি:

১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি গঠন হয়। প্রথম কমিটি ছিল হারুন অর রশীদ/আইনি ইলিয়াস-রেজানুল হক রাজা। মুকুল ভাই ডানপন্থী গ্রুপের নেতা, তার নেতৃত্বে ডানপন্থী গ্রুপের অন্যান্যরা ছিলেন আব্দুল হাই সিদ্দিকি, রেজাউল করিম লোটাস, নুরুল আজম পবন সহ অন্যান্যরা। প্রোগ্রেসিভ অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রেজানুল হক রাজা, সৈয়দ ইশতেয়াক রেজা, কোরবান আলী, খায়রুজ্জামান কামাল, তারেক আল নাসের, শেখ ফরিদ, জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল, হাফিজুর রহমান কার্জন প্রমুখ। ৯০ এর আগ পর্যন্ত কমিটিতে মোটামুটি ব্যালেন্স ছিল। ৯০ এর ডাকসু নির্বাচনের পর ছাত্রদল/শিবিরপন্থীদের দাপট বাড়তে থাকে। শিবলী সালেহ, ইলিয়াস খান, গিয়াস উদ্দিন রিমন প্রমুখ অতি ডানরা সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ করতো। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিলেন শরিফুজ্জামান পিন্টু, তরুন সরকার, আমিনুল ইসলাম সজল প্রমুখ সাংবাদিক।৯২-৯৩ সালে শিবলী-ইলিয়াস কমিটি ছিল। তারা উভয়ই চরম ডানপন্থী। ৯৩-৯৪ সালে ছিল শরিফুজ্জামান পিন্টুর-ইলিয়াস খান কমিটি। পিন্টু ভাই ছিল নির্বিবাদী টাইপের মানুষ কিন্তু চরম এন্টি জামাত এন্টি বিএনপি। ক্যাম্পাস প্রতিনিধি অনেক প্রোগ্রেসিভ সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এড়িয়ে চলতো। যেহেতু সাংবাদিকদের সংগঠন তাই ছাত্রনেতারা সকল সাংবাদিকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতো। শীর্ষ প্রোগ্রেসিভ ছাত্র নেতারা কভারেজ পাওয়ার জন্য শিবিরমনা সাংবাদিকদের হাতে রাখতো। অনেকে শুনি নিয়মিত মাসোয়ারা নেয়, অনেকের সঙ্গে রয়েছে রাতের আড্ডার সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতারাও তাদের তোয়াজ করে। ইত্তেফাক প্রতিনিধি আনোয়ার আলদীন ছিল সরাসরি তারেক জিয়ার এজেন্ট।

৯৬ এর আন্দোলনের পর প্রোগ্রেসিভ অংশের সাংবাদিকদের মনোবল বাড়তে থাকে।পরবর্তী কমিটিতে তরুণ সরকার-নাসির উদ্দিন কচি জয়ী হলে ডানপন্থীদের প্রভাব কমতে থাকে।নবীন ছাত্র যারা সাংবাদিক সমিতির নতুন সদস্য হচ্ছিল তাদের মধ্যে প্রোগ্রেসিভ সাংবাদিকদের অংশটাই বেশি। বিশেষ করে আবুল কালাম আজাদ, রাজীব, আব্দুল্লাহ আল মামুন, পাপ্পু, কৈলাশ সরকার, পিনাকী রায় প্রমুখ সবাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের প্রভাবশালী ক্যাম্পাস সাংবাদিক। এর কয়েক বছর পর ইত্তেফাকে আনোয়ার আলদীন স্টাফ রিপোর্টার হলে ইত্তেফাকের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি পদটি খালি হয়। প্রোগ্রেসিভ সাংবাদিকরা পাপ্পুকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করার জন্য লবিং করতে থাকে এবং প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে আনোয়ার আল দ্বীন তার লিগ্যাসি প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠে। এবয় সাবু নামক এক শিবির কর্মীকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি বানায়। এই ইস্যুতে একদিন প্রকাশ্যে মধুর ক্যান্টিনে সবার সম্মুখে মামুন আনোয়ার আলদ্বীনকে লাঞ্ছিত করে। সেই থেকে ধীরে ধীরে সাংবাদিক সমিতিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অবস্থান দৃঢ় হয়।

অতঃপর ডাকসু আগামীর প্রত্যাশা:

বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার উত্থান-পতনের প্রধানতম নিয়ামক ডাকসু। ডাকসুর অপরিহার্যতা বিগত দুইযুগে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি আমরা। এই ডাকসুর হাত ধরে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যে সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল সে জাগরণ ১৯৯১-৯৬ পর্যন্ত চরমভাবে বাঁধা সৃষ্টি হয়েছিল ডাকসুরই অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে। ৯৬ এর পরে অশুভ শক্তিকে টিএসসি থেকে সমূলে উচ্ছেদ করার পর ২০০১ সালে জামাত-বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই অশুভ শক্তি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল, সফল হয় নি। ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানত ৩টি সংগঠনই উল্লেখযোগ্য ছিল সেখানে আজ  প্রায় শতাধিক সংগঠন রয়েছে। বিগত দুই-আড়াই যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো সাংস্কৃতিক, উন্নয়নমূলক ও নানা বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত ডিপার্টমেন্টও খোলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে শুধু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনই নয়, আইটি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান, পরিবেশ, ট্যুরিজমসহ নানা বিভাগভিক্তিক সংগঠন গড়ে ওঠেছে।

বিশ্বব্যাপী মৌলবাদের উত্থানের ঠেউ বাংলাদেশেও পড়েছে অনিবার্যভাবে। সুতরাং সকল সেক্টরেই এই অশুভ শক্তি ঘাপটি মেরে আছে, টিএসসিকেন্দ্রিক সংগঠনসমূহ ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। তাই সজাগ থাকতে হবে সকলকেই। যেহেতু এখন নির্বাচিত ডাকসু রয়েছে সুতরাং আশা করতেই পারি লিয়াকত আলী লাকি-অশোক কর্মকারের যুগের মত আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নবযাত্রা শুরু হবে ডাকসু সাংস্কৃতিক সংসদের। যেই সংসদ কাজ করবে বিদ্যমান সকল সংগঠনের সমন্বয়ক হিসেবে। প্রতিটি সংগঠন চলবে তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ডাকসু তাদের ঠিক নিয়ন্ত্রণ নয় তাদের পৃষ্টপোষকতা দিবে, সব সংগঠনের সুদিন-দুর্দিনে পাশে থাকবে, এফিলিয়েশন দিবে। ডাকসু ছিল না বিধায় গত একদশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ যুথবদ্ধভাবে ১৪-১৫ ডিসেম্বর “রক্তে রাঙা বিজয় আমার” অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । প্রতিবছর ১৫ ডিসেম্বর বিজয়ের রাতে টিএসসি হয়ে ওঠে সাবেক-বর্তমানদের মিলন মেলা যার শুরুটা সেই ৯০ এর আন্দোলন থেকে। ডাকসুর উচিত এসকল অনুষ্ঠানকে সর্বোচ্চ পৃষ্টপোষকতা দেয়া। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উন্নত জাতি গঠনে সাংস্কৃতিক জাগরণের কোন বিকল্প নেই; মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডাকসুর নেতৃত্বে আরেকটি সাংস্কৃতিক জাগরণ তাই খুব জরুরী।

লেখক: সুমন জাহিদ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও চলচ্চিত্রসংসদ কর্মী।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন