বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৩ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

অখাদ্য

মে ১৩, ২০১৯ | ২:৫০ অপরাহ্ণ

পরীক্ষায় নিম্নমানের বলে প্রমাণিত ৫২টি খাদ্য পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে এসব খাদ্য পণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বাজার থেকে এসব পণ্য সরিয়ে ধ্বংস করা এবং মানের পরীক্ষায় কৃতকার্য না হওয়া পর্যন্ত তার উৎপাদন বন্ধ রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই রায় আসে। মাত্র কয়দিন আগেই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতকে জানিয়েছে বাজারের তরল দুধের ৯৬টির নমুনা পরীক্ষা করে ৯৩টিতে সীসাসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আরেকজন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি তালিকা দিয়ে বলেছেন, রাজধানীর ১৬টি এলাকার পানি পান ও ব্যবহারের অনুপযোগী।

এই ৫২টি খাদ্যপণ্য ও দুধ যারা বাজারজাত করে, তাদের মধ্যে বহু নামী দামী কোম্পানিও রয়েছে। ভাবনার বিষয় সেখানেই। কোথায় নেই ভেজাল? ভেজালের মানদন্ডে নামী রেস্তোরাঁ আর রাস্তার হোটেল সব এক। মিষ্টির দোকানে ভেজাল, ফলে বিষ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলে আসছি। কিন্তু এখন বোধ করি আমাদের ভাবতে হবে খাদ্য অনিরাপত্তা নিয়ে।

দেশের সব নাগরিক যাতে যথেষ্ট খাবার পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধ পরিকর। আর সে লক্ষ্যে কত আইন হল, কত দফতর খোলা হল। কিন্তু শেষ পরিণতি হল এই যে, আমাদের বাজারের কোন খাবারই আসলে নিরাপদ নয়। আমাদের খাদ্যনীতি বলতে সারাজীবন বুঝেছি, গরিবের জন্য সুলভ মূল্যে ভাত রুটির ব্যবস্থা করা। সেই পাকিস্তান আমল থেকে, কখনো রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে, কখনো খোলা বাজারে সরকারি উদ্যোগে পণ্য বিক্রি করে বাজার দরের চেয়ে কম দামে খাদ্যশস্য বিতরণের ব্যবস্থা করে অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে সরকার। এদেশে অপুষ্টি তীব্র এবং ব্যাপক, তাই দেশ জুড়ে এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি আরও নানা উপায় খুঁজেছে সরকার এবং এখনও খুঁজে চলেছে। আজ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন করেনি।

কিন্তু এখন অবস্থাটা এমন যে, মানুষ খাবার খেতেই ভয় পাচ্ছে। ভেজাল খাবারের রমরমায় আজ জনজীবন বিপন্ন। সরকার উন্নয়ন প্রচেষ্টা বলতে গেলে ভেস্তে যেতে বসেছে এই বিষাক্ত খাবারের মহোৎসবে।

বিজ্ঞাপন

খাদ্যে ভেজাল নিবারণের কোন সহজ উপায় নাই। কিন্তু এটি কঠিনও নয়। আইন আছে, দফতর আছে, নেই প্রয়োগ আর যারা প্রয়োগ করবেন তাদের নেই সততা। যে কোন খাদ্যবস্তুর উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণ কী ভাবে হয়, তা কোন গোপন তথ্য নয়। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সেসব জানেন। রাস্তায় বিক্রীত খাদ্যের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের বিধিভঙ্গ খোলাখুলি হচ্ছে। জনসচেতনতা একটি বড় বিষয় এখানে। শস্য এবং সবজির ক্ষেত্রে সার, কীটনাশক, ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত রাসায়নিকের অপপ্রয়োগ কিভাবে হচ্ছে তার জন্য আছে অধিদপ্তর। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করলে শুধু জনসচেতনার ওপর ভরসা করে অখাদ্যকে বাজার থেকে দূর করা যাবেনা।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে এ আইনে। ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও ভেজাল দানকারী চক্রকে দমন করা যাচ্ছে না। রমজান মাস এলে ভেজাল বিরোধী অভিযান শুরু হয়। আমরা নানা রকম সংবাদ পাই। কিন্তু সারা বছরের কাজ এটি কেন নয়, এই প্রশ্নের উত্তর দিবে কে? এ ক্ষেত্রে আইনের কার্যকর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ভেজালবিরোধী অভিযান সারা বছর চালু রাখতে হবে। এ ব্যাপারে প্রভাবশালী কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। এই অভিযানের পাশাপাশি ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজটিও করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে এ ক্ষেত্রে সুফল মিলতে পারে।

এদেশের সাধারণ মানুষ খাবারের জন্য খরচ করে পারিবারিক আয়ের ৫০ শতাংশ। সেই খাবারও আসলে খাবার না হয়ে যদি হয় বিষ, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তার এতসব আয়োজন কী জন্য? খাদ্য নিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ পুষ্টির নিরাপত্তা। যথেষ্ট পুষ্টির ব্যবস্থা না হলে খাদ্যের নিরাপত্তা অর্থহীন। ভেজাল আর বিষযুক্ত খাবার বাজারে ছেড়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মানুষের প্রাণনাশের প্রচেষ্টায় লিপ্ত।

রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। নিরাপদ খাদ্য নাগরিকের অধিকার এবং মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্যের আয়োজন করতে সরকার বাধ্য। হাইকোর্ট ৫২টি ভেজাল পণ্যের তালিকা পেয়ে আঁতকে উঠেছেন। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আদালত। এজন্য প্রয়োজনে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতেও বলা হয়েছে। আদালতের মনোভাব স্পষ্ট। ভেজাল খাবার খেয়ে বিপুল জনগোষ্ঠী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার আবকাশ নেই।

দারিদ্র্য ও রাজনীতির দুষ্টচক্রের মতো খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলেন, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা থাকতে হবে। নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করলে কোনো ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল দিতে পারেন না। এটি একটি কথা কথা। খাদ্যে ভেজাল মেশানো মানবতাবিরোধী অপরাধ। একশ্রেণির ব্যবসায়ী, সেই কাজটা করেই যাবে। কাজটা করতে হবে সরকারকেই। রাজনৈতিক সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার যদি থাকে, তবে দু’একজন বড় ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে এমন শাস্তি দেয়া হোক, যেন বাকীরা ভয়ে থাকে সবসময়।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, এডিটর ইন চিফ সারাবাংলা ও জিটিভি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন