বৃহস্পতিবার ২০ জুন, ২০১৯ ইং , ৬ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

এন্টিবসে পিকাসো…

মে ৩০, ২০১৯ | ১০:০০ অপরাহ্ণ

পার্থ সনজয়

কোতে দ্য জুখের নীল জল ছুঁয়ে মধ্য যুগের ক্যাসলটির সামনে দাঁড়াতেই চোখের সামনে একে একে ‘ব্লু পিরিয়ড’, ‘পিংক পিরিয়ড’ আর কিউবিজম পেরিয়ে বর্ণময় এক চরিত্র ভেসে উঠলো। তিনি পাবলো রুইজ ই পিকাসো। এই ক্যাসলেই জীবনের দুটি বছর তিনি ছবি এঁকেছেন। ২৩টি পেইন্টিং আর ৪৪টি ড্রয়িং।
ক্যাসলটি এখন তার নামেই ‘পিকাসো মিউজিয়াম’ বলে পরিচিত।

শহরটির নাম এন্টিবস। দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর নিস আর কানের মাঝামাঝি। ভূমধ্যসাগরের নীল জল পুরো দক্ষিণ ফ্রান্সকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য। আর  এন্টিবসকে দিয়েছে আরো কিছু বেশি। বিলাসবহুল ইয়টগুলো যেন রাজহাঁসের মতো উচ্চকিত হয়ে হাতছানি দিচ্ছে নীলের সৌন্দর্য গায়ে মাখতে।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর কাভার করতে এই শহরেই আমরা ছিলাম। গেল দুইবারও যখন এসেছিলাম, খোঁজটা তখনই পেয়েছিলাম। এন্টিবসে পিকাসো ছিলেন। তাঁর নামে একটি যাদুঘর আছে। একটা গ্রামও নাকি আছে। শুনে কেঁপে উঠেছিলাম। মালাগা, বার্সেলোনা কিংবা প্যারিসের পিকাসো এন্টিবসেও!


গেল দুইবার সুযোগ হয়নি।
প্যারিসে অ্যানভার্সের পথে পথে রাত্তিরে ঘুরেছি বেশ। জেনেছি লাপিনে পানাহারে মাততেন পিকাসো তাঁর সমসাময়িকদের নিয়ে। লাপিনের পরিবেশটা এখনও সেই আবহ ধরে রেখেছে পিকাসো আর তাঁর সমসাময়িকদের স্মৃতি ধরে রাখতেই। কত কত স্মৃতি এই এনভার্সে পাবলোর!
সেই পাবলো এন্টিবসে। এবার আর সুযোগটা হারালাম না।

কান উৎসবের মাঝেই একটা দিন চুরি করে নিলাম। আমাদের ভাড়া করা এপার্টমেন্ট তেরাজ দো এন্টিবস থেকে ‘পিকাসো মিউজিয়াম’ এলাম উবারের মার্সিডিজে চড়ে। ভাড়া নিল ১০ ইউরো।
পথের চেনা সৌন্দর্য পেরিয়ে গাড়িটা যেখানে থামলো তাতে মিশে থাকলো প্রকৃতি, ইতিহাস আর শিল্পের হাতছানি।
দক্ষিণ ফ্রান্সের এবারের শীতটা দীর্ঘ। আবহাওয়া মানুষের মনের মতো রঙ পাল্টাচ্ছে। রোদ যে খুব হেসেছে তা নয়। তাই সাগরের নীলটারও যেন বসন্ত আসেনি। তবু চোখ পাতলেই মধ্যযুগের ক্যাসলটি ঘিরে শিল্পের সুষমাভরা।
একসময়কার বিশপের বাসস্থানটি ১৩৮৫ সালে ‘গ্রিমালদি পরিবার’ কিনে নেয়। নাম হয় ‘সাঁতো গ্রিমালদি’ ( গ্রিমালদির দুর্গো)।নানা সময়ে কিংস গভর্ণর, দ্য টাউন হল, মিলিটারি ব্যারাক ছিল এই ক্যাসল। ১৯২৫ সালে এন্টিবস শহর কর্তৃপক্ষ এটিকে জাদুঘরে রূপ দেয়।

বিজ্ঞাপন

 

১৯৪৫ সালে এন্টিবসে আসেন পাবলো পিকাসো। ১৯৪৬ তে যখন এই জাদুঘর দেখতে আসেন তখন কর্তৃপক্ষ তাঁকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন এখানে ছবি আঁকেন। এই ক্যাসলের দ্বিতীয়তলা বরাদ্দ হয় পিকাসোর জন্য। যে কয়টা মাস পিকাসো এখানে কাজ করেন তা ছিল তাঁর জন্য আনন্দের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে। নতুন স্বপ্ন আর আশা সঞ্চারে তাঁর শিল্পীমন তখন তৎপর। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন এখানে। এন্টিবস ত্যাগের ২০ বছর পর পিকাসো তাঁর সেইসব শিল্পকর্ম এই যাদুঘরে উৎসর্গ করে দেন।


এই ক্যাসলে পিকাসোর বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় সে সময়টায়। তবে ‘সাঁতো গ্রিমালদি’র নাম বদলে ‘পিকাসো মিউজিয়াম’ রাখা হয় ১৯৬৬ সালে।
জাদুঘরটিতে পিকাসোর সমসাময়িক শিল্পীদের শিল্পকর্মও রয়েছে। তবে পিকাসোর শিল্পকর্মগুলো বেশ বড় নয়। ‘ইউলিসিস’ নামে একটি চিত্রকর্মই দেয়ালজুড়ে আছে। এখানে শিল্পকর্মগুলো তাঁর মাস্টারপিসও নয়।
কিন্তু একটা দারুণ অনুভূতি থাকে এই মিউজিয়াম ঘিরে। সমুদ্রের বাতাস, ক্যাসলজুড়ে টেরাকোটার টাইলস যে কারো মন সাজাবে। পিকাসোর বেশ কিছু সিরামিকের শিল্পকর্মও আছে এখানে। ৭০ বছর ধরে এগুলো শোভা পাচ্ছে ক্যাসলের দেয়ালে।
পুরো ক্যাসলটির শিল্পকর্ম দেখতে এক ঘন্টাই যথেষ্ট। ফরাসি, ইংরেজি এবং ইতালিয়ান ভাষায় প্রতিটি শিল্পকর্মের বর্ণনা দেয়া আছে।


বাইরে বাগান। সেখানেও আছে শিল্পী মিরো’র মতো শিল্পীর শিল্পকর্ম।

মিউজিয়ামটি বন্ধ থাকে সপ্তাহের সোমবার, বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি, ১ মে, ১ নভেম্বর আর ২৫ ডিসেম্বর। সকাল ১০ থেকে ১২ টা পর্যন্ত খোলা। ১২ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত বন্ধ লাঞ্চের জন্য। দুপুর ২ টা থেকে আবার খোলা সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত।
জাদুঘরে প্রবেশ মূল্য ৮ ইউরো। তবে ১৮ বছরের নীচে যে কেউ বিনামূল্যে ঘুরে দেখতে পারবে জাদুঘরটি। আর ৬৫ বছরের ওপরে যাদের বয়স তাদের জন্য প্রবেশ মূল্য অর্ধেক।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন