বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৩ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

বিএসএমএমইউ’র নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

মে ১৬, ২০১৯ | ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মেডিকেল অফিসার নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে গত ১২ মে থেকে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন পরীক্ষার ফলাফলের তালিকা থেকে বাদ পড়া চাকরিপ্রত্যাশীরা।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ—এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি হয়েছে, বয়স না থাকা প্রার্থীরা চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই ফলাফলের তালিকা মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। এছাড়া নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. ইফতেখার আলমের মেয়ের জামাই এ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তিনি প্রাথমিক তালিকায় ২৪তম স্থান অধিকার করেছেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, আগের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল ও ফের পরীক্ষা নিতে হবে। এছাড়া ব্যর্থতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়ার পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।

জানা যায়, ২০০টি মেডিকেল অফিসারের পদে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় বিএসএমএইউ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১৮০ জন এমবিবিএস ও  ২০ জন বিডিএস চিকিৎসক চাওয়া হয়। প্রথম দফায় নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলেও সেটি পিছিয়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষার দিন ঠিক করা হয়। পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রশ্নপত্রও ছাপানো হয়। কিন্তু অনিবার্য কারণ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হওয়ার দেড় বছর পর গত ২২ মার্চ সেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

নিয়োগ পরীক্ষায় দুইশ জনবলের বিপরীতে অংশ নেন আট হাজার ৫৫১ জন চিকিৎসক। একটি পদের বিপরীতে অংশ নেন ৪৩ জন। এই নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় ১২ মে। এতে প্রাথমিকভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭২৯ জন। এই তালিকায় যাদের নাম আসেনি তারা আন্দোলন শুরু করেছেন।

চাকরি প্রত্যাশী এক চিকিৎসক বলেন, ২২ মার্চ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও প্রশ্নপত্রে আগের তারিখ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর লেখা ছিল। ছয় মাস আগে করা প্রশ্নপত্রে আমাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই প্রশ্নপত্রে যে কারচুপি হয়নি সে গ্যারান্টি কে দেবে? প্রশ্ন রেখে এই চিকিৎসক জানান, এ পরীক্ষাতে অংশ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কনক কান্তি বড়ুয়ার ছেলে সুদীপ বড়ুয়া, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মেয়ে জামাই, ভিসির পিএস টু-এর স্ত্রী।

ওই চাকরি প্রার্থী অভিযোগ করেন, পরীক্ষা শুরুর দুই দিন আগে একটি বিশেষ কক্ষে প্রশ্নপত্র খোলা হয়েছিল। বিষয়টির তদন্ত চেয়ে আমরা আবেদনও করেছিলাম। কিন্তু ওই বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। এমনকি সেই প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

ওই প্রার্থী আরও অভিযোগ করেন, নিয়ম না থাকলেও ওইদিন পরীক্ষার কেন্দ্রে অনেকেই মোবাইল ফোন নিয়ে আসেন।

চাকরি প্রত্যাশীদের অভিযোগ, নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের যে তালিকা করা হয়েছে তাতে অনিয়ম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের স্বজনদের নিয়োগ দিতে ফলাফল তাদের ইচ্ছামতো সাজানো হয়েছে। এছাড়া যাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বয়স নেই এরকম অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।

চাকরি প্রত্যাশীদের অভিযোগ— যাদের লিখিত পরীক্ষা ভালো হয়েছে তারাও বাদ পড়েছেন। কারচুপি করে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কোনও স্বজন আত্মীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী হতে পারবে না। কিন্তু তার মেয়ের জামাই পরীক্ষায় ২৪তম হয়েছে-এর চেয়ে বড় অনিয়ম, দুর্নীতি আর কী হতে পারে, পাস করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ছেলে সুদীপ বড়ুয়া।

তাদের আরও অভিযোগ—পরীক্ষা হলে ডেন্টাল এর অনেক শিক্ষার্থীকে এমবিবিএস এর প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা হলে মৌখিকভাবে এবং পরে লিখিত অভিযোগ করা হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা ৩২ বছর থাকলেও এর চেয়ে বেশি বয়সের অনেকেই অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজর ৩৭ বছর বয়সী একজনের জন্য লিখিত অভিযোগ করা হলেও সে অভিযোগেরও কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। তাদের কেউ কেউ লিখিত পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণও হয়েছেন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মেয়ে জামাইয়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘তাহলে কি তাকে (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেব? আন্দোলনকারীরা এগুলো কী বলে? দেখতে হবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল কি না, প্রশ্নপত্র মডারেশনের সময় তিনি ছিলেন কি না এসব দেখতে হবে। যাদের স্বজনরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি তাদেরকেই নিয়োগ পরীক্ষায় রাখা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ভিসি ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘পরীক্ষা হয়েছে ২২ মার্চ। তারা বলছে, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কিন্তু তখন তো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

আন্দোলনকারীরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েও দেখা করতে পারেনি জানালে ভিসি বলেন, ‘তাদের জন্য কি আমি বসে থাকবো?’ বলে পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি।

পরীক্ষার ফলাফল ওয়েবসাইটে দেওয়ার আগেই তা মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে উল্লেখ করলে ভিসি বলেন, ‘ভেরিফিকেশনের জন্য দেওয়া হয়েছিল সেটা সিকিউরিটির কারণে। কিন্তু সেটা তো ফলাফল প্রকাশের পর।’

‘মৌখিক পরীক্ষায় যারা পাস করে তাদের বিষয়ে ভেরিফিকেশন দরকার হয়’ মন্তব্য করলে তিনি বলেন, ‘যাই হোক-আমার কাছে যেভাবে নির্দেশনা এসেছে সেভাবে দেওয়া হয়েছে। তার কোনো পরিবর্তন হয়নি, কিছু হয়নি।’

বারবার নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার জন্য ভেন্যু পাওয়া যায়নি বলে তারিখ পরিবর্তন করতে হয়েছে।’

সারাবাংলা/জেএ/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন