বুধবার ২২ মে, ২০১৯ ইং , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মা দিবসে স্মরণ: ‘কণিকা’র সেই ঘড়ির পাখিটা

মে ১১, ২০১৯ | ৮:২১ অপরাহ্ণ

ছোটবেলায় আমাদের যে অল্প কজন আত্মীয়-স্বজন ঢাকা শহরে থাকতেন, তাদের বাড়িতে আমার প্রায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আব্বা আম্মার সাথে। এরমধ্যে এলিফ্যান্ট রোডের ‘কণিকা’ নামের বাড়িটি ছিল আমার কাছে স্বপ্নের মত একটি বাড়ি। সামনে বাগানওয়ালা খুব সুন্দর একটি দোতলা বাড়ি। ঘরের ভেতরটাও ছিমছামভাবে সাজানো। গাড়ি বারান্দায় ছোট একটি গাড়ি দাঁড়ানো থাকতো, নামটা এখন মনে করতে পারছিনা। বাড়িটার আসবাবপত্রগুলো একদম অন্যরকম। পরে বুঝেছি সেইসব খুব আধুনিক ছিল। আমাদের আর কারো বাড়িতে তেমনটা ছিলনা।

ঐ বাড়িতে গিয়ে আমি সবসময়ই অবাক হয়ে যেতাম, পাখি ডাকা দেয়াল ঘড়িটা দেখে। ঘড়িতে ঘন্টার বেল বাজার সাথে সাথে একটি পাখি মুখ বের করে ডাকতো কুউউ। আমি দেখে অবাক হয়ে ভাবতাম হয়তো ঐ ঘড়িটার ভেতরেই পাখিটা থাকে। মাঝেমাঝে এসে ডেকে যায়। মনেহতো বড় হয়ে একসময় এমন একটি পাখি ডাকা ঘড়ি আমি ঘরে রাখবো। যাক, তা আর কেনা হয়নি।

সে সময়ের এই বনেদী বাড়িটি ছিল দোতলা। নীচে বসার ঘরের পাশ দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই দেখতাম আমার বড় দাদা, একসময়ের রংপুর কাঁপানো আইনজীবি মোহাম্মদ আলী সাহেব একটি ইজি চেয়ারে বসে আছেন। সবাই এসেই আগে দাদাকে দেখতে যেতো। পাশেই ছিল বেডরুম, লিভিং রুম আর লাইব্রেরি। পরিপাটি করে সাজানো। কারো বাসায় যে এত সুন্দর করে অজস্র বই গুছিয়ে রাখা হয়, এটাও আমার প্রথম দেখা। দাদা চোখে দেখতে পেতেন না ঠিকই কিন্তু সবার খোঁজখবর নিতেন।

সেই বাসার যিনি গৃহিনী, তিনি আমার চাচি, জাহানারা ইমাম। আমরা ডাকতাম জাহানারা চাচি। এমন শিক্ষিত, সুন্দর, অমায়িক ও স্মার্ট মানুষ আমি আজ পর্যন্ত খুবই কম দেখেছি। চাচিকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো। তাঁর আচার আচরণের মধ্যে এমন একধরণের দৃঢ়তা ছিল, যা আমি ছোটবেলাতেই বুঝতে পারতাম। যত বড় হয়েছি, ততোই আমার মুগ্ধতা বেড়েছে। কলেজে উঠে যখন সুচিত্রা সেনের সিনেমা দেখেছি, তখন আবার নতুন করে মনেহল চাচির চেহারাটাতো অনেকটাই সুচিত্রা সেনের মত।

চাচি যখন গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাসায় আসতেন, তখন আমি আরো অবাক হতাম। পাড়ার সবাই অবাক হয়ে দেখতো। সেইসময় গাড়িই ছিল হাতেগোণা, এর উপর একজন নারী সেই গাড়ির চালক। ঢাকায় আমাদের খাটুরিয়া পরিবারের, মানে চাচির শ্বশুরবাড়ির, যারা থাকতেন, তারা সবাই ছিল চাচির ভক্ত। চাচি তা অর্জন করেছেন তাঁর অমায়িক ব্যবহার দিয়ে। শরীফ চাচা ছিলেন খুব শান্তশিষ্ট মানুষ। গল্প-স্বল্প করা, আমাদের খোঁজ খবর নেয়া সবই করতেন চাচি। আব্বাদের সবার কাছে চাচি ছিলেন খুব প্রিয় মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ঢাকা শহর শূন্য হতে লাগলো। আমরা খাটুরিয়ার কয়েকটি পরিবার থেকে গেলাম এই ঢাকাতেই। আমি তখন খুব ছোট কিন্তু সেসময়ের ঘটনাগুলো এত শক্তিশালী ছিল যে অনেককিছুই মনে আছে। কার্ফ্যু না থাকলে আব্বারা প্রায় সন্ধ্যায় কণিকায় যেতো, দাদার খোঁজ নিতো, চাচা চাচির সাথে গল্প করতো। হঠাৎ একদিন শুনলাম রুমি ভাই যুদ্ধে চলে গেছে। সবাই জানতো শুধু দাদাকে জানানো হয়নি। নিজেদের নিরাপত্তা, দেশের স্বাধীনতার ভাবনা এবং পরিবারের একটি ছেলের মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়া- এইসব নিয়েই বিচলিত থাকতো সবাই। আমাদের মতো একটি পরিবারে এটি একটি অনেক বড় ঘটনা ছিল।

এরপর যুদ্ধ শেষ হল, দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু কণিকার সাজানো বাগানটি ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। রুমি ভাই শহীদ হলেন। সেই শোকে শরীফ চাচাও চলে গেলেন। চাচি একা হয়ে পড়লেন। ছোট ছেলে জামি ভাই বিদেশে পড়তে চলে গেল। রুমি ভাই শহীদ হওয়ার পর শহীদ রুমির সেই পরিচিত দীর্ঘ প্রোট্রেটটি দাদার মাথার পেছনে টাঙানো হয়েছিল। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেই তা চোখে পড়তো।

স্বামী এবং শ্বশুর চলে যাওয়ার পরেও চাচি কিন্তু কখনোই তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকদের ভুলে যাননি। বরং উনি সবসময় আমাদের বাসায় আসতেন, সবার খোঁজখবর রাখতেন। আমরাও যেতাম কণিকায় কিন্তু গিয়ে বুঝতাম চাচিদের সেই ‘কুউউ’ বলা সুখ পাখিটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এভাবেই মাঝে অনেকগুলো বছর চলে গেল।

জামি ভাই বিদেশিনী বিয়ে করার পর ফ্রিডা ভাবিকে নিয়ে যেদিন আমাদের বাসায় এলেন, সেদিন ঐ বিদেশি বউয়ের সাথে কীভাবে ইংরেজিতে কথা বলবো, এই নিয়ে ইতস্তত করছি দেখে চাচিই বলেছিলেন, এত চিন্তা করছো কেন? তুমি বাংলায় কথা বল রঞ্জনা। বাংলা তোমার ভাষা। তুমি তোমার ভাষা বলবে আর ওর ভাষায় তোমার ভাই ওকে বুঝিয়ে দেবে। নিজের ভাষা বলতে কখনো কুন্ঠিত হবেনা।”

জাহানারা চাচিকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, চাচির প্রিয় খাবার কী? চাচি বলেছিলেন ভুনা গরুর মাংশ দিয়ে দই মাখা পান্তা ভাত। প্রিয় ফুল ছিল রজনীগন্ধ্যা আর বেলি। তবে ঐ অদ্ভ’ত কম্বিনেশনের খাওয়াটা কেমন হতে পারে, তা আর চেখে দেখা হয়নি কখনো।

পরে চাচি সেই বউ নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি খাটুরিয়াতেও গিয়েছিলেন ১৯৮০ সালের দিকে। আমার দাদা, জাহানারা চাচির চাচা শ্বশুর, এডভোকেট আব্দুল গণি সাহেব ছিলেন খুবই আধুনিক একজন মানুষ। বিদেশি বউয়ের সাথে অনেক গল্প গুজব করেছিলেন দাদা। জানতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রাম তার কেমন লাগছে? জাহানারা চাচি বলেছিলেন, চাচা বউকে বাংলাদেশ চেনাবো বলেই আমাদের গ্রামে নিয়ে এসেছি। আপনি ওর সাথে গ্রামের গল্প করেন। দেশের কথা বলেন।

এরপরের কথা আমরা সবাই জানি। ক্যান্সারের সাথে চাচির যুদ্ধ, বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু উনি এক মূহুর্তেও জন্যেও থেমে যাননি। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সেদিন যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই যুদ্ধ শেষ হয়েছে একাত্তুরের ঘাতক দালালদের শান্তি দেয়ার মাধ্যমে। উনি সেদিন পতাকা উড়িয়েছিলেন বলেই আজ এদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। সেই অকুতোভয় যোদ্ধার পরিবারের সদস্য হতে পেরে আমি, আমরা গর্বিত। জাহানারা ইমামের “একাত্তুরের দিনগুলি” বইতে আব্বাসহ আমার অন্য চাচা ও ভাইদের নামও আছে। এটাও আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া। আমরা ওনার লেখনির মাধ্যমে ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছি। আজ মা দিবসে এই শহীদ জননীর কথাই মনে পড়ে বার বার। আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলার মানুষের হৃদয়ে।

 

শাহানা হুদা, উন্নয়ন কর্মী
১১ মে, ২০১৯

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন