বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

যে জীবন গল্পের

মে ৩০, ২০১৯ | ৯:৩২ অপরাহ্ণ

মোজাফ্ফর হোসেন

ভোরে সময়মতো স্টেশনে পৌঁছানো গেল। ট্রেন ছাড়তে দেরি হলো না। ট্রেনে উঠার আগ পর্যন্ত মানুষ একে অন্যকে সন্দেহ করছিল বলে মনে হলো। যেই চলতে শুরু করল অমনি সকলে বিশ্বস্ত হয়ে উঠল। মানুষ উন্মুক্ত ময়দানে একরকম আর চার দেয়ালের ভিতর অন্যরকম। ঘরই মানুষকে বেঁধে রেখেছে। আমার সামনে তিনটি চেয়ারে তিনজন বসেছেন। আমার কাছাকাছি বয়সী নারী-পুরুষ। স্বামী স্ত্রী হতে পারে। বাংলাদেশে চল্লিশোর্ধ্ব প্রেমিক-প্রেমিকা পথেঘাটে এভাবে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। অন্যজন বৃদ্ধ। বয়স বাবার চেয়ে কম হবে। উনার সঙ্গে আর কেউ আছে বলে মনে হলো না। এদিকে আমরা দুজন। আমার ডান পাশের চেয়ারটা খালি। আমরা টিকিট পেয়েছি কষ্ট করে, তার মানে অবিক্রিত না। হয়ত ট্রেন মিস করেছে অথবা সামনের স্টেশনে উঠবে। বৃদ্ধ লোকটি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার ব্যাগটি দেখো তো বাবা। বাথরুম থেকে আসছি। কেউ যেন খালি ভেবে বসে না পড়ে।

বিজ্ঞাপন

ইন্টারসিটিতে টিকিট ছাড়া কেউ কারও সিটে বসতে পারবে না। আপনি নিশ্চিন্তে যান। আমার মুখোমুখি বসা লোকটি বললেন।
যে সিটিই হোক, দেশে নিয়ম বলে কিছু আছে নাকি! জোর করে বসে পড়লে এই বয়সে আর উঠাতে পারব না। একাত্তরে যুদ্ধ করে দেশ বাঁচিয়েছি, আর এখন একটা সিট রক্ষা করতে পারি না। ভয় করে। সমস্যা আমার বয়সের না দেশের বুঝি না। সব বয়সের উপর চালিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বলে বৃদ্ধলোকটি ট্রেনের সঙ্গে তাল দিয়ে দুলতে দুলতে বিপরীত দিকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর চলেও এলেন।
বাথরুমের লকটা আটকে গেছে। খুলতে পারলাম না। সমস্যা আমার বয়সের না লকটার বুঝতে পারলাম না। বৃদ্ধ বসতে বসতে বলেন।
ওপাশেরটা দেখতে পারেন। আপনি চাইলে আমি খুলে দিয়ে আসতে পারি। সামনের লোকটি বলেন।
বসে যখন পড়েছি, আরও কিছুটা সময় ধরে রাখি। এমনিতেও বেশিক্ষণ ধরে থাকতে পারব না। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, বলল বয়সের সমস্যা। আমার মনে হয় ঠিক বলেননি। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বয়স্ক মানুষ দেখলেই যে কোনো সমস্যা ডাক্তাররা বয়সের ওপর চাপিয়ে দেন। এটা ঠিক না। তিনি বলেন।
আপনার বাবা? বৃদ্ধ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন।

কিছুক্ষণের জন্য বাবার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাবা চুপচাপ বসে আছেন। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? আমি জানতে চাই বাবার কাছে। তিনি শোনেন বলে মনে হয় না। আমি অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
কানে কম শোনেন নাকি? বৃদ্ধ লোকটি বলেন। আমার আবার এই যন্ত্রটা ঠিক আছে। তিনি যোগ করেন। তার আগ বাড়িয়ে কথা বলা দেখে পাশের নারীপুরুষ বিরক্ত হন বোঝা যায়। বৃদ্ধও বুঝতে পারেন, তাই হয়ত বলেন, আপনাদের বয়সে এভাবে মুরব্বিদের মতো চুপচাপ বসে থাকা একদম মানায় না। দুজন দুজনার হাত ধরুন, প্রাণ খুলে হাসুন। ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদযাপন করুন জীবনকে। আপনারা এভাবে গোমড়া মুখে বসে থাকবেন বলেই কি সেদিন যুদ্ধ করেছিলাম? বৃদ্ধ বলেন। নারী-পুরুষ দুজনে জোর করে হাসার চেষ্টা করেন। মুহূর্তেই তারা আগের মতো নিজেদের ভেতর গুটিয়ে যান।
আপনি যুদ্ধ করেছিলেন? একাত্তরে? আমি বৃদ্ধের কাছে জানতে চাই।
কে করেনি যুদ্ধ? একাত্তরের আগে যাদের জন্ম প্রত্যেকে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের সময় যে শিশুর জন্ম হয় তাকেও যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়েছে। কেঁদে কেঁদে মায়ের বুকের দুধ পাইনি। হয়ত মা মরে পড়ে আছে পাশে। কেউ ছেলেটিকে তুলে নিয়ে গেছে, কিংবা তুলে নিয়ে গেছে কিনা আমরা নিশ্চিত না। ঔষুধ পায়নি অসুস্থ হলে। ঘুমাতে পারেনি ঘুম পেলেও। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সব বয়সী মানুষ। বৃদ্ধ বলে থামেন। একটু দম নিয়ে বলেন, যে লোকটা স্বাধীনতা চায়নি সেও যুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যুদ্ধ।
আপনি কোন পক্ষে ছিলেন? আমি মুখ ফসকে প্রশ্নটা করে ফেলি। লোকটি হো হো করে হাসতে শুরু করেন। আমি কিছুটা সামলে নিয়ে বলি, আপনি মুুক্তিযোদ্ধা জেনে খুব ভালো লাগছে।
কেন? লোকটি হাসি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন।
দেশের বাইরে থাকি। যুদ্ধের কথা জানলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি কখনো। আমি বলি।
তাই তো বলি। দেশের মানুষ তো আর এখন মুক্তিযোদ্ধা শুনলে খুশি হয় না। ভাবে গরীব মানুষ, যুদ্ধ একটা হাতের কাছে পেয়েছে, করেছে। এ আর এমন কী। আজকাল দেশের মানুষ তো খুশি হওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এই যে ট্রেনের মধ্যে দেখেন, মানুষজন কথা বলছে হয় রেগে নয়ত বিষাদে। আপনার বাবাকে দেখুন, দার্শনিকের মতো প্রকৃতি দেখছেন। বাঙালি কিন্তু মোটেও প্রকৃতিপ্রেমী না। গ্রামে প্রত্যেকের বাড়িতে কুলগাছ দেখবেন, ফুলগাছ পাবেন না। অথচ ট্রেনে উঠলে এমন ভাব দেখায় যেন প্রকৃতি খুব দেখার জিনিস। আমার এক বন্ধু বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে কাজ করে। ও বলে, দেশের মানুষকে প্রকৃতিপ্রেমী করতে চাইলে ট্রেনভ্রমণ বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। নিজে বন নিয়ে কাজ করলেও ঠিকই বাড়ি এসে বুড়ো গাছগুলো কেটে কেটে ফার্নিচার বানিয়ে নিয়ে গেল। নিজে একটা গাছও লাগায়নি। বাপদাদার লাগান গাছগুলো শেষ করল। সে আবার বনরক্ষায় কাজ করে জাতীয় পদক পেয়েছে। বলে লোকটি হাসে।

ট্রেন এয়ারপোর্ট স্টেশন ছেড়ে এসেছে কখন টের পাইনি। বাবা বসে আছেন নিশ্চুপ। জানালার পাশে বসলেও দৃষ্টি তার ভেতরে। তাকিয়ে আছেন কিন্তু কোনো কিছু দেখছেন বলে মনে হল না। একসময় বাবা বই পড়তেন। বাবার বুক সেলফ থেকে অনেক বই আমি সরিয়ে পড়েছি। মনে পড়ে সাফারিং অব ইয়ং ওয়ের্দারের কথা। গ্যোয়েটে পড়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু শিরোনামের কারণে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কৈশোরে সেই প্রথম আমি ওয়ের্দারের মতো বিষণœ প্রেমিক হতে চেয়েছি। হাতের কাছে তেমন কোনো বিবাহিত নারী ছিল না, যাকে প্রেম নিবেদন করে প্রেমে পরাজিত হতে পারি। পাশের বাড়িতে একজন থাকত বটে। সুন্দরী, অল্প বয়সে দু বাচ্চার মা। পিঠাপিঠি সন্তান। আমি যাতায়াত বাড়িয়ে দিলাম। অকারণে খোঁজখবর নিতাম। বাচ্চাদের চকলেট কিনে দিতাম। একদিন মহিলাকে উলঙ্গ দেখে ফেলি। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনি। ভেবেছিলাম বয়স হয়নি নারীর নগ্নতা উপভোগ করার। এর পরের বছর যখন আমি একই বাসায় অন্য একজন নারীকে নগ্ন দেখি। ততদিনে এক বন্ধুর বাবার সংগ্রহ থেকে স্কুল ব্যাগে করে চুরি করে এনে ললিতা ও সান্স অ্যান্ড লাভারস পড়া হয়ে গেছে। এবার সেই মহিলাই আমাকে ডেকে নিয়ে আমার সামনে কাপড় খুলে দাঁড়িয়েছিলেন। বয়স হয়েছে কিন্তু সন্তান হয়নি। আমি ভাবী বলে ডাকতাম। নগ্ন হয়ে বললেন, আজ থেকে আন্টি বলবি, আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছেলের বয়সী কারও সাথে শুতে। আমি সেই আন্টির নগ্নতা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারিনি। আমার যৌনতার জ্ঞান হয় কিছুটা বই পড়ে, কিছুটা মায়ের কাছ থেকে। মায়ের ঘরে আড়িপাতার অভ্যাস আমার কবে থেকে হয়েছে আমি মনে করতে পারি না। এক লোক আসত বাবার বয়সী। মা দরজা আটকে দিতেন। কৌতুহল থেকেই দরজায় গোপন ফুটো আবিষ্কার করা। তখনও জানতাম না সামান্য একটা ফুটো আমার জীবনটা ওলোপালোট করে দেবে। সেই ফুটোতে চোখ রাখতে রাখতে বুঝতে শিখেছি যৌনতা, নারীর নগ্নতা। সেদিন আন্টির সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম নগ্ন নারীর শরীর দেখে ভয় পাই আমি। সহ্য করতে পারি না। আমার মায়ের শরীরটা ভেসে ওঠে। ক্ষতবিক্ষত শরীর। মা চিৎকার দিয়ে বলছেন, আরও মারো। মেরে ফেলো আমাকে। লোকটি তার কোমর থেকে বেল্ট খুলে আমার মায়ের নগ্ন শরীরে সপাৎ সপাৎ করে আঘাত করে যাচ্ছে। মায়ের উদোম পাছায় ফর্সা পিঠে পুরনো দাগগুলো জীবিত হয়ে উঠছে চোখের সামনে। আমি সেই শরীরটা দিনের আলোয় মিতা আন্টির নগ্নতার উপর দেখতে চেয়ে চমকে উঠি। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, দুধ খাবি? খা। টেপ একটা। একটা খা। আন্টি নিজেই একটা দুধের বোটা আমার মুখে ঠেসে দেয়। আমি তার শক্তির সঙ্গে পারি না। অন্যটা ধরতে গিয়ে পাই না। মায়ের একটা স্তন অসম্পূর্ণ। শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতটা আমার হাতে বাঁধে। খসখস করে। বমি বমি ভাব আসে। আন্টির বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি আপ্রাণ।
আমাকে ছেড়ে দাও মা। আমি বলে ফেলি। আন্টি ছেড়ে দেন। বলেন, মা বলতে নেই। আন্টি বল। আমি তখন এক ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। দৌড়াতে থাকি রাস্তা ধরে। মনে হয় পেছনে কেউ তাড়িয়ে আসছে। আমার দৌড় আর থামে না। আমাদের বাড়ি, মহল্লা ছেড়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কতদূর সেদিন গেছি আজ আর মনে পড়ে না।
তুমি হাফাচ্ছো মনে হচ্ছে? বৃদ্ধ লোকটি বলেন। অক্সিজেনের সমস্যা হচ্ছে? তিনি জানতে চান।

বাবা এবার চোখ খুললেন। দিনে ভ্রমণটা তার জন্য সুবিধার হচ্ছে না। রাতেই আসতে চেয়েছিলাম। মা বললেন দেশের অবস্থা ভালো না। দিনেই যা। দেশ নিয়ে মায়ের মতো নেতিবাচক ধারণা দ্বারা আমি নিজেও আক্রান্ত। কিন্তু এবার বাইরে এসে ভালোই লাগছে। আমরা যারা সংবাদপত্র পড়ে আর টেলিভিশনের খবর শুনে দেশকে চিনি তারা অসম্পূর্ণ বাংলাদেশকে জানি। মিডিয়া একটা নদীর সব ময়লাকে জড় করে একসঙ্গে দেখায়। স্বচ্ছ জলও থাকে নদীতে। নদীকে চিনতে হলে নৌকা নিয়ে জলে নামতে হবে। এবার ফিরে এসে মাকে সেটা বোঝাবো।

বিজ্ঞাপন

হঠাৎ করেই পাশের বগি থেকে কান্নার আওয়াজ আসে। সঙ্গে সঙ্গে নারীকণ্ঠের চিৎকার। ট্রেন চলতে থাকে। বৃদ্ধ লোকটা খোঁজ নিতে উঠে যান। লোকটা এই বয়সেও বেশ উৎসাহী। কিছু কিছু মানুষ সব কিছুতেই উৎসাহ খুঁজে পান। তাদের দেখে খুব হিংসা হয় আমার। দিগন্তজোড়া মাঠ দুপাশে। থেকে থেকে জলাভূমি চোখে পড়ে। আমি কোনো উৎসাহ পাই না দেখাতে। বৃদ্ধ ফিরে আসেন। বলেন, বাইরে থেকে কেউ পাথর মেরেছে। কাচ ভেঙে কয়েকজন আহত। একটা শিশুর চোখটা গেছে বলে মনে হলো। মা কাঁদছে। তাও ভালো কেউ মরে নি। লোকটা একরকম স্বস্তি নিয়ে বসেন।
এর আগেও এমন হয়েছে নাকি? আমি জানতে চাই।
প্রায়ই হয়। এদেশে গুম আতঙ্ক, খুন আতঙ্ক, ধর্ষণ আতঙ্ক এমন অনেক আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ আতঙ্ক। আগে একজন মারাও গেছে। সামনের লোকটি উত্তর দেয়। একটা লোকালয়ের ভেতর ঢুকে ট্রেনটা থামে। আহতদের চিকিৎসার জন্য নামিয়ে নেয়া হয়।
কি কারণে পাথর ছুঁড়ে মারে? কারা মারে? আমি জানতে চাই না। কোনো কোনো প্রশ্ন কখনোই কোনো উত্তর খোঁজে না।
মাঠে কাজ করতে আসা ছেলে-চোকরাদের কাজ হবে। আগে রাতের অন্ধকারে মারত, এখন দেখছি দিনেও। ওপাশ থেকে অন্য একজন বলে। তার মুখটা দেখা যায় না, কথাটা শুনি।
ট্রেনে চড়াও নিরাপদ না। বৃদ্ধ লোকটি বলেন। নিরাপত্তার খুব অভাব এখানে। ট্রেন চলতে শুরু করে। এদেশে দিনে বিশজন করে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, ভাবতে পারেন? লোকটি আমাকে বলেন। আমি কি বলব বুঝতে পারি না। দেশের অনেক বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে পারি না। নিজের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন জাগে। কানাডাতেও এমন হয়। ওখানকার অনেক বিষয়ে আমাকে চুপ থাকতে হয়। লোকজন প্রশ্ন করে কিন্তু আমার মুখ থেকে কোনো উত্তর আশা করে না।

এভাবে বছর পাঁচেক আগে একবার ঝটিকা সফরে দেশে এসেছিলাম। মায়ের কথা রাখতে। মা যখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মেয়েটিকে একবার দেখে যা। বিয়ে না করতে চাইলে আমি জোর করব না। মায়ের বিশ্বাস ছিল ওমন শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে দেখলে আমি না করতে পারব না। আমি যখন না করে দিলাম, মা আর কোনো কথা বলতে পারেননি। খুব ভেঙে পড়েছিলেন। যতটা না কান্নাকাটিতে সেবার দেশে এসেছিলাম তার চেয়ে অধিক কাঁদিয়ে দেশ ছাড়ি। এবার আর মা আসতে বলেননি। নিজের দরকারে এসেছি। এসে বুঝেছি বাবা-মা দুজনেই ভালো না থাকতে থাকতে ভুলে গেছেন তারা এখনো বেঁচে আছেন। ঘরের ভেতর ছায়ার মতো থাকেন, নিস্প্রাণ তাদের চলাচল। খসখস করে মাঝেমধ্যে শব্দ হয় শুকনো পাতা মাটি ছুঁয়ে নড়াচড়ার মতো। একবার বাবা বলেওছিলেন, আগে কোনো একটা সময়, বারান্দায় দেবদারুর গাছের অন্ধকারে দৃষ্টি চুবিয়েÑ তুই এভাবে আসিস কেমন করে এখানে? তুইও কি তবে মরে গেছিস?
আমরা কেউ মৃত নই বাবা, আমি বাবাকে বলি।
তবে যে বলে বাবা থামেন।
কি বলতে চাও। থামলে কেন? বাবাকে জিজ্ঞাসা করি।
ভুলে গেলাম। কথা মনে হওয়ার আগেই ভুলে যাই। বেঁচে থাকতে এমনটা হত না। বাবা বলেন। তাকে সেদিন বিশ্বাস করাতে পারিনি আমরা জীবিত।

বৃষ্টি পড়ছে মৃদুভাবে। জুলাই মাস, এ সময় এখানে এমন বৃষ্টি অস্বাভাবিক না। বৃষ্টি ভালোলাগে আমার, কিন্তু এ নিয়ে কোনো আদিখ্যেতা নেই। নিতান্তই ছাতা না থাকার কারণে দুয়েকবার ভিজেছি। ভালোলাগার চেয়ে বিরক্ত হয়েছি বেশি। আজ বৃষ্টি দেখে কেমন লাগছে বলতে পারব না। প্রায়ই আমি আমার অনুভূতির কথা বলতে পারি না। প্রকৃতিকে কোনো কোনো কবি নারীর সঙ্গে তুলনা করেন। এই কারণে কিনা জানি না, প্রকৃতি খুব বেশি আপন হয়নি আমার। সাহিত্যে এখন রোমান্টিকসদের দিন শেষ। আমি ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো কবিদের পড়ি না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন, প্রকৃতিবাদী ছিলেন না। প্রকৃতির বিনাশ তখনও শুরু হয়নি বলে এসব ‘বাদী’ হওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এখন অনেক আধুনিক লেখক নিজেকে প্রকৃতিবাদী হিসেবে পরিচিত করান। যেমন কানাডাতে মার্গারেট অ্যাটউড আছেন। আমার ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে তার ক্লাস পেয়েছি। প্রকৃতি হোক মানুষ হোকÑসাহিত্যের কমিটমেন্ট আসলে কোথায়? আমি প্রশ্ন করেছিলাম। সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছিলেন, তুমি এশিয়া থেকে এসেছ? আমি হ্যাঁ বললে তিনি আর কিছু বলেননি। বের হওয়ার সময় শুধু বললেন, প্রকৃতি আর মানুষ কি আলাদা? আমি কিছু বলিনি।

ট্রেনের বাইরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনটা বেয়াড়া হয়ে ওঠে। চিন্তা একজায়গায় থির থাকে না। দূরের সবকিছু এখন ঝাপসা দেখাচ্ছে। অস্পষ্ট দেখাতে আমার আগ্রহ বেশি। এতে নিজের মতো করে নির্মাণ করে নেওয়া যায় বাস্তবতা। বাংলাদেশে এসে এবার কিছুটা কৌশলী হয়ে সবকিছু দেখতে হচ্ছে যেন দেখার ফাঁক থেকে যায়। সবকিছু জানা হলে লিখতে পারব না। লেখকরা সবজান্তা, জাতীর ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হবেন, এসব চিন্তা এখন বাতিল। বালজাকদের মতো বাস্তববাদী হওয়ার সময় এখন না। এখন মিডিয়া আছে টকশোর বক্তারা আছেন তাৎক্ষণিক জাতীয় দায়িত্ব পালনে। আধুনিক লেখকদের সবকিছু জানতে হবে এরপর ভুলেও যেতে হবে। পাঠককে তারা এই জানা এবং অজানার মাঝখানে নিয়ে যাবেন। ঘটনা সব জানতে হবে এবং লেখার সময় সেটার সবচেয়ে কম ব্যবহার করতে হবে। আমাকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে এক শিক্ষক বলেছিলেন। অ্যাটউড না, অন্য একজন। সাহিত্যের পাঠকও এখন তৈরি। আমি যদি লিখি খুব শীতে আমি ঘেমে যাই। পাঠক বইটি ছুঁড়ে ফেলে দেবেন না। তাদের অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়েছে। তারা আর প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণের জন্য উপন্যাস পড়েন না। এজন্য মোটিভেশনাল বইগুলো আছে। ইন্টারনেট গুগল সার্চ আছে। জীবন এখন সবখানেই এত তরল, ছড়ানো যে কোনো দায়বদ্ধতা এখান থেকে তৈরি করা চলে না। ঘটনার বিচ্ছিন্নতা আর সম্ভাব্যতা লেখককে অনুসন্ধান করতে হবে। কথাগুলো আমি নিজেকেই নিজে বলি যেন এই সমস্ত আবেশ থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে পারি।

একসময় পারিনি। ক্ষতি জীবনে যা হওয়ার হয়েছে। একটা ছোট্ট ছিদ্রে চোখ আঁটকে গেছে আজীবনের জন্য। দুটো মানুষ, নগ্ন। একজন নারী, একজন পুরুষ। একজন অচ্যাচার করে সুখ পাচ্ছে, অন্যজন অত্যাচারিত হয়ে। সঙ্গমসুখে নয় আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে দুজনে। এটাই  কি তবে নারী পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতা? এভাবেই কি জন্ম হয়েছে আমার? আমি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম সেদিন অন্ধকার আকাশে। উত্তর পাইনি। আজ আর উত্তর না খুঁজে সেই ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নকে খুঁজি। কখনো কখনো মানুষ প্রশ্ন খুঁজে বেড়ায়, উত্তর তার ভেতরেই থাকে। প্রশ্ন হারিয়ে ফেলার বেদনা সেদিনের সেই কিশোর বোঝে। প্রশ্ন হারিয়ে ফেলার কারণে সে জানতে পারেনি উত্তরটা পেল কিনা।

একদিন আমি ছিদ্র ছেড়ে ঢুকে পড়েছিলাম দৃশ্যে। মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে। লোকটি ভেতরে আসে। মা বাথরুম থেকে বের হন। মায়ের কাপড় খোলার শব্দ পাই। এই শব্দটা ছিদ্রের ওপাশ থেকে পাওয়া যায় না। লোকটি পেটিকোটের ফিতা খুলে মায়ের হাতদুটো পেছনে বেঁধে ফেলেন। মুখে টেপ মেরে দেন। আমি টের পাই একটি খুনের সাক্ষী হতে যাচ্ছি এই দিন এবং রাতের মাঝখানে আটকে যাওয়া সময়ে। মা কষ্টে-বেদনায় ছটফট করতে থাকেন। লোকটি বসে থাকেন। চুপ করে বসে থাকেন। একটা দৃশ্যের রচয়িতা সে। পরের দৃশ্য ভাবতে থাকেন। মা তখন পা ফাক করে দেন। লোকটির হাতে কি যেন আছে। শক্ত কিছু। আমি ভালো করে তাকাতে গিয়ে চোখ আটকে যায় ছিদ্রে। ছিদ্রে ওপাশে চোখ। আমি আছি ওপাশেও। আমি একইসঙ্গে সেদিন দু জায়গাতেই ছিলাম। আমরা কেউই আর বিছানার দিকে তাকাইনি। ছিদ্রের ওপাশ থেকে এপাশ, তাকিয়ে ছিলাম নিজের দিকে। তখনই আমার কাশি পেল। ঘাবড়ে গেলে গলাটা শুকিয়ে যায়। মুখ এঁটে ধরে থাকলাম। একবার মনে হলো বুকপকেটটা ফাক করে কাশির শব্দটা জমা রাখি। আগে থেকে চেষ্টা করে দেখিনি বলে সাহস হলো না। খাট থেকে সামান্য দূরে মেঝেতে একটা বোতল পড়ে। সঙ্গে লোকটার প্যান্ট। ম্যানিব্যাগটা বেরিয়ে আছে। হাতটা বাড়াতেই হলো। মৃদু অন্ধকারে কেউ তাকালে চোখে পড়বে। তবু ঝুঁকিটা নিতে হল। মাথাটা বের করেছি তখনই খাট থেকে একটা হাত নেমে এলো নিচে। আমার মাথার উপর দিয়ে বোতলটা তুলে নিল। কয়েক ঢোক খেয়ে আমার হাতের কাছে রাখল। আমি তুলে নিলাম। শূন্য। আমার হাত কি দেখে ফেলেছে সেই হাতের চোখজোড়া? কে? মা না লোকটা? হাত দেখে কি আমাকে চেনা যায়? হাত কি আমার অস্তিত্বের অংশ? এইসব প্রশ্ন নিয়ে বহুরাত ঘুমাতে পারিনি।

কিছুদিন পর স্কুল থেকে ফিরে দেখি বাবা-মায়ের তর্ক হচ্ছে। ঢাকায় তখন স্বৈরাচার সরকার পতনের আন্দোলন তুঙ্গে। ছাত্ররা মিছিল করছে, ধরা পড়ছে।
ওকে কানাডায় পাঠিয়ে দাও। আমার পরিচিত কেউ কেউ আছে ওখানে। বাবা বলেন। আমি চাই না ওর জীবনটা এভাবে নষ্ট হোক।
ওকে পাঠালে আমি একা বাঁচব কেমন করে? মা প্রশ্ন করেন।
তুমি বেঁচে আছ? আমি তুমি কেউ বেঁচে নেই। আমরা সেদিনই মরে গেছি। সেদিন বলতে বাবা কোনদিন বোঝাচ্ছেন আমি বুঝতে পারিনি। আমার চিন্তা তখন অন্যখানে। বাবা কি তবে সেদিন মায়ের ঘরে আমার উপস্থিতি টের পেয়েছেন? তিনি কি আমার সেই হাত দেখে ফেলেছেন? ছিদ্রের ওপাশে তবে সত্যি সত্যি কারও চোখ ছিল? আবার মনে হয়, বাবা তো জগতের কোনো খোঁজখবর রাখেন না। টেবিলে কিছু বই পড়ে থাকে, তাও ক্লাসিক। আজকের পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। বাবার কোনো ছিদ্রে চোখ রাখার মানুষ না। তার ভেতর কোনো অনুসন্ধানের তাড়া নেই। মাকে রাজি করাতে পারলেন কিনা বুঝলাম না। আমার উপস্থিতির কারণে তাদের আলোচনা আর এগুলো না।
বাবা সেদিন রাতে আমাকে ডেকেছিলেন।
বাবা বিছানার এক কোণায় বসে, অন্যকোণায় বসলাম আমি। তুমি বই পড়ো, এজন্য তোমাকে পছন্দ করি। কিন্তু তুমি অন্যকিছু পড়ো এই কারণে তোমাকে অপছন্দ করি। বাবা বলেন। বাবার কথা শুনে চমকে উঠি। স্টেশন থেকে আমার বন্ধুরা কামসূত্রের বই আনে। সচিত্র। সাদা কালো। আমরা পালা করে পড়ি। ছবি দেখি। বিছানার তলে সবসময় একটা না একটা থাকে। বাবার এসব জানার কথা না। আমাদের তিনজনের পরিবারে সকলের একটা করে গোপন জীবন ছিলÑ আমরা প্রত্যেকে মনে করতাম কেউ তার খোঁজ রাখে না। কিন্তু সবার সবারটা জানে বলে সেদিন মনে হয়েছে। যেমন বাবার একটা গোপন কাজ ছিল। আমি প্রায়ই পর্দার আড়াল থেকে দেখতাম। তিনি নগ্ন হয়ে বিছানায় বসে থাকতেন। নিজের যৌনাঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকতেন একভাবে। হাত দিলে ঘষাঘষি করলে অন্যকিছু ভাবতে পারতাম। কিন্তু হাত তিনি দিতেন না, তাকিয়ে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঘর অন্ধকার করে বাবার এভাবে যৌনাঙ্গের দিকে তাকিয়ে বসে থাকার কোনো কারণ আমি উদঘাটন করতে পারিনি। আজও। কিন্তু জেনেছি তারও কিছু গোপনীয়তা আছে।
তোমাকে দেশের বাইরে পাঠানো হবে। পড়াশুনা করবে। প্রয়োজনে থেকেও যাবে। বাবা আমাকে বলেন। আমি চাই তোমার মা তোমার মত চাইলে তুমি আপত্তি করবে না। তোমার কাছে আর কিছু কখনোই চাইব না আমি। বাবা বলেন।

সেই বাবা এখন আমার পাশে বসা। সত্যিই আর কিছু আমার কাছে চাননি তিনি। শুরুতে বিদেশ থেকে বহুবার ফোন করে এটাসেটা পাঠাতে চেয়েছি। বাবা ক্লাসিক পছন্দ করতেন, আমি চেয়েছি পাঠাতে। তিনি চাননি কোনো কিছুই। একবার এসে এক কপি জেমস জয়েস রেখে গিয়েছিলাম তার মাথায় কাছে। বইটা আগেও ছিল। আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এবার এসে দেখি সেভাবেই পড়ে আছে বিছানায়। অনেককিছু তিনি আর এখন ছুঁয়ে দেখেন না। একটা পারফিউম দিয়েছিলাম। নিনা রিচি ব্রান্ডের। দেখি বাবা ঘরের একটি একটি ছিদ্রে টানা স্প্রে করে যাচ্ছেন। এক বসাতেই শেষ করে উঠেছেন। এই কারণে বিদেশ থেকে আর কিছু এনে দিইনি।

বাবার কারণে সেদিন দেশ ছেড়েছিলাম। থাকলে কি হতো, কেমন থাকতাম আমি, জানি না। তবে ওখানে গিয়ে যে খারাপ নেই সেকথা সত্য। যে সম্পর্কে ওখানে জড়িয়ে গেছি, এখানে থাকলে সেটা হত না। বাংলাদেশের সমাজ মানতে পারত না। আমিও নিজেও মানতাম কিনা জানি না। পরিস্থিতি মানুষকে নতুনভাবে গড়তে সাহায্য করে। কখনো কখনো পুরো বিশ্বাসটাই বদলে যায়।

একটু পানি হবে? এই প্রথম কথা বললেন বাবা। আমি আনমনা থাকায় ঠিকমতো শুনতে পারিনি। আপনার বাবা জল খাবেনÑ বলে সামনে বসা নারীটি তার নিজের বোতলটা খুলে বাবাকে পানি খাওয়ালেন।
মেয়েরা মায়ের জাত। বৃদ্ধ লোকটি বললেন।
আমি মেয়েটিকে ধন্যবাদ দিলাম। তিনি লজ্জা পেলেন বলে মনে হলো।
বিদেশিদের এই এক সমস্যা। সবকিছুকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করে দেয়। কিছু কিছু কাজের জন্য ধন্যবাদ হয় না। চোখে মুখে অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়। এটা বাঙালি ভালো জানে। ধন্যবাদ বলার অভ্যাস এই কারণে আজও আমাদের তৈরি হলো না। বৃদ্ধ লোকটি আবার কথা বলা শুরু করলেন। আমি উঠলাম। অনেকক্ষণ বসে থাকাতে ক্লান্তি এসে পড়েছিল। দু’বগির মাঝখানে কিছুটা খোলা জায়গা, সেখানে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট ধরাতে যাই। কিছুতেই লাইটার জ্বলে না। একবার জ্বলে তো বাতাসে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। অনেকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। না ধরানো সিগারেট আঙুলের ফাঁকে। এভাবে হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেদিনও।

বিদেশ যাওয়ার আগে আমার মায়ের নগ্ন শরীর থেকে নিজেকে বের করতে হত। কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। একটা বুদ্ধি এলো মাথায়। বাড়িতে তখন কাজ করত আকলির মা। আকলি আর আমি সমবয়সী। আকলি দুয়েক বছরের বড় হলে হতে পারে। মেয়েদের শরীর দেখে অনেক সময় বয়স ধরা যায় না। আন্দাজ করলে বেঠিক হয়। আকলির মা যেদিন আসে না সেদিন আকলি এসে বাড়িঘর ধুয়েমুছে যায়। আকলির মাকে ধরলাম। বললাম, বায়োলজির পরীক্ষা আছে। নারীর শরীর নিয়ে লিখতে হবে। তোমাকে একটু নগ্ন হতে হবে আমার সামনে। ও তো রেগে অস্থির। বলে, আমি তোমার মায়ের মতো। যখন তোমার মা বাইরে যেত, কাঁদলে আমি বুকের দুধ খাইয়েছি আকলির সাথে। তোমার মা জানে না। সেই তুমি কি সব খারাপ কথা বলছ? আমি তোমার দুধমা! কেউ না জানুক, আল্লাহ আর আমি জানি। এরপর আমি যখন ঐ লোকটির ম্যানিব্যাগ থেকে সরানো শত টাকার নোট ধরেছি সামনে তখন বলেছে, ঠিক আছে। দূর থেকে দেখবে। তুমি ছুঁলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবে না।

এরপর আকলির মা তার ভারি শরীর বের করে দাঁড়িয়ে থেকেছে সামনে। বিশাল সাইজের বুক, আর গরুর মতো ভুড়ি। দুপায়ের মাঝখানে কাচাপাকা লোমে সব ঢাকা। সাদা কিছু বের হয়েছে। আঁশটে গন্ধ। নারীর যোনী এত কুৎসিত কেন হয়Ñভেবেছি! বিভৎস অভিজ্ঞতা। আমি ঘরের পর্দা ফেলে অন্ধকার করে দেখেছি। আকলির মা চিল্লিয়ে বলেছে, এ কেমন পরীক্ষা বাজান! আমাকে বাজান বলেই ডাকত সবসময়।

আকলির মায়ের এই নগ্নতা দেখে খুব একটা কাজ হয়নি। একবার বমি হয়েছে, এই যা। মাথার মধ্যে মায়ের নগ্ন শরীরটাই থেকে গেছে। এরপর আকলি এলে তাকে দিয়েও চেষ্টা করেছি। আকলিকে অল্পকিছু টাকা দিতে চেয়েছি, তাও নগদে না। ও রাজি হয়েছে। সব খুলে দাঁড়িয়ে থেকেছে। ঘুুরতে বললে ঘুরেছে। পাতলা শরীর। কোথাও ভাজটুকু নেই। বুকে স্তন উঠেই নেতিয়ে পড়েছে। আমি দেখলাম। কোনো অনুভূতি হলো না। আকলি এরপর ফের যেদিন এলো, আমার ঘরে এসে বলল, দেখবে? টাকা লাগবে না। তখনও আমি আগের টাকাটা দিতে পারিনি। আমি হ্যাঁ না কিছু বললাম না। ফ্রি ফ্রি দেখা ঠিক হবে কিনা ভাবছিলাম। কারণ আমার তখন ধারণা ছিল আকলিরা সবকিছু টাকার জন্য করে।
একটা শর্ত আছে! আকলি বলে।
কি? আমি জানতে চাইলাম।
ছুঁতে হবে। ওর সোজা উত্তর। আমি কোনো কথা বললাম না। এরপর ও নগ্ন হলো। ম্যাচিং করে ব্রা প্যান্টি পরেছে। লাল রঙ, এখনো ভুলিনি। হঠাৎ কোনো লাল দেখলে এখনো কি যেন খুঁজি মনে মনে। কোথায় দেখেছি সবসবময় মনে করতে পারি না। মনে হল আকলি তৈরি হয়েই এসেছে। আমি ছুঁয়ে দিলাম। একটা স্তন আর নিতম্বের এক পাশ। অনাগ্রহে। শরীরটা জাগাতে চেষ্টা করিনি, কোনো ইচ্ছা হয়নি।
তুমি হিজড়া নাকি? বলে আকলি সরে গেছে। আর কোনো দিন নগ্ন হতে চায় নি। টাকা দিলেও না। প্রতিটা নারীর শরীর আমার কাছে মায়ের শরীর হয়ে উঠেছে। প্রতিটা নারীর শরীরে আমি ক্ষত দেখেছি। দেখেছি একটা স্তন ভোঁতা। ঝলসে শুকিয়ে যাওয়া। আমার ভয় হয়েছে। কুঁকড়ে গেছি নিজের ভেতর।
সিগারেট না খেয়ে ভেতরে আসি। বাবা বসে আছেন। বৃদ্ধ লোকটি ঘুমিয়েছে। আমি বাবার পাশে বসলাম।
আমার শ্বশুর আপনার বাবার মতোই। খুব কম কথা বলেন। সামনে বসা নারী বললেন।
আমি মৃদু হেসে সাই দিলাম।
স্ট্রোক করেছে। আমরা দেখতে যাচ্ছি। একবছর করে যাব যাব করে যেতে পারছিলাম না। দুজনে চাকরি করি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। একসঙ্গে সকলের ছুটি মেলে না। এই ধরুন, এবার যাচ্ছি, ছেলেমেয়েরা ছুটি পেল না। নারীটি বলেন। বৃদ্ধের কারণে এতক্ষণ তিনি কথা বলার সুযোগ পাননি। প্রত্যেকের একটা করে গল্প থাকে, কাউকে না কাউকে সেটা শুনতে হয়। আমি শ্রোতা হয়ে বসে থাকি। যাদের কেউ শোনার থাকে না, তাদের গল্পটা নিজের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে অন্য একটা গল্পে রূপ নেয়। গল্প কি কখনো বিকৃত হয়? নতুন যা গল্প, তা কি আসলেই বিনির্মাণ নাকি বিকৃত? আমি ভাবি।

আপনার মতো আমারও একভাই বিদেশে থাকে। ইটালি। লিবিয়া থেকে খুব কষ্ট করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে গেছে। এখন চাইলেও আসতে পারবে না। আসলে আর যেতে পারবে না। বাবাকে শেষ দেখা দেখতে পেল না। এবার পুরুষটি বলেন, বাবা রাতেই মারা গেছে।

ট্রেন চলে শব্দগুলো তেমনই থাকে। আমি কিছুক্ষণের জন্য নৈঃশব্দের ভেতর চলে যাই। সামনের নারী কাঁদে বলে মনে হয়। আমি শুনতে পাই না। ভদ্রলোক কিছু বলেন আমাকে। আমার মনে হয় ট্রেনের প্রত্যেকে কারও না কারও সঙ্গে তাদের গল্প ভাগাভাগি করছে। আমরা সব গল্প কি শুনছি? ট্রেনটা যখন গন্তব্যে পৌঁছাবে মানুষগুলো আর থাকবে না। গল্পগুলো থেকে যাবে কোথাও না কোথাও। কিছুটা মানুষের অপরিচিত কারও সঙ্গী হবে, কিছুটা থেকে যাবে নিজের কাছে, কিছুটা ভাসবে বাতাসে। এই থেকে যাওয়া গল্পগুলোর খোঁজে আর কেউ কোনোদিন আসবে না এপথে। যারা আসবে তারা নতুন গল্প নিয়ে আসবে। নতুন শ্রোতা থাকবে সঙ্গে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, পৃথিবীতে মানুষের জন্ম হয়েছে গল্প তৈরি করার জন্য। মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বিরহ, সুখ, উল্লাস এসব আসলে কিছু না। সবই গল্পের প্রয়োজনে আসে। মানুষ পুড়িয়ে পুড়িয়ে গল্প তৈরি করেন ঈশ্বর। গল্পটাই সব।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন