বুধবার ২২ মে, ২০১৯ ইং , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মারতে গিয়েছিল ইয়াবা বিক্রেতাকে, মেরে আসে রিকশাচালককে

মে ১৬, ২০১৯ | ৭:৪১ অপরাহ্ণ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ইয়াবা বিক্রেতা মফিজকে খুন করতে গিয়ে তার বদলে অন্ধকারে মফিজের বাসায় থাকা নিরীহ রিকশা চালক রাজুকে হত্যা করে কয়েকজন তরুণ। আর জেলখানায় বসে মফিজকে হত্যার নির্দেশ দেয় চট্টগ্রাম নগরীর পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘ইয়াবা গডফাদার’ খ্যাত ছাগীর হোসেন।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, এর আগে গত এপ্রিল মাসে ছাগীরকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারের বিষয়ে ছাগীর ও তার পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ ছিল ইয়াবা বিক্রেতা মফিজ পুলিশকে তথ্য দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। এই সন্দেহ থেকে ছাগীর জেলখানায় বসে মফিজকে খুনের নির্দেশ দেয়। আর এই কিলিং মিশনের জন্য ছাগীরের স্ত্রী ও ছেলে যাদের ব্যবহার করেন তারা সবাই বয়সে তরুণ।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত ১৪ মে ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার হাজীপাড়া এলাকায় আল আমিন হোটেলের গলিতে নিজ বাসায় খুন হয় মো. রাজু। প্রায় সূত্রবিহীন এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে ডবলমুরিং থানা পুলিশ ছাগীরের স্ত্রী ও ছেলেসহ আটজনকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনের নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন করেছে।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম সারাবাংলাকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের প্রায় সবাই কিশোর বয়সটা পার করেছে। তারাও ইয়াবা বিক্রি এবং সেবনে জড়িত। নগরীতে পাড়ায়-পাড়ায় একটা কিশোর গ্যাং কালচার তৈরি হয়েছে, এরাও একই ধরনের গ্যাং। হত্যাকাণ্ড কিংবা এর পরবর্তীতে তারা কি ধরনের আইনি ঝামেলায় পড়তে পারে, সেই বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তারাই একজন মাদক বিক্রেতাকে খুন করতে গিয়ে নিরীহ আরেকজনকে খুন করেছে।’

গ্রেফতার আট জনের মধ্যে আছে ছাগীরের স্ত্রী সেলিনা আক্তার সেলি (৩০) ও ছেলে ওসমান হায়দার কিরণ (১৮) এছাড়া কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া শিমুল দাশ (২০), তানভির হোসেন সিফাত (১৮), মো. সুজন (১৮), রাকিব হোসেন (১৮), মো. নুর নবী (১৮) ও মেহেদী হাসান রুবেল (১৮)।

হত্যা পরিকল্পনার বিষয়ে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ সারাবাংলাকে জানান, গত ২৭ এপ্রিল বিকেলে অস্ত্র ও মাদক আইনের সাত মামলার আসামি ছাগীরকে নগরীর উত্তর আগ্রাবাদ হাজীপাড়া থেকে ৫১০ পিস ইয়াবা এবং একটি দেশিয় তৈরি দোনলা বন্দুক ও দুটি কার্তুজসহ গ্রেফতার করা হয়। ইয়াবা বিক্রিতে ছাগীরের ‘ডানহাত’ ছিল মফিজ। মফিজের নেতৃত্বে গ্রেফতার হওয়া ছয়জনসহ আরও কয়েকজন ছাগীরের ইয়াবা বিক্রি করতো।

শুরু থেকেই ছাগীর তাকে ধরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে মফিজকে সন্দেহ করে। গ্রেফতারের আনুমানিক পাঁচদিন পর ছাগীর জেলখানায় শিমুল, সিফাত, রাকিব ও পলাতক থাকা শুক্কুরকে ডেকে নেয়। সেখানে মফিজকে হত্যার নির্দেশ দেয় ছাগীর। এরপর আরও দুবার তারা জেলখানায় গিয়ে ছাগীরের সঙ্গে দেখা করে হত্যার পরিকল্পনা করে। গত ১৩ মে তারা ছাগীরের স্ত্রী সেলিকে নিয়ে কারাগারে যায়। ছাগীরের নির্দেশে মফিজকে মারার জন্য শুক্কুরকে এক হাজার টাকা দেয় সেলি। ছাগীরের ছেলে কিরণ শুক্কুরকে একটি কিরিচ দেয়। এরপর আগ্রাবাদ হাড্ডি কোম্পানির মোড়ে গ্রেফতার হওয়া রুবেলের চায়ের দোকানে বসে কিরণসহ অন্যরা মিলে হত্যার পরিকল্পনা করে। কিরণ রাকিবকে একটি চাইনিজ কুড়াল এবং সিফাতকে একটি ছোরা দেয় বলে জানান ওসি।

ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার দিন (১৪ মে) ফজরের নামাজের পর খুনের মিশন নিয়ে মফিজের বাসায় যায় শিমুল, শুক্কুর, রাকিব, সিফাত ও সুজন। নুর নবী ও রুবেল বাইরে পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু ভুল করে তারা একই কলোনিতে মফিজের বাসার পাশে রাজুর বাসায় ঢুকে যায়। সেখানে অন্ধকারে রাজুকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় কক্ষে ফেলে চলে যায়। এসময় রাজুর চিৎকারে মফিজ ঘর থেকে বের হতে চাইলেও দরোজা বাইরে থেকে আটকানো থাকায় বের হতে পারেনি।’

আহত রাজুকে ১৪ মে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তৈয়ব নামে এক রিকশাচালক। সকাল সোয়া ৭টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজুর মৃত্যু হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক (এস আই) অর্ণব বড়ুয়া সারাবাংলাকে জানান, গ্রেফতার আটজনকে বৃহস্পতিবার (১৬ মে) বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। শিমুল, সিফাত, সুজন ও রাকিব চারটি পৃথক মহানগর হাকিম আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি চার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। রিমান্ড শুনানি আগামী সপ্তাহে হবে।’

সারাবাংলা/আরডি/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন