শনিবার ২০ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৫ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

আমার জন্মই হয়েছে সঙ্গীতের জন্য: বাপ্পা মজুমদার

মে ৩০, ২০১৯ | ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

সাক্ষাৎকার: আশীষ সেনগুপ্ত

প্রিয় পাঠক, আজ শোনাব আমাদের সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের গল্প, যার নাম বললে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। সংগীত পরিবারের এই সদস্য কেবল শিল্পী নন, সুরকার-সংগীত পরিচালক হিসেবেও চড়েছেন খ্যাতির চূড়ায়। একক শিল্পী হিসেবে যেমন, ব্যান্ড দলের সদস্য হিসেবেও মাতিয়েছেন সংগীতপ্রিয় প্রজন্মকে। তার সাফল্যের সবটুকুই উন্মোচিত সবার সামনে, খোলা বইয়ের মতো। কিন্তু দিনের পর দিন যিনি গানের তানে মাতিয়ে রেখেছেন সবাইকে, তার সাফল্যের গল্পটা কি সবাই জানেন? সংগীতের আবহতেই বেড়ে ওঠা এই জাতশিল্পী কি সাফল্য পেয়েছেন বিনা আয়াসেই? তা কিন্তু নয়। একের পর এক প্রতিকূলতা পেরিয়ে যে সাফল্যের স্বপ্নচূড়ায় তিনি অধিষ্ঠান পেয়েছেন, তার গল্প শুনতেই হাজির হয়েছিলাম তারই স্বপ্নের স্টুডিওতে। তিনি বাপ্পা মজুমদার। সারাবাংলার পাঠকদের জন্য থাকছে তার গল্প …

  • ১৯৯৫ থেকে… ২৪ বছর পেরিয়ে…

মূলত আমি ছিলাম গিটারিস্ট। বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে অ্যাকোস্টিক গিটার বাজাতাম। বাজাতে গিয়েই একদিন পরিচয় হয় হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে। এরপর থেকে তার সঙ্গে নিয়মিত বাজাতাম। এর মধ্যে একদিন জুয়েল ভাই আমার গান শুনলেন। গান শুনে তার ভালো লাগলো। আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন অ্যালবাম করি। বলা যায়, এরপর থেকেই গান নিয়ে আমি আরও সিরিয়াস হলাম। আগেও টুকটাক গান করেছি। আমাদের একটা সংগঠন ছিল, অরনী শিল্পী গোষ্ঠী নামে। গান গাইতাম, গণসংগীত করতাম, পাশাপাশি আবৃত্তিও করতাম। জুয়েল ভাই যখন অ্যালবাম করার কথা বললেন, সেই কথা আমার কাছে ছিল বিস্ময়ের। অ্যালবাম করব, তাও আবার একক এটা কখনোই ভাবিনি। এই অ্যালবামের সূত্রেই পরিচয় হয় সঞ্জীব দা’র সঙ্গে, প্রয়াত সঞ্জীব চৌধুরী। এটা ১৯৯২ কি ১৯৯৩-এর দিকের কথা। সঞ্জীব দা আমাকে বললেন, তোমার গান গাওয়ার ধরণ আমার ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে কিছু গান দেবো। মূলত আমার প্রথম অ্যালবামের কাজ তখন থেকেই শুরু। সেই অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেছিলেন পার্থ প্রতিম বাপ্পী দা। প্রকাশিত হলো ১৯৯৫-তে ‘তখন ভোর বেলা’ শিরোনামে। এটা দিয়েই গান গাওয়া শুরু, আর আজ এই পর্যায়ে।

  • শুভাশীষ থেকে বাপ্পা …

শুভাশীষ নামে মূলত আমার স্কুল কলেজের বন্ধুরাই আমাকে চেনে। কিন্তু যখন আমি পারফরম্যান্স শুরু করেছিলাম, তখন সবাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিত আমার ডাক নাম ‘বাপ্পা’ নামেই। এটাই ঘটনা, অন্য কোনো বিশেষ কারণ নেই। এখন মাঝেমধ্যে শুনি আমার অনেক পুরানো বন্ধু, যাদের সঙ্গে হয়তো স্কুল জীবনেই শেষ দেখা, তারা নাকি সংশয়ে পড়ে যায় এই বাপ্পাই কি সেই শুভাশীষ! ওদের কারও কারও সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে ওরা বলে, তুই তো সেই শুভাশীষ, বাপ্পা হয়ে গেলি কবে? এই বিষয়টি আমি কিন্তু উপভোগই করি।

  • পারিবারিক বলয় …

বিজ্ঞাপন

আমার পরিবার সংগীত পরিবার। জন্ম, বেড়ে ওঠা সংগীতের মধ্যেই। প্রথমেই বলতে চাই, আমি ভীষণ ভাগ্যবান একজন মানুষ। এ রকম একটি পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে। এই পরিবারে জন্ম না হলে আমি নিশ্চিত বলতে পারি যে আমি আজকের এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। আমার কাজের প্রতি পরিবারের প্রতিনিয়ত যে সহযোগিতা ছিল, সেটা ভাবাই যায় না। আবার এও সত্যি যে, পরিবারের সঙ্গে আমার একটা ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছিল। প্রচুর সমস্যা দেখা দিলো। বলা যায়, একরকম যুদ্ধ। যে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পেতাম না, সেই আমিই একসময় তার কথায় প্রতিবাদ করে উঠলাম।

এটার মূল কারণ আমার লাইফস্টাইল। তখন আমি চাকরি করতাম। চাকরি থেকে এসেই কোনোভাবে দু’টো ভাত খেয়েই বেড়িয়ে পরতাম শো করতে। শেষ করে ফিরতাম গভীর রাতে। কখনো রাত ৩টা/৪টা, কখনো ভোরে। এই সব কারণেই বাসায় আমাকে নিয়ে সংশয় তৈরি হলো। মা-বাবা দু’জনেই ক্ষেপে গেলেন আমার ওপর। সে এক তীব্র সংঘাত। তবে সেই পর্যায়েও কিন্তু মা-বাবার এক ধরনের সাপোর্ট ছিল আমার ওপর। বিশেষ করে বড় দাদার। ক্রমাগত তাদের সাপোর্টই কিন্তু আমাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আমি তো মনে করি, একজন মানুষের সাফল্যে পারিবারিক সহযোগিতা বিশাল বড় ভূমিকা রাখে। এটা আশীর্বাদের মতো। অনেক ছেলে-মেয়েদের দেখি, তারা গান করছে। কিন্তু তাদের পরিবার থেকে কোনো ধরনের সাপোর্ট পাচ্ছে না। এরপরও তারা যে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, এ জন্য তাদের বাহবা দেওয়া উচিত। পরিবারের মতের বিরুদ্ধে থেকে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা অনেক বড় একটা যুদ্ধ। সে হিসেবে আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি।

  • মিউজিক পেশায় পারিবারিক আপত্তি …!

আপত্তিটা মিউজিককে পেশা হিসাবে নেওয়ার ক্ষেত্রে। মা-বাবার তীব্র আপত্তি ছিল। তারা সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন, মিউজিক নিয়ে কাজ করতে পারো, কিন্তু একক পেশা হিসেবে নয়। তোমার চাকরি থাকতে হবে, প্রতি মাসে নিশ্চিত আয়ের সংস্থান থাকতে হবে। এরপর তুমি যা খুশি করতে পারো, আপত্তি নেই। আমার আপত্তিটা ছিল সেখানেই। আমার কথা হচ্ছে, আমি যদি মিউজিককেই পেশা হিসেবে নেই, তাহলে আমাকে চাকরি করতে হবে কেন? এটাই তো আমার কাজ। পরে বুঝতে পেরেছি, এই আপত্তির মূল কারণ অনিশ্চয়তা। মা-বাবা দু’জনেই ক্লাসিক্যাল শিল্পী। যেহেতু ক্লাসিক্যালের কদর কম, তাই সবসময় তাদের দুজনকেই প্রতিনিয়ত প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে। প্রায় দিনই তাদের ভাবতে হতো, পরদিন বাজার কী হবে। একটা অভাবের মধ্য দিয়েই তাদেরকে সংসারটা চালাতে হয়েছে। হয়তো এসব কারণেই তারা চাননি যে আমি একক পেশা হিসাবে মিউজিক নিয়ে পড়ে থাকি। তাদের মতো আমিও কষ্টে থাকব, এই ভয় থেকেই হয়তো তারা এমন তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন।

  • মা-বাবা …

মা-বাবা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার খুব অসুবিধা হয়। এক সূত্রে গাঁথা আমাদের পরিবার। আদর্শ পরিবারের একটা উদাহরণ। মা, বাবা, বড়দা, মেজদা, আমি আমাদের বন্ধনটা ছিল খুবই সুদৃঢ়। আর এই মানুষগুলো এখন অনেক দূরে। কেউ পরপারে, কেউ পরবাসে। তাই এদের নিয়ে কথা বলতে খুবই কষ্ট হয়। তারপরও বলি …

বাবা প-িত বারীন মজুমদার। তার পান্ডিত্য, তার গানের ক্ষেত্র নিয়ে কথা বলার মতো দুঃসাহস আমার নেই। সুতরাং তাকে নিয়ে আমি কথা বলতে পারব না। তিনি আকাশসম একজন মানুষ। আমি মনে করি, যেকোনো সন্তান, সে যদি চূড়ান্ত পর্যায়ের আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়, তাহলেই সে এমন একজন পিতার সন্তান হতে পারে। বাবা হিসেবে তিনি যে কতটা অসাধারণ, সেটা আমরা জানি। আমাদের একটু ভালো রাখতে সারাজীবন যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু কখনোই আমাদের সেটা বুঝতে দেননি। আমার মনে পড়ে না যে আমরা ভাইয়েরা কখনোই একবেলা না খেয়ে ছিলাম। বাবা মা হয়তো না খেয়ে ছিলেন, কিন্তু আমাদের উপোষ রাখেননি। কতটা ভালোবাসা, কতখানি যত থাকলে মা-বাবা তাদের সন্তানকে এভাবে লালন করতে পারেন!

বাবার কাছ থেকে সংগীতের কিছুই শিখতে পারিনি। আসলে চেষ্টাই করিনি। তখন এড়িয়ে চলতাম। আর এখন কপাল চাপরাই। আসলে যতদিন বাবা বেঁচে ছিলেন, ততদিন বুঝতেই পারিনি যে আমার মাথার ওপর এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চলে যাওয়ার পর হায় হায় করছি কী হারালাম আমরা! এখন প্রতিনিয়ত আক্ষেপ করি কেন তার কাছ থেকে কিছু শিখলাম না, কিছু জানতে চাইলাম না! কেন তাকে প্রশ্ন করিনি  এই ভাবনাটাই ভীষণ পীড়া দেয় আমাকে।

মায়ের কথাও একই। মা ইলা মজুমদার। তিনি সাধারণ একজন মা ছিলেন না, ছিলেন দেবীতুল্য একজন মানবী। তার মতো মানুষ পৃথিবীতে বিরল। তাই সবসময় মনে করি, আমাদের ওপর হয়তো অনেক আশীর্বাদ ছিল, যে কারণে আমরা এ রকম মা-বাবা পেয়েছি। তারাই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

  • দলছুট’র গল্প …

আগেই বলেছি, আমার প্রথম অ্যালবামের কাজ করতে গিয়েই জুয়েল ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় সঞ্জীব দা’র সঙ্গে। সেই পরিচয়ের সূত্রেই অ্যালবাম বেরোনোর পরও দু’জন একসঙ্গে বেশকিছু কাজ করেছি। সেসময় আমরা একটা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কাজ পেলাম। সেটা ছিল অশোক কর্মকারের এক্সিবিশন কালরাত্রি। ২৫ মার্চ নিয়ে পুরো কাজ। সেই কাজটা করতে গিয়েই আমরা লক্ষ করলাম, আমাদের দু’জনের চিন্তা-ভাবনা প্রায় একই। নিজেদের পছন্দগুলোও খুব কাছাকাছি। একটা সময় ভাবলাম, একসঙ্গে কিছু করা যায় কি না। তখন আমাদের সঙ্গে মিঠু ভাইও ছিলেন। আমরা একসঙ্গেই দলবদ্ধ হলাম। জন্ম নিলো দলছুট। সেটা ১৯৯৬ সালের নভেম্বরের কথা। আমাদের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ বের হল ১৯৯৭-এ। মজার বিষয় হচ্ছে, অ্যালবাম বের হওয়ার পর প্রায় আট মাস আমরা শ্রোতাদের আনুকূল্য পাইনি। ১৯৯৮ সালের দিকে সেই অ্যালবামেরই একটা গান ‘সাদা ময়লা রঙিলা পালে’ প্রচারিত হল বিটিভি’র ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘শুভেচ্ছা’তে। শুভেচ্ছা ছিল আব্দুর নূর তুষার ভাইয়ের প্রোগ্রাম। শুভেচ্ছাতে গানটা প্রচারিত হওয়ার পরপরই চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল। দলছুটকে চিনল সবাই। আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা তুষার ভাইয়ের প্রতি। এরপর ২০০০ সালে আমাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘হৃদয়পুর’। সেই অ্যালবামের একটা গান শ্রদ্ধেয় বাউল শাহ আব্দুল করিমের ‘গাড়ি চলে না চলে না’ প্রচারিত হল আরেক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে। দলছুটকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দলছুট সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে সেদিনের সেই মানুষগুলোর প্রতি।

  • ব্যক্তি সঞ্জীব চৌধুরী …

ব্যক্তি সঞ্জীব দা’কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আমি জানি না। খুব ছোট্ট করে যদি বলি, তাহলে বলব সঞ্জীব চৌধুরী একটা কষ্টের নাম। তার কথা ভাবলেই বুকের ভেতর কষ্ট হয়। মা-বাবার মতোই। সঞ্জীব দা আমার কাছে একাধারে একজন অসাধারণ বন্ধু, অসাধারণ বড় ভাই, অভিভাবক, পথ প্রদর্শক, গাইড, আবার কখনো কখনো সঞ্জীব দা’কে আমার দার্শনিকও মনে হয়। আবার একইসঙ্গে তার মধ্যে কিছু শিশু সুলভ ব্যাপারও ছিল। সবকিছু মিলিয়ে অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। তাকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মিস করি তাকে। আমি প্রতিনিয়ত মিস করি তার মিউজিক, তার সাহচর্য। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই তাকে মিস করব।

  • নিজের সুরে শাস্ত্রীয় সংগীতের আধিক্য

এখানে পরিবার একটি মুখ্য ব্যাপার। আমি যতটুকু জেনেছি, শুনেছি, সেটা পরিবার থেকেই। যেহেতু উচ্চাঙ্গ সংগীতের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা, তো সেই প্রভাবটা থাকাই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে আমার গান শোনার পরিধিটাও ছিল অদ্ভূত। আমি ছোটবেলায় যেমন বনি এম, অ্যাবা শুনতাম, আবার একইসঙ্গে শুনতাম মান্না দে, কিশোর কুমারের গান। সেমি-ক্লাসিক্যাল শুনছি, আবার পিওর ক্লাসিক্যালও শুনছি। সেইসঙ্গে ফোক, হেভি মেটাল সবই শুনতাম। অনেক গান হয়তো শুনিনি, কিন্তু আমার গান শোনার পরিধিটা ছিল অনেক বড়। আরেকটা নেশা ছিল, সেটা হচ্ছে রাত জেগে রেডিও শোনা। প্রায় সাড়া রাত জেগে রেডিও শুনতাম। এক ফ্লাস্ক চা নিয়ে বারান্দায় বসতাম, আর টিউনিং করে করে বিভিন্ন দেশের রেডিও শুনতাম। বিশেষ করে রাশিয়ান, স্কটিশ, জার্মান মিউজিক শোনা হতো বেশি। তাই এটা বলতে পারি, আমার গানের মধ্যে যে ইস্টার্ন ক্লাসিক্যালের ছায়া, সেটা পরিবার থেকে তো বটেই, সেইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের ক্লাসিক্যাল শোনার ব্যাপারটাও রয়েছে।

  • সংগীত পরিচালনা …

সংগীত পরিচালনা অসম্ভব কঠিন একটা বিষয়। সেইসঙ্গে সংগীত পরিচালক হওয়াটাও। আমি মনে করি সংগীত পরিচালক তিনিই হতে পারেন, যিনি সংগীতের আগাগোড়া বোঝেন। আমি এখনো শিখছি। জানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমি কিছু কিছু বিষয় বুঝি। বলতে পারি, অনেকের চেয়ে একটু ভালোই বুঝি। যেমন একটা ইনস্ট্রুমেন্ট কিভাবে বাজায়, বা বাজানোর প্রক্রিয়াটা কী, সেটা আমার জানা আছে। আবার অনেকগুলো ইনস্ট্রুমেন্ট আমি নিজেও বাজাতে পারি। তাই হয়তো আমার ক্ষেত্রে সংগীত পরিচালনাটা অন্য অনেকের চেয়ে খানিকটা সহজ। তারপরও আমি মনে করি, এটা অনেক দায়িত্বপূর্ণ একটা জায়গা, হেলাফেলার নয়। ডিরেক্টর হওয়া বা একজন মিউজিক কম্পোজার হওয়া অনেক কঠিন একটা বিষয়। তাই সারাজীবন এটা শিখে যেতে চাই।

  • প্লেব্যাকে সম্পৃক্ততা

আমি প্লেব্যাক করেছি খুব কম। প্লেব্যাকে আমার হাতেখড়ি ইমন সাহার মাধ্যমে। ইমন আমার খুবই স্নেহভাজন। আমি ওর কাজ ভীষণ রকম পছন্দ করি। ওর হাত ধরেই প্লেব্যাকে আসা। শ্রদ্ধেয় চাষী নজরুল ইসলামের ‘সুভা’ ছবিতে ইমনের সুরে কবির বকুলের কথায় আমি একটা গান গেয়েছিলাম। চাষী চাচার খুব ইচ্ছে ছিল, আমি তার ছবিতে যেন একটা গান গাই। আর সেদিন ইমন যদি আমাকে নিয়ে না আসত, তাহলে আমার প্লেব্যাক করা হয়তো হতো না। এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ প্লেব্যাক করেছি ইমনের কারণে। তাই বলতে চাই, ‘ইমন, তোকে আমি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই ভাই, অনেক ধন্যবাদ, ভালোবাসা তোকে।’

  • পরবর্তী ও নতুন প্রজন্ম, যারা কাজ করছেন …

আমি যখন কাজ শুরু করেছিলাম, তখন অনেকেই ছিলেন। তাদের কথা এখন সেভাবে বলতে পারব না। আমার পরে যারা কাজ শুরু করেছিল, তাদের অনেকের কাজই ভালো লেগেছে। হাবিব, ফুয়াদ, অর্ণবের কাজ প্রচন্ড রকম ভালো লাগে। হৃদয়, অদিতের কাজ বেশ ভালো। প্রীতম দুর্দান্ত। ব্যান্ডের মধ্যে চিরকুট অসাধারণ। আরবোভাইরাস, নেমেসিস, শূন্য এদের কাজও আমার ভীষণ রকম ভালো লাগে। এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গা থেকে বেশ ভালো করছে। আর নতুনদের নিয়ে বলব, তাদের কাজ নিয়ে আমি আশাবাদী। তবে নতুনদের আমি বরাবরই বলব গানের কথা নিয়ে তাদের আরও আন্তরিক হতে হবে। গান যতই ভালো হোক, কথা যদি ভালো না হয়, সে গান বেশিদিন টিকবে না। আমি মনে করি, আমার মৃত্যুর পরও আমার গানটা টিকে থাকতে হবে। তাই গানের কথা, সুর ও আয়োজনে অনেক বেশি সিরিয়াস হতে হবে।

  • অনলাইনে গান প্রকাশ …

এই প্র্যাকটিসটাকে আমি অস্বীকার করছি না। এখন টেকনোলোজি পাল্টেছে, যুগ পাল্টাচ্ছে। মানুষের গান শোনার ধরণ প্রতিনিয়তই পাল্টে যাচ্ছে। এটাকে মেনে নিতেই হবে। তবে আমি মনে করি, আমাদের নীতিমালাজনিত কিছু সমস্যা আছে। সেই সমস্যাগুলো খুঁজে বের করা দরকার। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, এত চেষ্টা করেও আমরা রয়্যালিটি ইস্যুটার কোনো সমাধান করতে পারলাম না, যেটা সবচেয়ে জরুরি। আমি যে কথাটায় বেশি গুরুত্ব দিতে চাই সেটা হলো আমাদের সবারই একটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কথা বলা উচিত। বর্তমানে আমরা একেকজন একেক রকম কথা বলছি বলেই হয়তো, যারা নীতিমালা সংক্রান্ত আইনপ্রণেতা, তারাই দ্বন্দ্বে পড়ে যাচ্ছেন যে তারা আসলে কার কথা শুনবেন। তাই সবার স্বার্থে আমাদের সবারই একমত হওয়া দরকার। একই সুরে কথা বলা দরকার। না হলে আমাদের কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না।

  • সম্প্রতি নজরুলের গান …

নজরুলের একটা গান গাইবার চেষ্টা করেছি মাত্র। ‘মেঘের ডমরু’ গানটি শিখেছিলাম মায়ের কাছে। তখন আমার বয়স ১৩ কি ১৪। মা হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাকে গানটা তুলে দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনো মনে আছে। বেশ কয়েকদিন ধরে এত ঝড়-বৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছিল গানটা করা গেলে ভালোই হয়। রেকর্ড করে ফেললাম। রেকর্ডের পর মনে হলো গানটার ভিডিও হলে আরও ভালো হয়। তাহলে নাচটাও রাখা যাবে। কারণ গানটার সঙ্গে নাচটাও যুক্ত। আর নাচের কথা ভাবতেই নাদিয়ার কথা মনে হয়েছে। নাদিয়ার নাচ আমি খুব পছন্দ করি। এসব ভাবনা থেকেই গানটা করা, আর নজরুল জয়ন্তীর দু’দিন আগেই রিলিজ দেওয়া। রিলিজের পর দেখলাম লোকজন গালিগালাজ করেনি। বরং অভিনন্দিত করেছে। তাই ভাবছি আগামিতে নজরুল সংগীত নিয়ে আরও কাজ করব।

  • পছন্দের শিল্পী …

অনেক লম্বা। তাদের মধ্যে একেবারেই প্রথম দিকে সুবীর নন্দী, সামিনা চৌধুরী, পার্থ বড়ুয়া এদের গান ভীষণ ভালো লাগে। পছন্দ করি লাকি ভাইয়ের (লাকি আখন্দ) সুর। নকিব ভাই, পিলু ভাই, অবশ্যই আলাউদ্দিন আলী চাচা, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই, ফোয়াদ নাসের বাবু ভাই, ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, অনেক অনেক লম্বা আমার পছন্দের তালিকা। এদের গান শুনেই নিজেকে রিচার্জ করি।

  • নিজের প্রিয় গান …

আমার নিজের অনেকগুলো গানই আছে যেগুলো আমাকে ভীষণ ভালোলাগার অনুভূতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্জীব দা’র লেখা ‘আমার সন্তান’, এই গানটা বিদেশি সুর অবলম্বনে করা। প্রথম অ্যালবামের ‘তুমি চক্ষু খুলে দেখ’ এবং ‘রানি ঘুমায়’ এ দু’টো গানও আছে। ‘বৃষ্টি পড়ে’ গানটার অ্যারেজমেন্ট নিয়ে মাঝেমধ্যে ভাবি। আর বিস্ময় লাগে ‘পরী’ গানটা নিয়ে। কখনোই আশা করিনি যে গানটা এতটা জনপ্রিয়তা পাবে। এ রকম অনেক গান আছে যেগুলো আমাকে ভাবায়।

  • প্রাপ্তি …

শ্রোতাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি, জানি না। তবে নিজের প্রাপ্তি অনেক। মানুষের যে ভালোবাসা-সমাদর পেয়েছি, এর চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি হতেই পারে না। এখন যদি লাভ-লোকসানের হিসাব করতে চাই কী পেলাম, কী হারালাম তাহলে বলব আমার হারানোর কিছু নেই, শুধু পেয়েছি। শ্রোতাদের যে ভালোবাসা, একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না। অনেক, অনেক পেয়েছি।

  • মধুর স্মৃতি …

সবই তো মধুর স্মৃতি। এই যে মানুষের ভালোবাসা পাই, বড়রা স্নেহ করেন, ছোটদের সম্মান শ্রদ্ধা, বন্ধুদের ভালোবাসা এর থেকে মধুর আর কী হতে পারে!

  • আক্ষেপ …

একটাই… আমি সঠিকভাবে শিখতে পারিনি। এখন খুবই খেদ হয়, যদি আগে থেকেই সঠিকভাবে শিখতে পারতাম। গানটাকে যদি আরেকটু শিখে গাইতাম, হয়তো আরও ভালো গাইতে পারতাম। এটা আমার কাছে অনেক বড় একটা আক্ষেপ।

  • মিউজিকের বাইরে যেসব ভালো লাগা …

সংগীতের বাইরে আমার বেশকিছু ভালোলাগা আছে। কাছের মানুষেরা এগুলো জানেন, বাইরের কেউ খুব একটা দেখেননি। আমি খুব গ্যাজেট পছন্দ করি। ইলেকট্রনিক্স আইটেমের প্রতি দুর্বলতা আছে। ড্রোন ওড়াতে ভীষণ ভালোবাসি। আরেকটা পছন্দ ভিডিও গেমস, যদিও অনেকদিন হলো খেলার সুযোগ পাচ্ছি না। অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের প্রতি আকর্ষণ দুর্বার। এটা নিয়ে আমি অনেক ভাবি। এই তো…

  • অবসর ভাবনা …

অবসর নিয়ে ভাবতে চাই না। অবসরে যাব, ভাবতেই পারি না। আমার খুব একান্ত একটা চাওয়া আছে, সেটা হলো আমি যেন কাজ করতে করতেই দেহত্যাগ করতে পারি। অথর্ব, অসুস্থ হয়ে থাকা, এটা চাই না। কর্মক্ষম থাকতে থাকতেই যেন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারি। এমন যেন কখনোই না হয় যে আমি কারও জীবনের বোঝা হয়ে গেলাম। ইম্পসিবল, আমি এটা কখনোই মেনে নিতে পারব না।

  • পরিশেষে…

অনেক সময় নিজের মধ্যে ভাবনা আসে আমি কী করতে চাই? কিছুদিন আগে একটা কথা পড়লাম, কার কথা ছিল মনে পড়ছে না। কথাটা ছিল ‘মানুষের জীবন তখনই সার্থক হয়, যখন সে জানতে পারে তার জন্মটা কেন হয়েছিল। যে মানুষ জীবনেও জানতে পারে না তার জন্মের কারণ কী, প্রকৃতি তাকে কেন পৃথিবীতে নিয়ে এলো, তাহলে তার জন্মই ব্যর্থ।’ কথাটা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছি, আমার জন্মই হয়েছে মিউজিক করার জন্য। আমি হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতাম। সেটা করিনি। এই পৃথিবীতে আমি মিউজিক করার জন্যই এসেছি। গানটাকে ভালোবাসি, গান করতে চাই। সেইসঙ্গে মনে হয়, শুধুই গান করলেই তো হবে না, আরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা মানুষকে শুধু বিনোদন দেই, তা কিন্তু নয়। সমাজের প্রতিও একটা দায়িত্ব রয়েছে। সেটা লোক দেখানো বা ফেসবুকে নয়। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে বলতে পারা, হ্যাঁ আমি এটা করতে পেরেছি। তো সেই ভাবনা থেকেই আমার একটা প্রচন্ড চাওয়া আমি যেন একটা স্কুল করতে পারি। বাচ্চাদের নিয়ে একটা স্কুল করতে চাই, যেখানে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই মিউজিক শিখবে, গানের মধ্যেই বেড়ে উঠবে। আমি চাই এ কাজটা হোক। যদি করতে পারি, আমার বেঁচে থাকাটা সার্থক হবে। যদি না পারি, অনেক বড় একটা খেদ থেকে যাবে আমার জীবনে…

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন