মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ২ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে…

মে ১৮, ২০১৯ | ৪:১৭ অপরাহ্ণ

অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের ক্রিকেট দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ স্তম্ভের ওপর। গত বিশ্বকাপের পর থেকেই বাংলাদেশের যে স্বপ্নযাত্রা, তার সারথী পঞ্চপান্ডব।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই পঞ্চপান্ডব মানে মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ। বাংলাদেশের জয় মানেই যেন মাশরাফির দারুণ স্পেল, সাকিবের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, তামিমের ফ্লাইং স্টার্ট। আর টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে মিডল অর্ডারে দুই ভায়রা মুশফিক-মাহমুদুল্লাহর দেয়াল হয়ে যাওয়া। নতুনদের কেউ কেউ ধুমকেতুর মত আসেন। কিন্তু তারা যেন রবি ঠাকুরের ছন্দ আওড়াতে আওড়াতে আসেন, ‘স্ফুলিঙ্গ তার পাথায় পেল ক্ষণকালের ছন্দ/উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল সেই তার আনন্দ।’ কিন্তু আমাদের ক্রিকেটানন্দ তো ক্ষণকালের নয়। সেই আনন্দকে স্থায়ী করার দায়িত্ব যেন সেই পঞ্চপান্ডবের। এই পঞ্চপান্ডবের আগে বাংলাদেশ মাঠে নামার আগেই হেরে বসতো। মাঝে মাঝে আশরাফুল দুয়েকটা জয় এনে দিয়ে আনন্দে ভাসাতেন বটে বাংলাদেশকে, তবে মাশরাফির অসাধারণ নেতৃত্বই বদলে দিয়েছে সেই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে।

আমরাও পারি, এই মনোবলে বাংলাদেশকে নিজেদের দিনে যে কাউকে হারানোর সামর্থ্য অর্জন করেছে। জয় এখন ডালভাত। তবু একটা আক্ষেপ রয়েই গিয়েছিল। ২৪টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতলেও, কোনো ত্রিদেশীয় বা টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতা হয়নি এর অগে। মাশরাফির মত একজন সর্বকালের সেরা একজন অধিনায়কের হাতে কোনো ট্রফি না থাকাটা বড্ড বেমানান হতো। তার হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিতে পারলে সেটাই মানানসই হতো। তার আগে মাশরাফির হাতে একটি ট্রফি তুলে দেয়ার শেষ সুযোগ ছিল শুক্রবার। আগে ৬ বারের চেষ্টায়ই ফাইনালের ফারাটা কাটাতে পারেনি বাংলাদেশ। কখনো শেষ বলে, কখনো শেষ ওভারে তীরে গিয়েও তরী ডুবেছে। শুক্রবার ছিল সে আফসোস ঘোচানোর দিন।

সেই ফাইনালের গল্পে পরে আসছি। পঞ্চপান্ডবের গল্প বলে নেই আরেকটু। বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার পর অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বাংলাদেশ অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের যেটুকু আশা সে ঐ অভিজ্ঞতাকে ঘিরেই। এই পাঁচজন যে অনেকদিন একসঙ্গে খেলছেন। তাদের রসায়নটাও চমৎকার। তাই একজনের ঘাটতি আরেকজন পুষিয়ে দেন। একজনের বিপদে আরেকজন কাঁধ পেতে দেন। আর মাশরাফি সবাইকে আগলে রাখেন পরম আস্থায়। কিন্তু এই পাঁচজনেরই বয়স হয়েছে। এবারের আয়ারল্যান্ড ট্যুর আর বিশ্বকাপ হলো পঞ্চপান্ডবের শেষের শুরু। ইতিমধ্যেই সাংসদ বনে যাওয়া মাশরাফি বিশ্বকাপের পর আর থাকছেন না, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। বাকিরা এখন না হলেও একে একে খেলা ছাড়বেন। এরপরের বিশ্বকাপে পঞ্চপান্ডবের বড় জোর দুজনকে পাওয়া যেতে পারে। তাই পঞ্চপান্ডবের ওপর নির্ভরতার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যত নিয়ে। আলোচনার চেয়ে আশঙ্কা বলাই ভালো। আমি খুব আশাবাদী মানুষ। তারপরও পাইপ লাইন নিয়ে, ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে আরো অনেকের মত আমারও শঙ্কা ছিল। শঙ্কার কারণ ছিল নতুনদের অধারাবাহিকতা। দুয়েকজন মাঝে মাঝে দারুণ কিছু করলেও যত তাড়াতাড়ি আসেন, হারান তারচেয়ে দ্রুত। গত বিশ্বকাপের আবিস্কার সৌম্য সরকার হারাতে বসেছিলেন আরেকটি বিশ্বকাপের আগেই। তার অন্তর্ভূক্তি নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। মুস্তাফিজের মত প্রতিভার ঝলকও যেন ফুরিয়ে যাচ্ছিল।

গত বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটা জাম্প, নিজেদের আরো এক ধাপ এগিয়ে নেয়া। এবারের বিশ্বকাপ কেমন হবে? গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলায়, এবারের প্রত্যাশার তার সেমিফাইনালে বাধা। তবে তার চেয়ে বড় আলোচনা, নতুনরা কি পারবেন, রিলে রেসের ব্যাটনটা ঠিকঠাক মত বুঝে নিতে?

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজটি তাই বিশ্বকাপের ওয়ার্মআপ তো বটেই, নতুনদের ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগও বটে। সেটা এরচেয়ে ভালো করে হওয়া সম্ভব ছিল না।

টুর্নামেন্টে দারুণ খেলেই ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। পারফরম্যান্স বিবেচনায় শিরোপাটা এবার বাংলাদেশেরই প্রাপ্য। কিন্তু বৃষ্টি এসে সব ভন্ডুল করে দিতে বসেছিল। ডাবলিনে শুক্রবারের ফাইনালে ২০.১ ওভারেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলে নিয়েছিল বিনা উইকেটে ১৩১ রান। মাঝে জানা গেল, বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেসে গেলে শিরোপা বাংলাদেশেরই। তাতে অনেকেই চেয়েছিলেন ম্যাচটা ভেসে যাক। কারণ বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে বাংলাদেশের টার্গেট কঠিন হওয়ার কথা। হলোও তাই।

তবে আমি কিন্তু একবারের জন্যও বৃষ্টিবিঘ্নিত শিরোপা চাইনি। যে অর্জন পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি কিছু নয়, তেমন অগৌরবে আমার কোনো আগ্রহ নেই। হারি আর জিতি, আমি চেয়েছি ফয়সালাটা মাঠে হোক। পাঁচ ঘণ্টা পর খেলা শুরু হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৪ ওভারের ইনিংস শেষ হয় ১ উইকেটে ১৫২ রানে। কিন্তু বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের টার্গেট দাড়ায় ২৪ ওভারে ২১০। আমি জানতাম কঠিন, কিন্তু এও জানতাম অসম্ভব নয়।

ফাইনালে বাংলাদেশ নেমেছিল দলের সেরা খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানকে ছাড়াই। মাশরাফি আগের দিনই বলেছেন, সাকিবকে ছাড়াও ম্যাচ জেতা সম্ভব। শুরুতেই সৌম্য জানিয়ে দিলেন অবশ্যই সম্ভব। সৌম্য জানিয়ে দিলেন ২১০ তো বটেই, কিছুই অসম্ভব নয়। সৌম্য ঠিক আরেকটি বিশ্বকাপের আগে জানিয়ে দিলেন, ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্ল্যাস ইজ পার্মানেন্ট। ফর্মে থাকা সৌম্যর ব্যাটিং দেখা যে আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা, আরেকবার জাতি তা দেখলো মহা আনন্দের সাথে। সৌম্য যদি ঝড় তোলেন, মোসাদ্দেক তুলে দিলেন সাইক্লোন।

প্রথম কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতা অবশ্যই আনন্দের। আর বাংলাদেশ যে স্টাইলে জিতলো, তা আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুন। ভাবুন একবার বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচের ট্রফি আর অমন ম্যাচ জিতে পাওয়া ট্রফি; অর্জনেও কেমন আকাশ পাতাল ফারাক। তবে আমার আনন্দ আরো বেশি, কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেটুকু শঙ্কা ছিল, তাও উড়ে গেছে সৌম্য-মোসাদ্দেকের তাণ্ডবে।

অনেকদিন পর একটা গুরুত্বপূর্ণ জয়ে পঞ্চপান্ডবের অবদান সামান্যই। মুশফিকের ছোট্ট ইনিংস ছাড়া আর কারো বলার মত কিছু নেই। সৌম্যর পাশে তামিম ইকবালকে খুব ম্লান আর নড়বড়ে লাগছিল। এটাই আনন্দের। পঞ্চপান্ডব তো পরীক্ষিত পারফরমার। নতুনদের পরীক্ষাটা দরকার ছিল। তাতে তারা গোল্ডেন জিপিএ-৫। শুধু ফাইনাল নয়, টুর্নামেন্টজুড়েই ছিল নতুনদের দাপট। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই ৫ উইকেট নিয়ে আবু জায়েদ জাত চিনিয়েছেন। তারপরও ফাইনালে তার জায়গা হয়নি। সৌম্যর বিশ্রামে পাওয়া সুযোগে লিটন দাশের ঝলমলে ফিফটি। তারপরও ফাইনালে ঠাঁই হয়নি। মোসাদ্দেক দলে ঢুকেছিলেন সাকিবের ইনজুরির সুযোগে। এখন মোসাদ্দেককে ছাড়া একাদশ সাজানোর কথা ভাবলে দেশে আন্দোলন হবে। সাকিব দলে ফিরলে কে বাদ পড়বেন? বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের এ এক মধুর সমস্যা। অনেকেই বলছেন, ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপে ম্যাচ জিততে হলে যে কোনো দলকে নিয়মিত ৩০০ প্লাস রান করতে হবে। শুক্রবার ডাবলিনে বাংলাদেশ জানিয়ে দিল, আমরা প্রস্তুত।

ডাবলিনে যখন বৃষ্টিতে ম্যাচ বিলম্বিত হচ্ছিল, বাংলাদেশে তখন প্রবল কালবোশেখী। এখন বুঝছি সে ঝড় যতটা প্রাকৃতিক, ততটাই নতুনের আবাহন। সৌম্য-মোসাদ্দেকের ব্যাটে উড়ে গেল সব শঙ্কার মেঘ। উচ্চারিত হলো, নতুনের জয়ধ্বনি- তোরা সব জয়ধ্বনি কর, ঐ নুতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড় …।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
probhash2000@gmal.com

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন