সোমবার ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১১ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নজরুল ও আমি যতটা কাছের, ঠিক ততটাই দূরের: ফাতেমা তুজ জোহরা

মে ২৫, ২০১৯ | ৮:৩০ পূর্বাহ্ণ

আশীষ সেনগুপ্ত

ফাতেমা তুজ জোহরা, নজরুল আদর্শে সমর্পিত এক নিভৃতচারিণী। অতি সাধারণ অবয়বে অসাধারণ এক শিল্পী। যার কণ্ঠ, হৃদয়ে, ধ্যানে, জ্ঞানে শুধুই নজরুল। নজরুল সংগীত চর্চায় এখনো নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন অতি নীরবে। কাজ করে যাচ্ছেন বাঙালি মননে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠায়। আজ নজরুল জয়ন্তীতে নজরুল প্রসঙ্গে তারই কথা সারাবাংলার পাঠকদের জন্য...

বিজ্ঞাপন

• কাজী নজরুল ও আপনি...

কাজী নজরুলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক যতটা কাছের, আবার ততটাই দূরের। তাঁকে আমি সামনাসামনি দেখিনি। যদিও ঢাকাতেই ছিলাম। তারপরও দেখার সুযোগ হয়নি। আমার শারীরিক অবস্থা সে সময় ভালো ছিল না। দেখা না হওয়ার এই আপসোসটা আমার সারাজীবনের। তাঁর জীবনী পড়তে পড়তে, গান করতে করতে তাঁকে যতটুকু চিনেছি, তাতে মনে হয় তাঁর সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। আমার ভেতরে তাঁকেই আমি গড়ে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত তাঁর আদর্শেই বেঁচে থাকতে চাই।

• নজরুল সঙ্গীতে সম্পৃক্ততা...

বিজ্ঞাপন

আমার জীবনে ছোটবেলা থেকেই গান শেখার ব্যাপারটা ছিল। এটা বলছি তার কারণ, আজকাল সংগীত শিক্ষা ছাড়াই অনেকে গান গাওয়া শুরু করে দিয়েছে। বাজার মাত করার নামে যেসব গান এখন শুনছি, বা কেউ জোর করে চেনাতে চাচ্ছে, আমাদের ছোট বেলায় সে সব ছিল না। সুন্দর বাণী, সুন্দর সুর রয়েছে এমন গানই শেখানো হতো। ছোটবেলায় রবীন্দ্র সংগীতই শেখা হয়েছে বেশি। আমার আবার শেখাটা হয়েছিল কঠিন গানের মধ্য দিয়ে। যার ফলে গানের প্রতি ভালো লাগাটা আমার ছোটবেলা থেকেই। একটু বড় হয়ে শুরু হলো নজরুলের গান শেখা। নজরুলের গান গাইতে পারি, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না সেটা ভালো হচ্ছে কি না। তখন আমার বাবা, আমার ওস্তাদজীরা আমার গান শুনে স্বীকৃতি দিতেন। আরও বড় হয়ে পুরোদমে নজরুলের গান গাওয়া শুরু করে দিলাম। আর ওই সময় আমি তাঁর জীবনী, তাঁর লেখা, আদর্শ এসব পড়তাম। ভালোবাসা অনুভব করলাম তাঁর কাজে। এই কবি যে শুধু গানের কবি নয়। এই কবি যে জীবনের কবি, এটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম। তাঁকে নিয়ে যতই পড়ি, বারবারই মনে হয়, তাঁকে জানার অনেক বাকি। সামান্য ক’টা গানে কি তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়?

এভাবেই নিজের জীবন-জীবিকা ও পরিচিতির সঙ্গে তাঁর গান যুক্ত হয়ে গেল, আমি দায়বদ্ধ হয়ে গেলাম। এটা অনস্বীকার্য যে, রবীন্দ্র-নজরুলের গান করে আমরা অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করি। এটা স্রষ্টার দান যে, একজন সৃষ্টি করে গেছেন। আর সেই সৃষ্টি দিয়ে আমরা আয় করছি, জীবিকা নির্বাহ করছি।

• আদর্শ যখন নজরুল...

নজরুল নারীদের কথা বলেছেন সবচেয়ে বেশি। আমাদের ধর্মেও নারীদের প্রতি একটা বিশেষ সম্মান দেওয়া আছে। আমাদের নবী করিম (সা.) বলে গেছেন যে, নারীদের কোন চোখে দেখা হবে। কিন্তু কি দুর্ভাগ্য যে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদেরকে পুরুষদের কাছ থেকে নারী স্বাধীনতা চাইতে হচ্ছে। নারীরাও এটা বোঝে না, পুরুষরাও এটাকে অপব্যবহার করে। যেটা ধর্মের কোথাও নেই এবং যে সব মনীষীরাও এ ব্যাপারে বলে গেছেন, তাদের নজরুল অন্যতম। নজরুল তাঁর কথায়, তাঁর লেখায় নারীদের সম্মানের উল্লেখ করে গেছেন। পাশাপাশি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার তিনি কখনোই মেনে নেননি, প্রতিবাদ করেছেন। যার ফলে জেল খাটতে হয়েছে বহুবার।

• নজরুল গীতিতে রাগের সংমিশ্রণ...

নজরুলের অধিকাংশ গানই রাগের ওপর ভিত্তি করে। রাগের সঙ্গে এই সংমিশ্রণ উনিই ঘটিয়েছেন। নজরুলের গান নিয়ে আগে যে চর্চা হতো, তখন তো ভীষণ কাটতি ছিল বাজারে। কারণ, তিনি একসঙ্গে অনেক ধরনের গানের প্রবর্তন করেছেন। তিনি তাঁর গানে নর্থ আমেরিকান ক্লাসিক্যালের সঙ্গে ভারতীয় ক্লাসিক্যালের এমনভাবে সংমিশ্রণ করেছেন যেন সাধারণ শ্রোতারা সেটা উপলব্ধি করতে পারে। ভাবতেই অবাক লাগে তিনি একইসঙ্গে বাংলা ইসলামী গান আবার শ্যামা সংগীতও সৃষ্টি করলেন। আধুনিক, উচ্চাঙ্গ, বাংলা গজল– এতগুলো ধারার গানের তিনি প্রবর্তক। বাংলায় তিনি যে সংখ্যক ইসলামী গান আর শ্যামা সংগীত লিখে গেছেন, এটা কি উতরানো সম্ভব? আর এসবের কারণেই তখনকার মানুষের মনে নজরুলের গান নাড়া দিয়েছিল। যার ফলে সে সময় নজরুলের গানের প্রচণ্ড চাহিদা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর কিছু গানের সুরকে অন্যভাবে গাওয়া হয়। কয়েকজন শিল্পী তার গানকে সুরান্তর করে পরিবেশন করলেন। যার ফলে নজরুলের গান নিয়ে তখনকার নবীনদের মধ্যে একটা ভীতি আসলো। না জানি গাইতে গিয়ে আবার কোন ভুল হয়ে যায়। বা সঠিক সুর কোনটা। সে সময় এ ব্যাপারটা আমার মধ্যেও এসেছিল। সুরের জটিলতা নিয়ে এতো বেশি গবেষণা করতে হতো যে, গাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলতাম। আরেকটা ব্যাপার ছিল, নজরুলের গানের রাগের প্রাধান্য। আর তৎকালীন কিছু কিছু শিল্পী সেই গানে স্বপ্রণোদিত হয়ে এতো বেশি রাগের ব্যবহার করে ফেললেন যে, নবীনরা ভয় পেয়ে যেতো। তারা ভাবতো এভাবে কি গাইতে পারা সম্ভব। এই জটিলতা বা দুর্বোধ্য হওয়ার ফলেই নজরুলের গানে সেই সময়কার নবীনদের আগ্রহ অনেকটা কম ছিল।

• নজরুল সংগীতের বর্তমান প্রেক্ষাপট...

এখনকার সময়ে যেটা হচ্ছে সেটা হলো, সবাই আদি রেকর্ড মেনে চলছে। আমাদের সৌভাগ্য যে আদি রেকর্ডটার অনেকটাই উদ্ধার এবং সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। যার ফলে গানে বিধিবদ্ধতা চলে আসছে। আদি রেকর্ডটাই হচ্ছে আসল সুর। এখনকার ছেলেমেয়েরা নিজ দায়িত্বেই সেটা ফলো করছে। তারা বেশ পড়াশুনা করেই কাজ করছে। আমি মনে করি, যতগুলো রেকর্ড এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো যদি সঠিকভাবে শিখে বা চর্চা করে গাইতে পারি, তাতেই চলবে। সেটার সংখ্যা যদি এক-দেড় হাজারও হয়, তাতে কী! ভেজাল সুরে তিন চার হাজার গাওয়ার চেয়ে কম সংখ্যক থাকুক। সঠিক শুদ্ধটাই থাকুক।

• প্রসঙ্গ আদি রেকর্ড...

১৯৪২ সালের আগ পর্যন্ত যে রেকর্ডগুলো করা হয়েছে, ওই রেকর্ডগুলোকে আদি রেকর্ড বলা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২-এ অসুস্থ হয়ে গেলেন। তার আগ পর্যন্ত যতগুলো রেকর্ড করা হয়েছে, সেগুলোই আদি রেকর্ড। সেই রেকর্ডগুলো ছিল সম্পূর্ণভাবে কবির তত্ত্বাবধানে করা। আমরা চেষ্টা করি, আদি রেকর্ডগুলো অনুসরণ বা অনুকরণ করে গাইতে। কারণ সেটাই আসল সুর। ১৯৪২-এর পর থেকে যেসব গান রেকর্ড করা হয়েছে, সেগুলোকে আদি রেকর্ড বলা হয় না। আমি মনে করি, সেই আদি রেকর্ডে যদি ১৫০০ গানও হয়, তাহলে সেটাই শুদ্ধভাবে চর্চা করা হোক। আসলে তখন তো কোনো কিছুই গোছানো ছিল না। আর তখন এই সুযোগটাই লুফে নিয়েছিল কেউ কেউ। তারা কবির গান চুরি করে নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছে। সে সময় একটা মহল কারসাজি করে নজরুলের প্রচুর রেকর্ড নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এ রকম প্রচুর প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন নজরুল ইনস্টিটিউট একটা সঠিক অবয়ব দাঁড় করিয়েছে।

• নবীনদের উদ্দেশ্যে...

নতুন ছেলেমেয়েদের বলতে চাই, যতই রঙচঙে বা চটকদার হোক, যেটা হয়তো নিজের ভালো লাগছে। তারপরও সেটা যদি নজরুলের আসল সুর না হয়, তাহলে সেটা গাইবার চেষ্টা করো না। আসল সুরেই গাও। অবশ্য এখনকার ছেলেমেয়েরা এ ব্যাপারে অনেক সচেতন। অধিকাংশকেই দেখছি বেশ পড়াশুনা করেই কাজ করছে। এটা সুখকর।

• নজরুল গীতিতে ফিউশন...

ফিউশন আমি নিজেও করেছি। এটাকে কেউ যদি দোষের মনে করে, তাহলে আমিও দোষি। আর এই দোষটা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি। কারণ আমি যা করছি, তা জেনেই করছি। আমি গানে কোনো রকম পরিবর্তন বা পরিমার্জন করিনি। আর মিউজিক ততোটুকুই যতোটুকু সঙ্গত। নজরুলের গান হচ্ছে চিরকালীন আধুনিক।

• পরিশেষে...

সত্যি বলতে কী, কিছুদিন আগেও নজরুল সংগীতের জন্য পরিবেশটা বেশ অনুকূল ছিল। যেটা এখন আবার নেই। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ধরনটা পাল্টে গেছে। শ্রোতাদের পছন্দ পাল্টে গেছে। উদ্দেশ্যটাও পাল্টে গেছে। যার ফলে পুরোপুরি রাগাশ্রয়ী অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা হচ্ছে না। নজরুলের গানে পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। অনেক চ্যানেল হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক, সেখানে নজরুলের ঠাঁই হচ্ছে না। অনেক চ্যানেলই সরাসরি বলে দেয়, নজরুলের গানের তো দর্শকই নেই। এই কথাগুলো শুনলে খুব কষ্ট লাগে। দুনিয়ার যতোসব আজে বাজে বিষয় নিয়ে প্রোগ্রাম হতে পারে। আর আমাদের জাতীয় কবির মাত্র চারটা গান নিয়েও কি একটা প্রোগ্রাম হতে পারে না? নজরুল শিল্পীরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছে। আজ পর্যন্ত শুনিনি যে নজরুল গীতির কোনো শিল্পী সম্মানী নিয়ে কোনো দাবি বা আপত্তি করেছে। তারা স্বেচ্ছায় গান করে দেয়। টাকাটা বড় কথা নয়, গানের প্রোগ্রাম হচ্ছে এটাই আনন্দ, এটাই প্রাপ্তি। চ্যানেলগুলোকে বলতে চাই, আমাদের ছোট্ট একটু চাওয়া। নজরুলের গান হোক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, নজরুল সংগীতের কোনো শিল্পী আপনাদের হতাশ করবে না। একজন নজরুল সংগীত শিল্পী অনেক পরিশ্রম করে শিল্পী হয়। তাকে পুর্ণাঙ্গ ক্লাসিক্যাল শিখে, সাধনা করেই নজরুলের গান করতে হয়। এরপরও যখন সে পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা পায় না, তখন সে অন্তঃদহনে ভোগে। আর এভাবেই প্রতিভা হারিয়ে যায়। তাই আমার অনুরোধ, নবীনদের স্বার্থে সবাই একটু ভাবুন...

সারাবাংলা/এএসজি/এটি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন