রবিবার ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ১০ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তাহীনতায় চিকিৎসকরা, নেই সুরক্ষা আইন

মে ১৫, ২০১৯ | ৩:২৩ অপরাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে কর্মরত চিকিৎসকরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন-হুমকির শিকার হচ্ছেন হরহামেশায়। চিকিৎসকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা তারা প্রায়শই হুমকি-ধামকি বা নির্যাতনের শিকার। অথচ এসব ঘটনার বিচার পাচ্ছেন না তারা। এমনকি দীর্ঘদিনের দাবির মুখেও ঝুলে আছে ‘স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা আইন’।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মরত একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে কথা হয় সারাবাংলার এ প্রতিবেদকের। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় প্রভাবশালীরাই নানা সময়ে চিকিৎসকদের হুমকি দেন বা নির্যাতন করেন। নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাচ্ছে রোগীর স্বজনরাও। এসব চিকিৎসকরা  বলছেন এখনই যদি এর সমাধান না হয় এর প্রভাব গিয়ে পড়বে সামগ্রিক স্বাস্থ্য সেবায়। এতে ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ- যা কীনা একটি দেশের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার বাইরের একাধিক চিকিৎসক জানান, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে কর্মীরাই হাসপাতালগুলোতে নানা অরাজকতা তৈরি করে থাকেন। তাদের ভয়েই থাকতে হয় ঢাকার বাইরে জেলা উপজেলায় কর্মরত চিকিৎসকদের।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘চিকিৎসকরা রোগীর জীবন-মৃত্যু নিয়ে কাজ করেন। এখন তারাই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তাহলে বাধাগ্রস্ত হবে স্বাস্থ্যসেবা।

বিজ্ঞাপন

ডা. একেএম নাসিরুদ্দিন আরও বলেন, ‘এগুলোর বিচার যদি না হয় তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে। আর আমাদের জন্য সে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে।

চিকিৎসকদের এমন নিরাপত্তাহীনতা সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যই একটি বড় হুমকি বলে মনে করেন রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ছাড়া সেবামূলক কাজ করা সম্ভব হয় না। সেবাদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে একটি আন্তরিক নির্ভার সম্পর্ক থাকা খু্বই গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন তিনি।

চিকিৎসকদের অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় মন্তব্য করে ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল বলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা সেই ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। এক্ষেত্রে তারা রোগীকে রেফার করে দেবেন অন্য কোন হাসপাতালে। এতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ রোগীরাই।

এদিকে, চিকিৎসকদের গ্রামে না যাওয়ার পিছনেও এই নিরাপত্তাহীনতা একটি প্রধান কারণ বলে মন্তব্য করেন ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল। সারাবাংলাকে বলেন, অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার কারণেই মুলত গ্রামবিমুখ হচ্ছি আমরা। অনেকে সরকারি চাকরিতে আগ্রহ পাচ্ছেন না। এমনকি নিরাপত্তাহীনতার অনেক খবরে শঙ্কিত চিকিৎসকরা দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে চিকিৎসা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাপসাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, যে কোন পেশাজীবনে পেশাজীবির নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা জরুরি। বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে – এটা করা না হলে আক্রান্ত পেশা ও পেশাজীবি বিপন্ন হয়। আর বিপন্ন কারুর পক্ষেই স্বাভাবিক থাকা এবং স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন অসম্ভব।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফ মোর্শেদ খান সারাবাংলাকে বলেন, চিকিৎসক ও রোগী সুরক্ষা আইনটি হবে- কত বছর ধরে শুনে আসছি। কিন্তু আসল কাজটা এখনও হয়নি। চিকিৎসক এবং রোগী দুই পক্ষকেই সুরক্ষা পেতে হবে।তাই এই আইন হওয়া খুব জরুরি। আর এটা কেবল কাগজে কলমে থাকলেই চলবে না, দ্রুত সময়ের মধ্যে এর বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরিফ মোর্শেদ খান সারাবাংলাকে বলেন, আমেরিকাতে ৪৭ শতাংশ সাডেন কার্ডিয়াক অ্যাটাকে মারা যায়। সেসব রোগীরা হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে এমন গুরুতর রোগীদের সাধারণত উপজেলা থেকে রেফার করে অন্য বড় হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই রোগী যদি পথেই মারা যান তখন এমনও হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে স্বজনরা বাড়ি না গিয়ে ফেরত এসেছে হাসপাতালে। আর এসে মারামারিই, ভাঙচুর শুরু করে দেয়। কারণ তারা মনে করে, চিকিৎসরে অবহেলাতেই মৃত্যু হয়েছে বা তাকে চিকিৎসা না দিয়েই ফেরত দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে চিকিৎসক নেতা অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান সারাবাংলাকে বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসকদের হামলা অবশ্যই হুমকিস্বরূপ। একের পর এক হামলার জন্য দায়ী বিভিন্ন গোষ্ঠী। এখানে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়াতে যারা থাকে তারাই প্রধাণত হামলা করে বলেন তিনি।

অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, কোথাও কোনও সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদের হামলা করেছে বলে আমার জানা নাই। যারাই হামলা করে তারাই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়াতে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসীরা। চিকিৎসকদের ওপর যে হামলাগুলো হচ্ছে তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ রোগীরা।

আমি মনে করি, চিকিৎসকদের ওপর যে হুমকি হামলা হচ্ছে, সেটা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বা চিকিৎসা সেবার ওপর হামলা করছেন তারা, যোগ করেন এই অধ্যাপক।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাকিয়া সুলতানা জানান, কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে মন্ত্রী পরিষদ খসড়া আইনটি ফেরত পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। সেগুলোও সংযোজন করা হয়েছে ইতোমধ্যে ফাইনাল করার জন্য। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শেষে খুব শিগগিরই হয়তো আইন আকারে পাস হবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও রোগী সুরক্ষা আইন, বলেন জাকিয়া সুলতানা।

গত ৯ মে সিলেটের উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি সারোয়ার হোসেন চৌধুরী কর্তব্যরত এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কম্প্লেক্সে চিকিৎসক আবু সাহাদাৎ মাহফুজকে ফোনে হুমকি দেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সাব ইন্সপেক্টর। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হয় রোগীর স্বজনরা। সেখানে দুই আনসার সদস্যসহ আহত হন চিকিৎসক শামীমুর রহমান।

সারাবাংলা/জেএ/জেডএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন