মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ২ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দেশ নির্মাণেই ‘বিকল্প বাজেট’: আবুল বারকাত

মে ২৪, ২০১৯ | ৯:২৪ অপরাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চলতি অর্থবছরের বাজেটের সংক্ষিপ্তসার বিচার-বিশ্লেষণ ও কিছু অনুমিত শর্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় আগামী অর্থবছরের ‘বিকল্প বাজেট’। এক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সংগঠনটির বাজেট তৈরির এ প্রক্রিয়াও চলে সারাবছর ধরেই। বিকল্প বাজেটের কিছু প্রস্তাবনা আমলে নেওয়া হলেও সব প্রস্তাবই সরকার গ্রহণ করে না। তবে বিকল্প বাজেট কেবলই একটি দিক নির্দেশনা— সারাবাংলার সঙ্গে আলাপকালে এমনটিই জানিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।

বিজ্ঞাপন

মূলত আবুল বারকাতের হাত ধরেই তৈরি হয় অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে অর্থনীতি সমিতি বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দিয়ে আসছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেটের প্রস্তাব দিয়েছিল অর্থনীতিবিদদের এই সংগঠনটি। সর্বশেষ চলমান ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য বিকল্প বাজেটের প্রস্তাব ছিল ১২ লাখ কোটি টাকারও বেশি।

আগামীকাল শনিবার (২৫ মে) পঞ্চমবারের মতো বিকল্প বাজেটের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে সংগঠনটি। এ বছরও সংগঠনটির ‘বিকল্প বাজেট’ ১২ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জন্য সরকারের খসড়া বাজেটের আকার ৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। সাধারণত অর্থনীতি সমিতির বাজেটটি সরকারের বাজেটের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় অনেকেই এটিকে কল্পনাপ্রসূত বলে থাকেন।

বিকল্প বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া ও সরকার তা থেকে কতটুকু গ্রহণ করে সেসব নিয়ে সারাবাংলার সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করেছেন ড. বারকাত। ‘রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচিত বারকাত বলেন, ‘বিকল্প বাজেট তৈরিতে দুই ধরনের অ্যাপ্রোচ একসঙ্গে করা হয়। আমাদের বাজেট প্রস্তাবনার প্রধান ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ। আমাদের লক্ষ্য হলো বৈষম্যহীন অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র এবং অসাম্প্রদায়িক মানসকাঠামো বিনির্মাণ। এ দু’টি বিষয় হচ্ছে মৌল বিষয়। এ দুটি বিষয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন- এই জিনিসগুলো আমরা আমাদের মতো ব্যাখ্যা করে একটা দর্শনভিত্তিক বাজেট তৈরি করি। সেটার ওপর নির্ভর করেই আমরা এগিয়ে যাই।’

প্রক্রিয়াগতভাবে বেশি কিছু অনুসিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় জানিয়ে বারকাত বলেন, ‘প্রথম অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে সাংবিধানিক ভিত্তি। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের অধিক্ষেত্রের সক্রিয় ভূমিকা। এভাবে দারিদ্র, বৈষম্য, অসমতা দূর করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনকারী যেসব খাত সেইসব খাত, আয় ও ব্যয়ের কাঠামো পরিবর্তন (আয় ও ব্যয় কাঠামোর রূপান্তর), বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতাবিহীন (বিকল্প বাজেটে কোনোরকম বৈদেশিক ঋণের কথা নেই), রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বিত্তবান এবং ধনীদের উপরে যুক্তিসঙ্গত চাপ প্রয়োগ করা, ধনী এবং বিত্তশালী প্রতিষ্ঠান যেন সঠিক কর দেয় আয়ের খাত বিবেচনার সময় সেটি আমরা বিবেচনা করেছি, সরকারের মোট রাজস্বে পরোক্ষ করের (ভ্যাট) পরিমাণ বেশি আর প্রত্যক্ষ কর (আয়কর) কম- আমরা এটাকে উল্টে ফেলেছি, খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছি, কোনো আয়ই আসে না অথচ সম্ভাবনা অনেক, এসব খাত আমরা চিহ্নিত করেছি (এখানে আমরা ২০টি নতুন আয় খাতের কথা বলেছি- যেমন কালো টাকা উদ্ধার, অর্থ পাচার রোধ, সম্পদ কর)।’

বিজ্ঞাপন

উন্নয়ন দর্শনের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দে মানব উন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমদানি শুল্ক হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি দেশজ শিল্প এবং দেশজ কৃষি (যেমন এই মুহূর্তে আমরা বহুবার প্রশ্ন করেছি- চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও চাল এতো আমদানি করতে হয় কেন? আমরা বলছি আমদানি বন্ধ করে দিতে হবে চালের, নিষিদ্ধ। আর যদি তা না হয়, তাহলে বাসমতি বা সুগন্ধী চালের ক্ষেত্রে ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ২০০ শতাংশ শুল্ক দিলে, শুল্ক থেকে যেটা আদায় হবে সেটা কৃষক নেবে), তারপরে আমরা বলেছি- বাজেটে আয় ও ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে কী কী করা উচিৎ। বিষয়টি আমরা সারাবছরই ধরেই করি।’

ড. বারকাত বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট তুলনা করছি চলমান বাজেটের সঙ্গে। আমাদের বাজেটটি বিকল্প বাজেট, সরকারের বাজেট প্রস্তাব করার আগে দেওয়া। আমরা জানি না সরকারের বাজেট কতো এবং কোন খাতে কত। আমরা শুধু পত্র-পত্রিকায় একটা ফিগার দেখছি। এর বাইরে আমরা কিছুই জানি না। অতএব তুলনাটা করছি আমরা সব সময় চলমান অর্থবছরের (২০১৮-১৯) সঙ্গে। আর বাজেটে আমরা দেখছি ২০১৯-২০ অর্থবছর, যাকে চিহ্নিত করছি আসন্ন অর্থবছরের বিকল্প বাজেট হিসেবে।’

পরবর্তী প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘চলমান যে বাজেট, অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব যে বাজেট পেশ করেছেন, সেই বাজেটের সংক্ষিপ্তসার, ডকুমেন্ট, বরাদ্দ মঞ্জুরি দাবিসমূহ, উন্নয়ন, অনুন্নয়ন, পরিচালন- আমরা ওইসব পুরোটা কিন্তু প্রথমে নিই। খাতভিত্তিক যতো ধরনের শাখা-প্রশাখা আছে আমরা সবগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করি। ধরেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বাজেট কতো হওয়া উচিৎ? এখানে প্রাথমিক শিক্ষা বলতে স্কুল বুঝায়, সরকারি স্কুল। বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা আমরা জানি। একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে গেলে বছরে কী পরিমাণ ব্যয় হবে সেটা আমরা বের করি। দেশের বিভিন্ন এলাকার ১০০ কিংবা ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যয় যদি বের করতে পারি, তার একটি গড় করি। মোট বিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে গুণ করি। এতে যে ব্যয় দেখা যায় সরকারের সঙ্গে তা মেলে না, আমাদেরটি অনেক বড় হয়। এরকম সব খাতের ক্ষেত্রে আমরা তা করি। করার পরে আমরা দেখলাম- আমরা তো সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বাজেটের কথা বলছি, কিন্তু এখানে এলো ২০ লাখ কোটি টাকা। আমরা তখন রেশনালাইজ করি। ২০ লাখ কোটি টাকা তো পারবে না। এটা আসবে কোথা থেকে। চলতি অর্থবছরেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। এখন অনেকেই বলতে পারেন রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছি, তাই আদায় করতে পারিনি। আর আপনি ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিলেন। আমার উত্তর সোজা- আমরা আপনার জন্য বাজেট দিইনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিকল্প বাজেটটি কী হওয়া উচিৎ- আমি সেই বাজেট দিয়েছি।’

‘কিন্তু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা যদি দেখি বাজেটটি ২০ লাখ কোটি টাকার, তখন আমরা একটি থিউরি অ্যাপ্লাই করি। আমাদের হিসাবে যদি দেখি আয় ১০ লাখ কোটি টাকা হওয়া সম্ভব, তাহলে যদি ১২ লাখ বা সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বাজেট দিই। আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘাটতি থাকে। ধরে নেন, এই ঘাটতি মেটানোর ক্ষমতা আপনার নেই। তাহলেও তো ১০ লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়। তাহলে আপনারা ১০ লাখ কোটি টাকার বাজেট গ্রহণ করেন’, বলেন ড. বারকাত।

বিকল্প বাজেটের কতোটুকু সরকার গ্রহণ করেছে, জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, ‘বিকল্প বাজেট থেকে অনেক প্রস্তাবই তারা গ্রহণ করেছে। আমাদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী স্কুলে দুপুরের খাবার, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে বৃদ্ধাশ্রম প্রকল্প গ্রহণ ও গবেষণা উন্নয়ন (আরএনডি) ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে শস্যবীমা, কৃষি বীমা ও গবাদি পশু বীমা চালু করার কথা বলেছিলাম, পরীক্ষামূলকভাবেও তারা এটা গ্রহণ করেছে। রফতানি বহুমুখীকরণ অর্থাৎ রফতানির জন্য নতুন দেশ অনুসন্ধান করা- এটিও তারা গ্রহণ করেছে।’

‘যেমন আমরা ঘুষনীতির বিরুদ্ধে গত বাজেটেও বলেছি, এ বাজেটেও বলছি- সেক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এটা নিশ্চয়ই সেই জায়গা থেকে আসছে। নদীর অবৈধ দখলরোধে যে অভিযান আমরা দেখলাম, সেটা গত বাজেটে আমরা বলেছি। সেটাও সরকার গ্রহণ করেছে বলে আমি ধরে নিতে পারি। প্রবসীরা যাতে ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠায়, হুন্ডি না করে সেজন্য অর্থ পাঠাতে ফিস কমাতে বলেছিলাম সেটাও বোধহয় গ্রহণ করেছে। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা জন্য অবকাঠামোর যে উন্নয়ন প্রয়োজন, সেটাও গ্রহণ করেছে। তবে আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের একটি জিনিস প্রত্যেকবার গ্রহণ করবে বলে জানায়, কিন্তু করে না। সেটা হলো সিগারেট-বিড়ির ক্ষেত্রে অধিকহারে আবগারি শুল্ক আরোপ- এরকম অনেক কিছুই করে না। টিআইএনধারীর সংখ্যা বৃদ্ধির করা কথা বলি, এটা তারা করে। এবারও আমরা এরকম ১১৫টি প্রস্তাব দিচ্ছি’, বলেন ড. বারকাত।

‘বিকল্প বাজেট’ নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনা প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘২০১২ সালের ১৯ জুলাই অর্থনীতি সমিতিই প্রথম বলেছিল- নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু সম্ভব। তখন তো সবাই সমালোচনা করেছে। আজ যারা টকশো করে, যারা বলে আমাদের অর্থনীতি কতো শক্তিশালী, আমরা নিজের টাকায় পদ্মাসেতু করছি, তাদের প্রত্যেকটি লোক সমালোচনা করেছে। যতো বড় বড় অর্থনীতিবিদ, তারা বলেছে আবুল বারকাতের কথা কল্পনাবিলাসী। কিন্তু আজ নিজের টাকায় পদ্মাসেতু হচ্ছে।’ কাজেই এসব আমার কিচ্ছু আসে যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সারাবাংলা/ইএইচটি/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন