শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

পরাজিত ধর্মনিরপেক্ষতা

মে ২৬, ২০১৯ | ২:৪১ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

দ্য হিন্দু পত্রিকায় দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জয়া হাসানের একটা লেখা পড়ছিলাম। ভারতীয় নির্বাচনের বিশ্লেষণ। কংগ্রেসের বিপর্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলছেন – “This dismal result shows that the revival of the once-dominant powerhouse isn’t happening any time soon”. কংগ্রেস আর ভালভাবে কবে রাজনীতিতে ফিরতে পারবে তা অনিশ্চিত হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

গত এক বছর ধরে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপির উপর যেভাবে আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছিল, তাতে ভোটের পরীক্ষায় সম্মানজনক ফলের আশাই ছিল সবখানে। কিন্তু তা হয়নি। ২০১৪ সালে এককভাবে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন। এবার এত জাঁকজমক করে নেমেও ৫২টি আসনে থেমে যেতে হল রাহুল গান্ধীর দলকে। ইউপিএ-র ভাগ্যে সব মিলিয়ে ৯২টি।

কংগ্রেসের মত একটি উদার ধর্মনিরপেক্ষ দলকে ভারতীয় জনগণ বেছে নেয়নি, নিয়েছে চরম একটি সাম্প্রদায়িক দলকে। জনগণের রায়কে মাথা পেতে নিয়েছেন রাহুল গান্ধী এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদিকে। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

ভারত এই উপমহাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ, বড় দেশ। সেই দেশের রাজনীতি, ভোটের ফলাফল এই অঞ্চলে প্রভাব ফেলে। আর তাই এ নিয়ে ভাবতে হয়। জয়া হাসান বলছেন, কংগ্রেসের সামনে আর কোন সহজ সমাধান নেই। গত পাঁচ বছরে ভারতে আক্রমণ করে করে ধর্মনিরেপক্ষতাকে প্রান্তিক পর্যায়ে যাওয়া হয়েছে এবং কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর এই আঘাতকে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় কোন কর্মসূচী দিতে পারেনি।
গোটা উপমহাদেশেই ‘সেক্যুলার’ রাজনীতি এক বিপদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মোদির হিন্দুত্ববাদের উদারতা আর সেক্যুলার রাজনীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি কোনও ভূমিকাই রাখতে পারছেনা। কিন্তু এটা কি শুধু ভারতে? আমরা দেখছি এদেশেও। এই রাজনীতি এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে না, সে পরাশ্রিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে আপস করে করে। দুর্বল, আত্মপ্রত্যয়হীন, পরাশ্রিত, প্রতিক্রিয়াজীবী ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুঁজি করে নির্বাচনে জনগণের কাছে পৌঁছা যায়না।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক বলেই, ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করবে- এটাই স্বাভাবিক, এটাই আসল রাজনীতি। কিন্তু রাষ্ট্র ও রাজনীতি কেবলই যখন পরাজিত হতে থাকে ধর্মান্ধতার কাছে তখন অসহিষ্ণুতা ও নির্মম হিংসার জনক সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই এজেন্ডা স্থির করতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

মোদি ২০১৪ সালের নির্বাচনে যে ধর্মীয় এজেন্ডাকে সামনে এনে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন, তা হল হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুবাদ আর হিন্দুত্ববাদের মধ্যে বড় পার্থক্য হল– প্রথমটি হচ্ছে রাজনৈতিক আদর্শ আর পরেরটি রাজনৈতিক প্রকল্প। মোদি এই রাজনৈতিক প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করেছেন সফলভাবে। বাংলাদেশেও যারা আদালত চত্বরে ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে, পাঠ্যপুস্তক থেকে অমুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান লেখকদের লেখা সরিয়ে দিতে পারে, যারা বারংবার নাস্তিক গালি যেখানে সেখানে প্রয়োগ করে তাদের রাজনীতিটাও যতটা না ধর্মের, তার চেয়ে অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রকল্প।

একটা প্রশ্ন আসে - ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটিতে কি ফাঁক তৈরী হয়েছে? উপমহাদেশীয় মানস থেকে কি এটি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে? পশ্চিমা উদারনৈতিক রাজনীতি যেভাবে ধর্ম আর রাজনীতিকে আলাদা করতে পেরেছে, তাদের কাছ থেকেই পাওয়া ধর্মনিরপেক্ষত রাজনীতির চর্চা করলেও এ অঞ্চলের সমাজে কখনোই খুব সাফল্যের সঙ্গে রাজনীতি ও ধর্ম পৃথক হতে পারেনি। এই ব্যর্থতা সেই রাজনীতির যে রাজনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে এসেছে যুগ যুগ ধরে। সর্বজনীন সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে বলিষ্ঠ প্রকৃত উদার রাজনীতি করতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।

হয়তো আমাদের একটি ধারণা আছে যে, মানুষকে উন্নয়ন দিলে মানুষ ধর্মীয় এজেন্ডা থেকে সরে আসে। বাস্তবে তা নয়। আর্থ-সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দিয়ে রাজনীতির চেষ্টা সফল হয়না। বৃহত্তর সমাজ থেকে এই বিচ্ছিন্নতা উন্নয়নের অভিজ্ঞতাতেও প্রতিফলিত হয় অনেক সময়। আমরা পুঁজিবাদী বিকাশের দিকে এগিয়েছি, আর চোখের সামনে দেখি বৈষম্য ক্রমশ বেড়েছে, বাড়ছে। আর বৈষম্য যখন বাড়ে তখন বঞ্চিত মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পা বাড়ায় সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রকল্প নিয়ে যারা আসে তাদের দিকে।

গত ২৩মে যে ফলাফল ভারতে ঘোষিত হল তা রাজনীতির কোন মেরুকরণ? সামাজিক, ধর্মীয়, নাকি ব্যক্তি? হয়তো কোনটাই নয়। নরেন্দ্র মোদি মানুষের মধ্যে একটা বিষয ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি ছাড়া কোন বিকল্প নেই। উপমাহদেশীয় রাজনীতির যে সংস্কৃতি তাতে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির হিসাব করে সবসময়। ভারতে বামপন্থীরা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বামেরা, যারা আবার সেক্যুলার তারাও সমীকরণ করেছে। তারা যখন দেখেছে নিজেরা আসতে পারবেনা, বা কংগ্রেস বা তৃণমূলের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে বিজেপি তাদের বেশি স্বস্তি দেবে, তখন তারাও গেরুয়ার প্রতি নিবিষ্ট হয়েছে।
রাজনীতির এই ধরণের মেরুকরণকেই স্বাস্থ্যবান হচ্ছে দিনের পর দিন। নিষ্ক্রিয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই ধর্মীয় রাজনীতিকে সুযোগ করে দেয় সব সময়। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির নীতি-পঙ্গুতা, দিশাহীনতা উদারনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক সংকটের চোরাবালিতে নিমজ্জিত করছে, যেমনটা করেছে ভারতীয় কংগ্রেসকে। বাস্তবের জমিতে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস আগামীতে কি করে তা সময় বলবে। তবে আমাদের সবার জন্য শিক্ষা এই যে মানুষ, নিষ্ক্রিয়, পরাশ্রিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে আর নিতে পারছেনা, তারা আরও সক্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি চায়।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: এডিটর ইন চিফ, সারাবাংলা ও জিটিভি।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন