বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

আমার ডাক্তার, আমার খেলোয়াড়, আমার দেশ

মে ১৯, ২০১৯ | ৯:২৩ অপরাহ্ণ

বাপ্পাদিত্য বসু

আমার ছোট ভাই সাগরময় বসু মিতু’র যখন দেড় মাস বয়স, তখন ওর নিউমোনিয়া ধরা পড়লো। সে পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় আগের কথা। যশোরের মতো একটা মফস্বল শহরের চিকিৎসা ব্যবস্থা তখন কতোই বা উন্নত ছিল! যশোর পলি ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো তাকে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুজ্জামান ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. খায়রুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে ওর চিকিৎসা চলে। চিকিৎসা আর কী! যমে-মানুষে রীতিমতো টানাটানি। পাশের শয্যার আরেকটি অনুরূপ বয়সী শিশু অনুরূপ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিরশয্যা নিলে আমরাও ওর জীবন নিয়ে সমস্ত আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু ডাক্তার আশা ছাড়েননি। তিনি রাতদিন একাকার করে ওর চিকিৎসা করেছেন। একটা সময় রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো। কিন্তু স্বেচ্ছায় রক্তদানের মতো সচেতনতা তখনও দেশে তৈরি হয়নি। বরং রক্তদানে একটা ভীতি কাজ করতো। ও পজিটিভ রক্ত দরকার। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ডা. খায়রুজ্জামান বললেন, ‘আমি তৈরি রক্ত দিতে।’ কতখানি মহৎপ্রাণ চিকিৎসক হলে নিজেই রোগীর জন্য রক্তদানে তৈরি থাকা যায়। শেষমেশ ডাক্তারের রক্ত দেওয়ার দরকার হয়নি। আমার বড় মামার সাথে রক্তের গ্রুপ মিললো। রক্ত দিলেন মামা। সেই থেকে ডাক্তারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা-ভক্তির সূচনা। আমার ভাই সেবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আজ এতো বড় হয়েছে। পলি ক্লিনিকের ডাক্তার ও স্টাফরা ওকে বলতো- মৃত্যুঞ্জয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরেই তো সেদিন থেকে ওই ডাক্তার আমাদের কাছে জীবনত্রাতার মতন।

বিজ্ঞাপন

আজ এতো বছর পর আমার মা গত কয়েকদিন আগে ডা. কামরুজ্জামানের ব্যক্তিগত চেম্বারে যখন চিকিৎসা নিতে গেলেন, তখনও তিনি মাকে চিনতে পেরেছেন এবং সমান আন্তরিকতায় তার চিকিৎসা করেছেন।

১৯৯৮ সালের অক্টোবরে আমার বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। খুলনার কিউর হোম নার্সিং ক্লিনিক। এর আগে থেকেই বাবা চিরকালীন অ্যাজমার রোগী ছিলেন। বাবার স্ট্রোক হবার পর আমরা দেখেছি ওই হাসপাতালের ডাক্তারদের অক্লান্ত চেষ্টা। পাঁচদিনের মধ্যে দুইবার হৃদরোগ হয়ে গেলো। প্রথমবার বাবা ঠিকমতো ফিরে এলেও এক পর্যায়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা করিয়েও আর লাভ হয়নি। বাবা ফেরেননি। কিন্তু ওই হাসপাতালের ডাক্তারদের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি আমরা দেখিনি। তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি আমরা পাইনি। বরং সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে তারা চেষ্টা করেছেন। সেদিনও ডাক্তারের প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা বেড়েছে।

২০১৬ সালের ১৫ মার্চ আমি পিতা হলাম। রাজধানীর আজিমপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতাল নামে বহুল পরিচিত) এর চিকিৎসক, সেবিকা থেকে শুরু করে নিচের স্তরের সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত রোগীর প্রতি যে দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, তাতে আমি ও আমার পরিবার চিরকৃতজ্ঞ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইশরাত জাহান থেকে শুরু করে প্রত্যেকের দায়িত্ববোধে আমি মুগ্ধ। আমার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশন করেছিলেন যিনি সেই ডা. রত্না মজুমদারের দায়িত্ববোধ আর আন্তরিকতার বিপরীতে কোনো ভাষা দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামর্থ্য আমার নেই। ওই হাসপাতালে জন্মের মাত্র চারদিনের মাথায় আমার নবজাতক সন্তান প্রিয়ম শরণ্য জন্ডিসে আক্রান্ত হলে সেখানকার শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আমির হোসেন-সহ শিশু বিভাগের সকল ডাক্তার ও স্টাফদের আন্তরিকতাও আমাকে মুগ্ধ করে।

যশোর ও খুলনার পূর্বোক্ত দুটো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হলেও শেষোক্ত আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালটি কিন্তু সরকারি। আমি সরকারি ও বেসরকারি নির্বিশেষে হাসপাতালের ডাক্তারদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার চিত্রটি নিজের নিকটজনদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেখেছি। এর বাইরেও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ অনেক ডাক্তারের কথা বলতে পারি যারা ডাক্তারি পেশার ঊর্ধ্বেও ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে মানবিকতা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনন্য। প্রয়াত ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু, ডা. কাজী তারিকুল ইসলাম, ডা. চিন্ময় দাস, ডা. লেলিন চৌধুরী, ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী, ডা. শেখ হাফিজুর রহমান, ডা. নবিউল ইসলাম সোহেল, ডা. গৌর কিশোর চক্রবর্তী, ডা. রাহাত, ডা. আলাউদ্দিন, ডা. মুন, ডা. তন্ময়-সহ অসংখ্য মানবিক ডাক্তারকে তো নিজেই চিনি। আর বন্ধুপ্রতীম ডা. সুব্রত ঘোষের কথা তো না বললেই নয়, রাত-বিরাতেও চিকিৎসা-সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে তার শরণাপন্ন হই আমি। আমার সন্তান জন্মের পরপরই অসুস্থ হলে আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালেও হাজির তিনি। এমনকি আমি দেশের বাইরে যাচ্ছিলাম গত ডিসেম্বরে। কিন্তু তখন আমার সন্তানের চিকিৎসা করানো প্রয়োজন হয়ে পড়লো। ফ্লাইট ছাড়ার মাত্র দুই মিনিট আগে তাকে ফোন করে বললাম, তিনি বললেন, ‘আপনি যান, আমি আছি।’ আমার সন্তানের চিকিৎসায় আমার স্ত্রীর পাশে নিজের ভাইয়ের মতো করেই তিনি ছিলেন।

এই যে এতো এতো ঘটনা- এরপরও আমি ডাক্তারদের কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করতে পারি? কতোখানি মনুষ্যত্ব হারালে আমি মহান ডাক্তারদের ভূমিকার কথা অস্বীকার করতে পারি? আমি বিন্দুমাত্র মানুষ হলেও আমার জীবনে ডাক্তারদের কোনো ভূমিকা কোনোভাবেই ভুলতে পারি না।

কিন্তু ডাক্তারদেরও নানান সীমাবদ্ধতা আছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, তাদের বেতন ও পারিশ্রমিকের সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে বহু সঙ্কট আছে। আমাদের মতো ছোট্ট দেশে এতো বেশি জনসংখ্যা তো দুনিয়ার আর কোথাও নেই। তাই অত্যধিক রোগীর চাপ আছে। তা সত্ত্বেও আমাদের মহান ডাক্তাররা আমাদের সেবা দিয়ে চলেছেন। সব পেশাতেই কিন্তু ভালো-মন্দ মানুষ আছেন। চিকিৎসা পেশাতেও আছেন। এখানেও মন্দ মানসিকতার মানুষ থাকাটা তা অস্বাভাবিক কিছু না। তারা টাকার লোভকে সেবা-ব্রতের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ঔষধ কোম্পানি থেকে কমিশন বাণিজ্য করেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফি নেন, সরকারি চাকরীস্থলে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগত চেম্বার-বাণিজ্য করেন।

আর সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো, কোনো এক ডাক্তারের মন্দ মানসিকতা ও মন্দ কর্মের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো পেশার মানুষ যখন কোনো কথা বলেন, তখন ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সকল ডাক্তার এক হয়ে যান। নিজেদের পেশা ও পেশার সহকর্মীদের জন্য সমন্বিত ভালোবাসা থাকা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু তার মানে এই নয়, যে নিজ পেশার একজন মন্দ সহকর্মীর জন্য এভাবে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে। এমনটা চলতে থাকলে অন্য সব পেশার মানুষের মধ্যে ডাক্তার-বিদ্বেষী মানসিকতা তৈরি হবে। ডাক্তারদের ভেতরও অন্য পেশার মানুষের প্রতি বিদ্বেষী আচরণ তৈরি হবে। কিন্তু অন্য আর দশটা পেশার সাথে ডাক্তারি পেশার আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। সব পেশার মানুষ মিলেই আমাদের সমাজ, সব পেশার মানুষের সমান অবদান আছে এই সভ্যতার বিনির্মাণে। কিন্তু ডাক্তাররা তো মানুষের জীবনের ত্রাতার কাজটি করেন। জীবন-মরণের নিয়ন্তা পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু তারপরের কাজটিই করেন আমাদের মহান ডাক্তাররা। সেই ডাক্তারদের সাথে অন্যদের বিরোধ-বিবাদ কারো জন্যই সুখকর নয়। ফলে অন্য পেশার মানুষদের যেমন ডাক্তারদের প্রতি সৃষ্ট ও চলমান বিদ্বেষ দূর করতে হবে, একইভাবে ডাক্তারদেরও নিজ পেশার মন্দ মানুষটির পাশে না দাঁড়িয়ে বরং তাকে শুধরানোর চেষ্টা করতে হবে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে ডাক্তার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ চলছে। আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ও নড়াইলের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার হাসপাতাল অপারেশন ও ফাঁকিবাজ হিসেবে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে এই বিদ্বেষপূর্ণ নোংরা প্রতিযোগিতার শুরু। চলছে এখনো। এর অবসান হওয়া দরকার।

ডাক্তারদের যেমন ‘সেকেন্ড গড’ হিসেবে মহান অবদান আছে, তেমনি বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে মর্যাদাশীল করতে খেলোয়াড়দেরও অবদান আছে। আর মাশরাফি তো নিছক আর দশজন খেলোয়াড়ের মতো সাধারণ-মাত্র নন। তিনি অনন্য। জাতীয় ক্রিকেট দলের তিন ভার্সনের মধ্যে কেবল একটির অধিনায়ক তিনি। কিন্তু মাশরাফি যখন খেলার মাঠে নেতৃত্ব দেন, তখন যেন তিনি অধিনায়কত্ব করেন সারাদেশের মানুষের। দেশের প্রতি তার কমিটমেন্টের প্রমাণ নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। সাতবার পায়ে অস্ত্রোপচার করার পরও যে দেশের জন্য খেলার কমিটমেন্ট থাকতে পারে, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। বিশ্বের বড় বড় তারকা খেলোয়াড়রাও মাশরাফির সাথে এক দলে খেলতে না পারার কারণে আক্ষেপ করেছেন। মাশরাফিকে যখন সাংবাদিকরা ‘তারকা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তিনি নাকচ করেছেন। বলেছেন, ‘আমরা নই, দেশের সেরা সন্তান আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, আমাদের কৃষক-শ্রমিকরা। আমরা বড়জোর বিনোদন দিতে পারি, মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা দিয়েছেন, কৃষকরা খাদ্য জোগান, শ্রমিকরা উৎপাদন করেন। তাদের কাছে আমরা কিছুই না।’ এই যে বোধ, একে নিছক একজন খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ি বোধ বলে ভাবার কোনো সুযোগ নেই। বিপিএল-এ অধিনায়ক হিসেবে রংপুর রাইডার্সকে চ্যাম্পিয়ন করার পর মালিকপক্ষ যখন তাকে কোটি টাকা দামের গাড়ি দিতে চেয়েছেন, তখন তিনি তার বদলে চেয়ে নিয়েছেন নিজের এলাকার মানুষের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স। এটিই হলো দেশপ্রেম, কমিটমেন্ট। আমি বিশ্বাস করি, কেবল মাশরাফি নয়, আমাদের অন্য সব খেলোয়াড়দের মধ্যেই এই কমিটমেন্ট আছে।

আবার খেলোয়াড়দের মধ্যেও মন্দ মানসিকতার, মন্দ কর্মের মানুষও আছেন। তারা জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দেশকে হারিয়ে দেন খেলায়। এমন উদাহরণও আমরা দেখেছি আমাদের দেশেও। দেশের সবচেয়ে বড় তারকা খেলোয়াড়কেও এই অপরাধে বহিষ্কৃত হতে দেখেছি। তাই বলে কতিপয় মন্দ মানুষদের জন্য বাকি সবার কমিটমেন্ট মিথ্যা হয়ে যায় না।

আমাদের ডাক্তাররা, আমাদের খেলোয়াড়রা, আমাদের অন্য সব পেশার মানুষেরা দেশের জন্য কমিটমেন্ট নিয়েই কাজ করেন বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের মধ্যে যারা কমিটমেন্টের ঊর্ধ্বে টাকার লোভ আর মন্দ মানসিকতাকে স্থান দেন, তারা সবার জন্যই ক্ষতিকর। সে পরিবহন শ্রমিক হোন, ডাক্তার হোন, খেলোয়াড় হোন আর অসৎ রাজনীতিবিদ হোন। আসুন, তাদেরকে পরিহার করি। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিরোধ ত্যাগ করি। ডাক্তার, খেলোয়াড়-সহ অন্যান্য সকল পেশার মানুষ নিয়েই, তাদের কমিটমেন্ট নিয়েই রচিত হোক আমাদের সোনার বাংলা।

লেখক: বাপ্পাদিত্য বসু,

সাধারণ সম্পাদক, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট।

সারাবাংলা/এসবি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন