শুক্রবার ২৪ মে, ২০১৯ ইং , ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন- বাংলাদেশের নতুন শুরু!

মে ১৭, ২০১৯ | ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

রহমান রা'আদ

যে দেশের স্বাধীনতার জন্য আপনার বাবা-মা তাদের জীবনটা বিলিয়ে দিলেন, সেই দেশের মানুষগুলো যদি আপনার বাবার বুকে ২৮টা বুলেট উপহার দেয়, আপনার পুরো ফ্যামিলির উপর ভয়ংকরতম নিষ্ঠুরতায় নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়, আপনি এবং আপনার ছোট বোন সৌভাগ্যক্রমে বিদেশে থাকায় বেঁচে যান এবং আপনাদের মেরে ফেলার জন্য প্রতি মুহুর্তেই সুযোগ খুঁজতে থাকে ঘাতকেরা এবং এতে যদি সেই দেশের মানুষের কোনকিছু আসে যায় না, এমন একটা নির্লিপ্ত আচরণ দেখেন, আপনি কি আপনার আপনজনের হত্যাকারী বেইমান আর মুনাফেকে ভরা সেই দেশে জেনেশুনে আত্মহত্যা করতে ফিরবেন?

কেন এই দেশে ফিরেছিলেন তিনি? কী দরকার ছিল তার ফেরার? একদম সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে দেখলেও কি খুঁজে পাবো এই দেশ তাঁকে কি দিয়েছে? নিতান্তই সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া সেই মেয়েটিই এরপর দেশে ফিরে যখন দলের হাল ধরলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন, তখন শুরু হলো তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা! একে একে ১৯ বার হামলা হলো তার ওপর। প্রতিবারই বুলেট-বোমা-গ্রেনেডের সামনে বিশাল মানবপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করলো তার লক্ষ ভাইয়েরা। একটা সময় দেশ পরিচালনার ভার হাতে আসার পর প্রথমেই যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার করলেন, এরপর সীমিত সুযোগ আর অজস্র প্রতিকূলতার ভেতরেও দেশকে এনে দিতে শুরু করলেন একে একে সাফল্য আর গর্বের উপলক্ষ। তবুও আজো তাকে হত্যা করতে খুঁজে বেড়ায় সেই পরাজিত বেইমান আর মুনাফেকের দল! কেন এই দেশকে ভালোবাসবেন শেখ হাসিনা? যুক্তিটা কোথায়?

যুক্তিটা সম্ভবত মিশে আছে মানুষটার রক্তে। তার বাবা ছিলেন এমন। নিঃশর্তে কোন প্রতিদানের আশা না রেখেই সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন এই জাতির জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। জীবনের ১২-১৩ বছর জেলেই কেটে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তার কারণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘My strength is I love my people, my weakness is I love them too much’.

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনাও বাবার মত দেশের মানুষের টান, তাদের প্রতি একপ্রকার দায়বদ্ধতার টান থেকে কখনোই বের হতে পারেননি। আর তাই সেই রক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষটা ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ই মে!

অথচ তার আগের ছয়টা বছর কি ভয়ংকর দুঃসহ যন্ত্রনায় কেটেছে শেখ হাসিনা আর তার ছোট বোন শেখ রেহানার, কল্পনা করতেও ভয় লাগবে আজ আমাদের! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ পরিবারের যাবার কথা ছিল প্যারিসে। ভোর ৬টার দিকে হঠাৎ জার্মানির বনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ফোন করে জানালেন, বাংলাদেশে একটি মিলিটারি ক্যু হয়েছে, কোনভাবেই প্যারিসের দিকে না গিয়ে তারা যেন তখনি জার্মানী চলে আসেন। এই খবরটা পাওয়া মাত্র বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক ওয়াজেদ পরিবার ও শেখ রেহানাকে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। বেলজিয়ামে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কোন ধরণের সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি জার্মানী যাবার জন্য একটা গাড়িরও ব্যবস্থা করে দেয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে তারা যখন জার্মানীতে হুমায়ূন রশীদ সাহেবের কাছে পৌঁছলেন, তখন নিরাপদ জায়গায় না পৌছানো পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে কিছু জানানো হবে না এই মর্মে ড. ওয়াজেদ নিশ্চয়তা দিলে হুমায়ূন রশীদ তাকে জানান, বিবিসির এক ভাষ্যানুসারে বেগম মুজিব ও রাসেল ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, আর ব্রিটিশ মিশন প্রচার করেছে যে কেউই বেঁচে নেই।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তারা যদি পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ থাকে, সেটি ভারত। তিনি পশ্চিম জার্মানীতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মি. ওয়াই কে পুরীর সাথে দেখা করলেন। মি. পুরী জানালেন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার প্রক্রিয়াটি খুবই দীর্ঘ এবং জটিল। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পছন্দের দুইজন পরামর্শদাতা ডি পি ধর এবং পি এন হাক্সর এর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে। দুর্ভাগ্যবশত দুজনই তখন ভারতের বাইরে অবস্থান করছিলেন। জনাব চৌধুরী খুবই দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করতে লাগলেন। কারণ, একমাত্র সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করা ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিলো না।

ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, আর তিনি বাংলাদেশের একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূত। তাছাড়াও, ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছিল। মি. পুরীর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে তিনি একদিন ফোন করলেন ইন্দিরা গান্ধীকে, শেষ চেষ্টা হিসেবে। সৌভাগ্যই বলতে হবে, ফোন অপারেটর না, বরং ইন্দিরা গান্ধী নিজেই সেদিন ফোনটি রিসিভ করেছিলেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পুরো ঘটনা খুলে বলা মাত্র ইন্দিরা গান্ধী এক বিন্দু সময় নষ্ট না করে শেখ মুজিবের দুই কন্যা ও তার পরিবারকে যতো দ্রুত সম্ভব ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সময় নষ্ট না করে ওয়াজেদ মিয়াকে ভারতীয় দূতাবাসে নিয়ে যান। ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তখন তেমন কোন টাকা পয়সা ছিলো না। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ থেকে মাত্র ২৫ ডলার সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তাদেরকে হাজার খানেক জার্মান মুদ্রা সাথে দিয়ে দেন। ২৪ আগস্ট সকাল ৯ টায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দূতাবাসের কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদেরকে ফ্র্যাংকফুর্ট বিমানবন্দর নিয়ে যান। এরপর, একটি এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে করে তারা সকাল সাড়ে ৮টায় দিল্লীর পালাম বিমানবন্দর পৌঁছান। শুরু হয় শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবন।

ভারতে আসার পরে বোন আর স্বামী-সন্তান সহ শেখ হাসিনাকে লাজপাত নগরের ৫৬ রিং রোডে একটি ছোট বাসায় থাকতে দেয়া হয়েছিলো সেফ হোম হিসেবে। ১০দিন পর্যন্ত শেখ হাসিনার মনে ক্ষীণ আশা ছিলো, হয়তো মা আর রাসেলকে ওরা মারেনি। কিন্তু ৪ঠা সেপ্টেম্বর সফদরজং রোডে ইন্দিরা গান্ধীর বাসবভনে রাত ৮টার দিকে পৌঁছানোর পর সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর মিনিট দশেক পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসে হাসিনার পাশে বসেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত কি না। হাসিনা শূন্য  চোখে তাকিয়ে থাকে। ড. ওয়াজেদ বলেন, রয়টার্স আর ব্রিটিশ মিশন কর্তৃক প্রচারিত দুইটি ভাষ্য ছাড়া তারা তেমন কিছু জানেন না। ইন্দিরা গান্দী তাঁর এক কর্মকর্তাকে জানান, উপস্থিত সকলকে সম্পুর্ণ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে। কর্মকর্তাটি পুরো ঘটনা বলবার মধ্যে বলে উঠলেন যে বেগম ফজিলাতুন্নেসা ও রাসেলও জীবিত নেই। হাসিনা আর সহ্য করতে পারেননি, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি, শেষ আশাটুকুও নিভে যায় তার। ভগ্ন হৃদয়ে ইন্দিরা গান্ধী তাকে জড়িয়ে ধরেন। তাকে বলেন, ‘তুমি যা হারিয়েছো, তা কোনভাবেই পূরণ করা যাবে না। তোমার দু’টি  শিশু সন্তান আছে। এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার আব্বা, তোমার মেয়েকেই তোমার আম্মা হিসেবে ভাবতে হবে। তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। তোমার ছোট বোন, ছেলেমেয়েকে মানুষ করার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। এখন তোমার কোন অবস্থাতেই ভেঙ্গে পড়লে চলবে না।’

শেখ হাসিনা যখন ভারতে এসে পৌঁছান, ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। শেখ হাসিনার বাড়ির বাইরে সব সময় দুইজন বডি গার্ড থাকেন, একজন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিয়ে আসা সত্য ঘোষ, আরেকজন পি. কে. সেন। এই দুইজন অফিসার ছায়ার মতো শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকতেন। এছাড়াও, শেখ হাসিনার একজন এসিসট্যান্ট ছিলেন, যার নাম এ. এল. খতিব। এ. এল. খতিবের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি একটি বই লিখেছিলেন, ‘Who Killed Mujib?’ শিরোনামে, যেটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে অত্যন্ত মূল্যবান একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

শেখ রেহানার দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেবার কথা ছিলো, কিন্তু পারলেন না। তাকে ‘৭৬ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নৈনিতাল এর সেইন্ট জোসেফ স্কুল এ ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তামিল নাড়ুর কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সে পড়াশোনা করে। পরে ব্যাংগালোর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সাইন্সে পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে উচ্চতর পড়াশোনা করতে যান। স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ‘৭৫ এর ১ লা অক্টোবর পরমাণু শক্তি বিভাগে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়।

‘৭৬ এর ২৪ শে জুলাই, ছোটবোন শেখ রেহানার বিয়ে হয় পাত্র লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সাথে। কিন্তু সে বিয়েতে শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে অংশ নিতে পারেননি। ভারতে সে সময় শেখ হাসিনার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন সে সময়কার ডেপুটি মিনিস্টার মি. প্রণব মুখার্জি আর তার স্ত্রী শ্রীমতি শুভ্রা মুখার্জি। তারা শুধু দেখা সাক্ষাতই নয়, বরং হাসিনা পরিবারকে পিকনিকেও তাদের সাথে নিয়ে যেতেন। বলা যায়, পরিবারের বাইরে প্রণব-শুভ্রা পরিবারটি হয়েছিলো, হাসিনাদের সবচেয়ে আপনজন।

১৯৮০ সালে আবারও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরে আসেন, সে বছর শেখ হাসিনা সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে যান তার বোনের কাছে। ইতিহাসে ১৯৮০ সালটা খুব গুরুত্বপুর্ণ এই কারণে, কারণ এই বছরেই শেখ হাসিনা প্রথম জনসম্মুখে ভাষণ দেন। তারিখটা হলো ১৬ই আগস্ট, ১৯৮০। স্থান ইয়র্ক হল, লন্ডন। শেখ হাসিনার রাজনীতিতে সাহসিক আগমনের আগামবার্তা এই সময়টাকে বলাই যায়, কারণে যে সময়ে তিনি জনসম্মুখে ভাষণ দিয়েছেন, সে সময়ে লন্ডনের ব্রিকলেনে যুদ্ধাপরাধীরা ছুরি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো হাসিনাকে হত্যা করবার জন্য।

স্রেফ ভাবুন তো, পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও শেখ হাসিনার পিছু ছাড়েনি তারা। তিনি তখনও রাজনীতিতে আসেননি। স্রেফ একটা বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু ওরা ঠিকই তাকে খুঁজছে মেরে ফেলার জন্য। এমন ভয়ংকর দুঃসময়ে অন্য কোন রাজনৈতিক নেতা হলে কি করতেন জানি না, কিন্তু শেখ হাসিনা তখনো রাজনীতিতে না আসা সত্ত্বেও এক মুহুর্তের জন্যও পিছু হটলেন না ।১৯৮০ সালে, ভারতে শেখ হাসিনার বাড়িতে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা আসতে লাগলেন। তারা তাকে ক্রমাগত বোঝাতে লাগলেন, তার কেনো দেশে ফেরা উচিৎ এই মুহুর্তে, তাকে শক্ত হাতে দলের দায়িত্ব নিতে হবে। শেখ হাসিনা বলতেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় গৌরব। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারী, ঢাকায় আওয়ামীলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে আওয়ামীলীগ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তটি নেয়। সিদ্ধান্তটি ছিলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর সভাপতি নির্বাচন। সেদিন শেখ রেহানা লন্ডন থেকে ভারতে এসে শেখ হাসিনাকে খবরটি দেন। পরবর্তীতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৭ই মে, ১৯৮১। আওয়ামীলীগের দুই নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ আর কোরবান আলীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রওনা দেন ঢাকায়। দিনটি ছিলো রবিবার, বৃষ্টিস্নাত এক দিন। প্রায় পনের লক্ষ জনতা সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। দেশের মাটিতে নেমে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন শেখ হাসিনা। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘যেদিন আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম, সেদিন আমার সবাই ছিলো। আমার মা-বাবা, আমার ভাইয়েরা, ছোট্ট রাসেল সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিলো। আজকে আমি যখন ফিরে এসেছি, হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন, স্বাগত জানাতে এসেছেন, কিন্তু আমার সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চিরতরে চলে গেছেন।’

দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর মানুষটা দেশে ফিরেছিলেন, পরিবারের সবগুলো আপনজনকে হারানোর সময় দেশবাসীর নির্লিপ্ততার যে ব্যথা, তার উপর এই অজস্র মানুষের শুভেচ্ছায় একটু হলেও প্রলেপ পড়েছিল। কিন্তু এই ব্যথা যে কখনোই মুছতে দেওয়া হবে না, সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব ও রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের এই বাংলার মাটিতে পূনর্বাসনকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা সরাসরি গিয়েছিলেন তাদের বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ এ। কিন্তু হায়! প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সে বাড়িতে ঢুকতে বাঁধা দেয়। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে না ঢুকতে পারেন।

আপনার বাবা-মা, তিনটা ভাইসহ পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে, ছয় বছর আপনাকে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করেছে, শেষ পর্যন্ত আপনি যখন জেনারেল জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, খুনী ফারুক-রশিদদের মৃত্যু হুমকি উপেক্ষা করে দেশে ফিরলেন, তখন আপনাকে আপনার পরিবারের শহীদ স্বজনদের রক্তমাখা বাড়িটায় একবারও যেতে দেওয়া হয়নি! কতটা অবিচার আর অন্যায় করা হয়েছিল শেখ হাসিনার সাথে, ভাবতে পারেন? স্বজনহারা মানুষটার বুকফাটা আর্তনাদে সেদিন ৩২ নম্বরের সামনের রাস্তাতে বসেই সবার জন্য দোয়া করেছিলেন, আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছিলেন। এরপরেও শেখ হাসিনা ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, বাড়ির দরজার এসে বসে থাকতেন। তার নিজের বাবার বাড়ি তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। যে বঙ্গবন্ধু এই দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সারা বাংলার সাড়ে সাত কোটি সন্তানের জন্য সবসময় খোলা থাকতো, সেই ৩২ নম্বরের বাড়ি তার সন্তানের জন্য নিষিদ্ধ ছিল! একটা বিশাল সময় ধরে…

এরপরের গল্পটা স্মৃতিচারণের! প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়ালের লেখনীতে উঠে এসেছে ১৯৮১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনার এক বিস্ময়কর যাত্রাঃ

“সেদিনের সেই ১৭ই মে, শেখ হাসিনার আরেকটি নতুন জীবনের শুরু। ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর যেসব শ্লোগান শুনেছিলেন, তার একটি ছিলো ‘হাসিনা তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’। শ্লোগানকে শ্লোগান হিসেবেই নেয় সবাই। সেটাই নিয়ম। নেতানেত্রীরাও তাই নেন। কারণ রাজনৈতিক শ্লোগানে ছেলেও বাবাকে ভাই ডাকে। কিন্তু তার ৭ বছর পর শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই বিস্ময়ভরে আবিষ্কার করেছিলেন, কথাগুলো নেহাতই কথার কথা ছিলো না।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। লালদিঘির ময়দানে সেদিন আওয়ামী লীগের জনসভা ছিলো। শেখ হাসিনার ওপর সেদিন নির্বিচার গুলি ছুড়েছিলো এরশাদ সরকারের পুলিশ ও সাদা পোষাকধারীরা। কিন্তু গুলি তাকে ছোঁয়নি। দেয়ালে বিধেছে। মানুষের সে দেয়াল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। হাসিনার ভাইদের দেয়াল। মাথায় গুলি খেয়ে সীতাকুন্ড কলেজের জিএস যখন উল্টে পড়েছেন, তার জায়গা নিয়েছেন একজন শ্রমিক নেতা। রক্তাক্ত সে দেয়ালের নিরেট দূর্ভেদ্যতা অটুট ছিলো। একটা ইট খসে গেলে সেখানে বসেছে আরেকটি ইট। শেখ হাসিনা নিরাপদ ছিলেন। সেদিন আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল ছিলো রণক্ষেত্র- জান দেবো, লাশ দেবো না। রাত বারোটা পর্যন্ত চলেছে থ্রি নট থ্রি আর এসএলআরের বিরুদ্ধে ইট পাটকেলের লড়াই।

১৬ বছর পর, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আবার ভাইদের কাছে ঋণী হয়েছেন হাসিনা। এদিনকার হামলা আরো ভয়ানক ছিলো। গুলির পাশাপাশি ছিলো আর্জেস গ্রেনেড। তুমুল বিস্ফোরণেও হাসিনার ভাইয়েরা ভুলে যায়নি তাদের প্রতিজ্ঞা। শরীরে অজস্র স্প্লিন্টার আর বুলেটের গর্ত নিয়েও দাঁড়িয়ে গেছে মানব দেওয়াল। মৃত্যু দিয়ে বোনের নিশ্চিত মৃত্যুকে ফিরিয়েছেন তারা।

স্বীকৃতির পরোয়া করে না এসব মৃত্যু। আত্মাহুতির বিনিময়ে প্রতিদান চায় না। আক্রমণ থেমে থাকবে না। আরো হবে। হুমকি আসে জনসভা থেকে। জাতির জনকের মৃত্যুদিনে বিশাল কেক কেটে আনন্দ উদযাপনকারীরা হুমকি দেয় আবারও। শেখ পরিবারকে নির্বংশ করার সেই মিশন থেকে তারা সরবে না। বোকা এই খুনীগুলো, তাদের মুখপাত্রগুলো ভুলে যায় সেই ভাইদের কথা। হাসিনার বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পর্যন্ত যাওয়ার আগে কতগুলো শরীর ভেদ করতে হবে তাদের ছোঁড়া গুলিকে। এত বুলেট কোথায় পাবি তোরা! তাদের পারুল বোনটির জন্য সাত ভাই চম্পারা যে শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ হয়ে যায়…”

তাই ১৭ই মে, ১৯৮১ ছিল এই জাতির জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, সেইদিন যদি শেখ হাসিনা এই বাংলাদেশে ফিরে না আসতেন, তাহলে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম ইত্যাদি আজ থাকতো রাষ্ট্রক্ষমতায়, বহু আগেই অন্ধকারের একশো বছরে প্রবেশ করতাম আমরা, আজ পৃথিবীর ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে থাকতো বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর একাত্তর শব্দ দুটো পরিণত হতো রূপকথায়… তাই আজকের দিনটি নিয়ে যাদের সমস্যা, যারা মনে করেন যে কেন এই দিনটি নিয়ে এতো কথা বলতে হবে, কেন এই দিনটাকে এতো গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের কাছে প্রশ্ন- সেদিন শেখ হাসিনার জায়গায় আপনি থাকলে কি করতেন? নিজের পরিবারকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার ছয় বছর পর আপনি কি করতেন? সেদিন শেখ হাসিনা না ফিরলে আজ ধর্মান্ধ মৌলবাদী পাকিস্তানের চেয়েও নিকৃষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রের একটার নাগরিক হিসেবে আপনার অনুভূতি কি হতো?

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ

‘The time Delhi gave shelter to Sheikh Hasina’ by Vivek Shukla, DNA INDIA (April 7, 2017)

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’, ড. ওয়াজেদ মিয়া (১৯৯৩)

লেখক- কপি রাইটার ও অনলাইন একটিভিস্ট

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন